ছেলেদের চুল পড়া খুব স্বাভাবিক এবং বেশি বয়সে টাক পড়া কোনো ব্যাপার না। তবু যেন টাক পুরুষের আতঙ্কের কারণ। জুলিয়াস সিজার কিংবা নেপোলিয়ান সবাইকে এ সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তারা চুল লম্বা রেখে তারপর টেনে সামনে আঁচড়াতেন টাক ঢাকার জন্য।

অ্যানড্রোজেনিস অ্যালোপিসিয়া

অ্যানড্রোজেন এক ধরনের হরমোন। এ হরমোন পুরুষালি স্বভাবের জন্য দায়ী। আর জেনেটিক অর্থ হচ্ছে বাবা কিংবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। চুলের ফলিকলে ফাইভ আলফা রিডাকটেজ নামের অ্যানজাইম থাকে। আর চুলের ফলিকলে থাকা অ্যাড্রোজেন তখন ফাইভ আলফা রিডাকটেজের সাথে বিক্রিয়া ডাইহাইড্রোটেসটেসটেরন তৈরি করে। হেয়ার ফলিকল ডাইহাইড্রোটেসটেসটেরনের প্রতি সংবেদনশীল। আর তাই তখন চুল পড়ে যায়।

অ্যালোপিসিয়া অর্থ চুল পড়ে যাওয়া। পুরুষের চুল পড়ে যাওয়া মহিলাদের থেকেও বড় সমস্যা, মহিলাদের পুনঃ চুল গজানোর সম্ভাবনা বেশি। পুুরুষের বয়স, হরমোন ও জেনেটিক কারণে চুল পড়ে। চুল পড়ার কারণ ও রোধের উপায় নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে।

হেয়ার রিপ্লেসমেন্ট, নানা ধরনের সার্জারিও এখন টাক আড়াল করার কাজ করছে।
চুল পড়ছে এমন ধারণা হলে বা সন্দেহ হলে ত্বকবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে চুল পড়ার ধরন, কারণ ও নির্ণয়ের পরে সুচিকিৎসা প্রয়োজন।

চুল পড়ার অন্যান্য কারণ
অ্যালোনিসিয়া এরিয়েটা সাধারণত অটোইমিউন রোগে এমন হয়। মাথার জায়গায় জায়গায় গোল হয়ে সম্পূর্ণ চুল পড়ে যায়।

অ্যালোপিসিয়া টোটালিস
সম্পূর্ণ মাথার চুল পড়ে যায়, অ্যালোপিসিয়ার পরবর্তী ধারা এটি।

অ্যালোপিসিয়া ইউনিভার্সালিস
শরীরের সব চুল পড়ে যাওয়া।

ট্রাকশন অ্যালোপিসিয়া­
অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা চুল খুব বেশি টেনে বাঁধলে, টানাটানির কারণে চুল পড়ে যেতে পারে।

টেলোজেন ইফফ্লুভিয়াম­
এটি সাময়িক। শারীরিক ও মানসিক চাপ, ওষুধ, হরমোনজনিত সমস্যার কারণে হয়।

অ্যানাজেন ইফফ্লুভিয়াম­
কেমোথেরাপির কারণে যখন চুল পড়ে।

উপরে উল্লিখিত কারণে মাত্র পাঁচ ভাগ পুরুষের চুল পড়ে। বাকি ৯৫ ভাগ চুল পড়ে অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপিসিয়ার কারণে।

অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপিসিয়ার চিকিৎসা
চুলের ছাঁটকাটের ধরন পাল্টে ফেলুন।

ত্বকবিশেষজ্ঞের পরামর্শানুযায়ী ওষুধ ব্যবহার ও সেবন করুন
সুষম খাবার খাবেন।
হেয়ার রিপ্লেসমেন্ট করতে পারেন।

মেয়েদের চুল পড়ে যাওয়া
মেয়েদের চুল পড়ে যাওয়াকে ডাক্তারি ভাষায় অ্যানড্রোজেনেটিক অ্যালোপিসিয়া বলে। মেয়েদের মাথার উপরিভাগের চুল ও দু’পাশের চুল পাতলা হয়ে যায়। এক-তৃতীয়াংশ মহিলার এ সমস্যা হয়। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২৫টি চুল পড়ে স্বাভাবিকভাবেই। চুল পড়ে যাওয়া তখনই সমস্যা যখন দিনে ১২৫টির বেশি চুল পড়ে এবং সেই চুল গজায় না। পরিবারে চুল পড়ার সমস্যা থাকলে চুল পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে।

চুল পড়ে যাওয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। অ্যানাজেন ইফফ্লুভিয়াম ও টেলোজেন ইফফ্লুভিয়াম। নানারকম ওষুধ ও কেমোথেরাপির জন্য যখন চুল পড়ে তাকে অ্যানাজেন ইফফ্লুভিয়াম বলে। আর চুলের ফলিকল যখন রেস্টিং স্টেজে যায় তখন তাকে টেলোজেন ইফফ্লুভিয়াম বলে। চুলের ফলিকল রেস্টিং স্টেজে যাওয়া মানে চুল আর বড় না হওয়া এবং এক সময় চুল ঝরে যাওয়া। এর কারণ­ শারীরিক অসুস্থতা­ যেকোনো অপারেশনের পর, রক্তস্বল্পতা, ওজন কমে যাওয়া, হজমের সমস্যা। মানসিক চাপ­ অতি কর্মব্যস্ততা, পরিবারের কারো মৃত্যু। থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা; ডায়াবেটিস পলিসিস্‌টিক ওভারি। মূত্রনালীর প্রদাহ।

গর্ভাবস্থা, পরিবার পরিকল্পনার জন্য পিল খাওয়া। মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া। অতি মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ।

ডায়েটিং এবং চুল পড়া
আপনারা ডায়েটিং এবং চুল পড়ার সম্পর্ক লক্ষ করেছেন, ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত ডায়েটিং অনেক সময় চুল পড়ার কারণ। অবশ্যই ডায়েটিশিয়ান, নিউট্রশনিস্ট কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার তালিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট ডায়েটের সাথে ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট খাওয়া প্রয়োজন। আবার অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণে চুল পড়ে। সুতরাং ডায়েট করলে বা ওজন কমাতে চাইলে নিজের মনমতো তা না করে ডায়েটিশিয়ান, নিউট্রশনিস্ট, চিকিৎসক ও ত্বক বিশেষজ্ঞের মতামত নেবেন।

শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ ও চুল পড়া
শারীরিক অসুস্থতা, অপারেশন হওয়া ও মানসিক চাপ চুল পড়ার অন্যতম কারণ। এ সময় নতুন চুল গজায় না এবং চুল বাড়ে না। শরীর সারাতে ব্যস্ত থাকে সব শক্তি এবং অনাদরে পড়ে যায় চুল। এসব ক্ষেত্রে চুল পড়তে থাকে তিন মাস এবং আবার চুল গজাতে সময় লাগে তিন মাস। অর্থাৎ ছয় মাস সময় লাগে চুল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে। তবে শারীরিক ও মানসিক চাপ খুব বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী হলে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চুল পড়তে পারে। রক্তস্বল্পতা এবং থাইরয়েডের সমস্যায় চুল পড়ে। সুতরাং খুব বেশি চুল পড়লে রক্ত পরীক্ষা করা এবং রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

হরমোনের পরিবর্তন ও চুল পড়া
হরমোনের পরিবর্তনের সাথে মহিলাদের চুল পড়ার সম্পর্ক আছে। গর্ভাবস্থায় কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া বন্ধ করলে চুল পড়তে পারে। হরমোনের পরিবর্তনের তিন মাসের মধ্যে এই পরিবর্তন লক্ষ করা সম্ভব। আবার সঠিক যত্নে তিন মাসে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। রজঃনিবৃত্তি বা মাসিক বন্ধ হওয়ার পরও মহিলাদের চুল পড়ে।

চুল পড়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা
বেশি শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে।
টুপি পরলে বা মাথায় কাপড় দিলে চুল পড়ে।
প্রতিদিন ১০০ বার চুলে চিরুনি চালানো প্রয়োজন।
মাথা ন্যাড়া বারবার করলে ঘন চুল ওঠে।
খুশকি চুলের স্থায়ী ক্ষতি করে।
তেল না ব্যবহার করলে চুল পড়ে।
মানসিক চাপ চুলের স্থায়ী ক্ষতি করে।
অল্প বয়সে চুল পড়ে না।
জ্ঞানীদের চুল পড়ে যায়।

চুল পড়া নিয়ে এসব ধারণা রোগীদের কাছ থেকে হরহামেশাই শুনে থাকেন ত্বকবিশেষজ্ঞরা। অথচ এসব কথা প্রায় অসত্য এবং ভ্রান্ত ধারণা। কিংবা আংশিক সত্য। আপনার চুল আদৌ পড়ছে কি না তা অবশ্যই চিকিৎসকের মাধ্যমে নির্ণয় করা প্রয়োজন। আর চুল পড়ার কারণ নির্ণয় করাও জরুরি।

**************************
ডা. ওয়ানাইজা
চেম্বারঃ জেনারেল মেডিক্যাল হাসপাতাল (প্রা.) লি., ১০৩, এলিফ্যান্ট রোড (তৃতীয় তলা), বাটা সিগন্যালের পশ্চিম দিকে, ঢাকা। 
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৬ অক্টোবর ২০০৮।