পরীক্ষায় প্রোটিনের পরিমাণ যেন বেশি দেখায়, সে জন্য দুধে মেলামাইন মেশানো হয়। শুধু দুধে নয়, প্রোটিনের উচ্চমাত্রা দেখানোর জন্য ভেজাল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে, তা মানুষের হোক বা পশুর, এতে মেলামাইন মেশানো হয়। দামে কম অথচ প্রোটিনের কমতি নেই-প্রতিযোগিতার বাজারে এমন খাদ্য বাজার পাবেই। মেলামাইনে আছে উচ্চমাত্রার নাইট্রোজেন। তাই মেলামাইন মেশানো দুধে নাইট্রোজেনের মাত্রা বেশি দেখায়। আর নাইট্রোজেনের মাত্রা দেখেই দুধে প্রোটিনের মাত্রা নির্দেশ করা হয়। মেলামাইনের কোনো খাদ্যগুণ নেই। এটি দুধে মেশানোর উপযোগী একটি ভেজাল ছাড়া আর কিছুই নয়। কিছুদিন ধরে বিশেষ করে চীনে দুধে ভেজাল হিসেবে মেলামাইন মেশানোর খবর আসছে বেশ জোরেশোরে। চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এ অপকর্মটি করে আসছে, যা সবারই জানা। আর ভেজাল মানেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা বলাই বাহুল্য। মেলামাইন একটি রাসায়নিক পদার্থ। এটি প্লাস্টিক, থালাবাসন, আঠা, মেঝের টাইলস, ফিল্টার প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আমরা যে মেলামাইনের থালাবাসনে খাই, সেগুলো তৈরি করা হয় এই মেলামাইনের সঙ্গেই ফরমালডিহাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। এই থালাবাসন হচ্ছে মেলামাইন রেজিন বা মেলামাইন ফরমালডিহাইড, সংক্ষেপে মেলামাইন। এগুলো উচ্চতাপ সহ্য করতে পারে, রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে মেলামাইন স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আরও ক্ষতিকর, যখন এই মেলামাইন সায়ানিউরিক এডিস নামক আরেকটি রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয় বা বিক্রিয়া করে। এই সায়ানিউরিক এসিড মেলামাইনেরই একটি বাই প্রডাক্ট। আবার আলাদাভাবেও ভেজাল হিসেবে এটি দুধে বা খাদ্যে মেশানো হতে পারে। মেলামাইন যখন সায়ানিউরিক এসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন মেলামাইন সায়ানিউরেট তৈরি হয়। এটি একটি শক্ত স্কটিক। এই স্কটিক কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে আসতে থাকে। কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে মেলামাইন মেশানো দুধ খেতে থাকলে কিডনিতে পাথর তৈরি হয়।

ভেজাল মেশানো দুধ খেয়ে মেলামাইনের বিষক্রিয়া হলে প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া হতে পারে। এতে শিশুরা কান্নাকাটি করতে পারে। কিডনিতে পাথর হতে পারে, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। প্রস্রাবের সঙ্গে ছোট ছোট দু-একটা পাথর বের হয়ে আসতে পারে। কিডনি নষ্ট হয়ে প্রস্রাব কম হতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। এ ছাড়া শরীর ভালো না লাগা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, জ্বর প্রভৃতি লক্ষণও দেখা দিতে পারে। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনে মেলামাইন মেশানো দুধের কারণে প্রায় ৫৩ হাজার শিশুর কিডনিতে পাথর, ১২ হাজার ৯০০ জনের মতো হাসপাতালে ভর্তি এবং চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে পোষা প্রাণীর খাদ্যে মেলামাইন ও সায়ানিউরিক এসিড থাকায় অনেক কুকুর-বিড়ালের কিডনি নষ্ট হয়েছিল।

মেলামাইন মেশানো দুধ খেয়ে থাকলে কী করা যেতে পারে? প্রথমত, এ দুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে খেয়ে থাকলে কিডনিতে পাথর আছে কি না তা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। অল্প কিছুদিন খেয়ে থাকলে প্রচুর পানি পান করতে হবে, যেন মেলামাইন শরীর থেকে বের হয়ে যায়। 
 
 
**************************
ডা: মো: শহীদুল্লাহ
সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর ২০০৮