বাংলাদেশের অসংখ্য পল্লীর অনেক পর্ণকুটিরে হেঁসেলে কাটিয়ে দেয় কত মা-বোন দিনের ও রাতের বেশির ভাগ সময়, এ কাহিনী তো জানা হয়নি পুরোপুরি।
কিন্তু রাতে ঘুমের মধ্য থেকে কাশ-কফে অস্থির হয়ে ওঠে এই অসংখ্য মা-বোন, এ তো নতুন নয় এ দেশে। এসব দিনরাত্রির কাব্য লেখা হবে কবিদের কাজ। কিন্তু দিনের অর্ধেক সময় রান্নাঘরে, নয়তো উ্নুক্ত আকাশের নিচে একটুখানি ঘের দেওয়া ঘরে খড়ি, কাঠ, গোবর, শুকনো পাতা উনুনে জ্বালিয়ে রান্না করে পল্লীবালারা, আর এ জন্যই রাতে কাশতে কাশতে দম আটকে যায় তাদের মাঝেমধ্যে।

বিশেষ করে বদ্ধ রান্নাঘরে, যেখানে আলো-বাতাস তেমন চলাচল করে না, নাক-মুখ ঢাকা নেই, ধোঁয়া আর ঝুল অবাধে ঢুকছে নাকে-মুখে এসব পল্লী মা-বোনের। খড়ি, কাঠ, গোবর, শুকনো পাতা, কাগজ ও অন্যান্য বর্জ্য কখনো প্লাস্টিক ও রাবার জ্বলেপুড়ে যে ধোঁয়া হয়, এতে রয়েছে অনেক দূষক, কার্বন-মনোক্সাইড, বায়ুবাহিত কণা, হাইড্রোকার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড-এগুলো শরীরের জন্য বিষ তো বটেই, ক্যান্সারের জনক বস্তুও থাকে এগুলোয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ঝুঁকির উপাদানগুলো শিশুদের জন্য বেশি মারাত্মক। কোলে-কাঁখে যে বাচ্চারা থাকে মায়েদের অথবা হাঁটি হাঁটি পা পা শিশু, যারা থাকে মায়ের আশপাশে-এদের ভোগান্তি হয় বেশি। ফলে মায়েরা যেসব দূষক শ্বাসের সঙ্গে নেন, বাচ্চারাও একই রকমের দূষণের শিকার হয়।

বস্তুত বড়দের চেয়ে শিশুরা বেশি দ্রুত শুষে নেয় এসব দূষক, আর দেহের ভেতর বিষ থাকেও দীর্ঘক্ষণ। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলেন, বড়দের চেয়ে ছোটদের ফুসফুস অনেক কচি, শরীরে বাড়ন্ত; তাই ক্ষতিকর দূষক ক্ষতিও করে বেশি।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন কী বলে?
২০০৮ সালের ‘স্টেটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট’-এ ইউনিসেফের ভাষ্য হলো, বাংলাদেশের পাঁচ বছরের নিচে সব শিশুর ৩০ শতাংশ, যারা ২০০৬ সালে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছিল, এদের ছিল নিউমোনিয়া, এদের ২২ শতাংশের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৬৯ জন পঞ্চম জ্নদিনের দেখা পায় না এবং এদের এক-তৃতীয়াংশ কোনো এক ধরনের শ্বাসযন্ত্রের রোগে মারা যায়, এর মধ্যে নিউমোনিয়ার স্থান সর্বোচ্চ। ২০০৮ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের এনার্জি সেক্টর ম্যানেজমেন্ট অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিন্দুকণার মুখোমুখি হলে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিন্দুকণার সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের ব্যাধি ও মৃত্যুর সম্পর্ক খুব জোরালো।

বায়ুবাহিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুকণা বেশি বিপজ্জনক; যেহেতু এগুলো ফুসফুসের অনেক গভীরে শ্বাসের সঙ্গে যায়, যেখান থেকে কফ-কাশের মতো স্বাভাবিক উপায়ে এগুলো পরিষ্কার হয় না।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য হলো-শ্বাসযন্ত্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বিন্দুকণায়, যেগুলোর ব্যাস ১০ মাইক্রোনের কম (পিএম১০)। সাম্প্রতিককালে আরও সূক্ষ্মকণা (পিএম ২.৫)-এদের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।

উচ্চবিত্ত-ঘরের পুরুষদের তুলনায় দরিদ্রঘরের ছোট শিশু ও কম শিক্ষিত মহিলারা দূষণের মুখোমুখি হয় চারগুণ বেশি। অনেক প্রতিবেদনে তা-ই বলা হয়েছে। দারিদ্র্য ও অশিক্ষা যেসব ঘরে, সেসব ঘরে দূষণমান বেশি বিত্তশালী ও শিক্ষিত ঘরের চেয়ে দ্বিগুণ। কী করা উচিত তাহলে? আছে কিছু পরামর্শ- বাংলাদেশের একটি ঘরে, রান্নাবান্না যখন চলে সে সময় বাচ্চাদের বাইরে রাখলে বিশেষ করে দ্বিগুণ সময় বাইরে রাখলে দূষণ অর্ধেক কমে আসবে।

‘সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পল্লীগ্রামে পাঁচ বছরের নিচে বয়স, এমন শিশু গড়ে ঘরের বাইরে কাটায় মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা। ঘরের লোকজন যারা বাচ্চাদের বাইরে থাকার সময় তদারক করবে, তারাও দূষণের কাছ থেকে দূরে থাকবে।’ বলেন পরিবেশ বিভাগের ড: রিয়াজউদ্দিন আহমেদ। ঘরের ভেতর পরিবেশদূষণের ওপর জোরালো প্রভাব রয়েছে শিক্ষার।

২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, যখন পুরুষ ও মহিলার শিক্ষার মান একত্রে শূন্য থেকে (কোনো শিক্ষা নেই) চারে পৌঁছায় (ম্যাট্রিক পাস করে কিছুকাল), তখন রান্নাঘরে পিএম ১০ অনেক অনেক কমে যায়।

বিসিএসআইআর ল্যাবের বিজ্ঞানী ইফতেখার হোসেনের মতে, গ্রামের দরিদ্র লোকের রান্নাঘরে ধোঁয়াভর্তি পরিবেশে আট ঘণ্টা থাকা মানে দিনে ২০টি সিগারেট সেবনের সমান। তবে দরিদ্র লোক যে সহসা খড়ি, কাঠ, গোবর, কাগজ, টায়ার-এ রকম জ্বালানি ছেড়ে পরিষ্কার জ্বালানি, যেমন-প্রাকৃতিক গ্যাস ও কেরোসিনের আওতায় চলে আসবে, এমন সম্ভাবনা কম। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঘরের ভেতর পরিবেশদূষণে উন্নয়নশীল বিশ্বের দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় অসংখ্য শিশু মারা যায়। এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। 
 
**************************
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা
প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর ২০০৮