দুধ একটি আদর্শ খাদ্য যেখানে আয়রণ ও ভিটামিন ‘সি’ ছাড়া প্রায় সবগুলো খাদ্য উপাদান উপস্থিত। এবং এটি ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।

শরীরের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলেই চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিদরা দুধ খেতে বলেন,সম্প্রতি পত্র-পত্রিকাতে ‘দুধে মেলামাইন’ নামে যে কথাটি আসছে তাতে মানুষের মনে আতঙ্ক দেখা দিয়াছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি গবেষণাগার পরীক্ষা করে দুধে মেলামাইনের উপস্থিতি সনাক্ত করেছে। মেলামাইন শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের দৈনদিন খাবারের ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস দুধ দুধের ল্যাকটোজ হতে উৎপন্ন ল্যাফটিক এসিড ক্যালসিয়াম পরিশোষণ বৃদ্ধি করে। তাই দুধের ক্যালসিয়াম সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়।

ক্যালসিয়ামের ভূমিকা মানব শরীরে অপরিহার্য, খনিজ উপাদানের মধ্যে দেহে ক্যালসিয়ামের পরিমাণই সব চাইতে বেশি। কারণ আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত যে হাড় রয়েছে তার গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য একজন প্রাপ্ত বয়স্ক দেহে মোট ১২০০-১২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।

ক্যালসিয়াম যে সকল কাজ করেঃ

১। হাড় ও দাঁতের গঠন ও মজবুত করে।
২। হৃদপেশী (কার্ডিয়াক সাসেল) স্বাভাবিক সংকোচণ প্রভাবিত করে।
৩। এনজাইমের কাজে সাহায্যে করে।
৪। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।

ক্যালসিয়ামের অভাবে যা হয়ঃ
১। বাড়ন্ত শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি ও মজবুত করণ ব্যাহত হয়। দেহ খর্বকায় হয়, হাড় নরম ও দুর্বল হয়,
২। শিশুদের রিকেট ও বয়স্ক মহিলাদের ওসটিওম্যালেসিয়া দেখা দেয়।
৩। রক্তে ক্যালসিয়াম কমে গেলে স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও খিঁচুনি দেখা দেয়।

যা ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়ঃ
১। অতিরিক্ত স্নেহ (চর্বি) পদার্থ।
২। ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাব।
৩। অক্সালিক এসিড (কচু, চা, কফি)।
৪। ফাইটেট (শস্যের খোসা)।

মানব দেহে ক্যালসিয়াম এত গুরুত্বপূর্ণ যে এর চাহিদার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিভিন্ন বয়সে ক্যাসিয়ামের দৈনিক চাহিদা

১-৩  বছর ৫০০ মি. গ্রাম
৪-৮   ,,   ৮০০  ,,
৯-১৩  ,, ১৩০০  ,,
১৪-১৮ ,, ১৩০০ ,,
১৯-৩০ ,, ১০০০ ,,
৩১-৫০ ,, ১০০০ ,,
৫১-৭০ ,, ১২০০ ,,
৬০-৭০ ,, ১২০০ ,,

ক্যালসিয়াম উৎসঃ মানব দেহে ক্যালসিয়ামের চাহিদা দুধ ও অন্যান্য খাদ্য উপাদানের মাধ্যমে কিভাবে পূরণ করা যায় তা আমাদের জেনে রাখা ভালো। আমরা দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যদি ছোট কাটাসহ মাছ, পোস্তদানা, জিরা, জঈন, চানাজল, রাজমাতাল, সয়াবিন, ব্রকিল, শুকনো নারিকেল, সরিষা, এবং ভাগঁন ভেটকি ও চেলা শুঁটকি খাই তবে ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। দুধে মেলামাইন আতঙ্ক ছাড়াও যারা দুধ খেতে পারেন না (ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স অথবা আই,বি,এস) তারা উপরোক্ত খাবার দ্বারা ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে পারনে। এভাবে আমাদের যদি ক্যালসিয়ামের উৎস জানা থাকে তবে আমরা খুব সহজে সহজলভ্য ও সস্তা খাদ্য দিয়ে আমাদের শরীরের দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে পারি। জেনে রাখা ভালো প্রতি ১০০মিলিলিটার রক্তে ক্যালসিয়ামের স্বাভাবিক পরিমাণ ৯-১১ মি.গ্রাম। রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে হাড় হতে ক্যালসিয়াম রক্তে সরবরাহ হয়। তাই হাড়ের ক্যালসিয়াম গতিশীল অবস্থায় থাকে। ক্রমাগত আমাদের খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়াম জাতীয় খাদ্যের অভাব হলে রক্তে এর পরিমাণ কমে যায়। হাড় হতে সরবরাহের ফলে হাড়ের ক্যালসিয়াম ক্ষয় হয়। হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়।

দুধ ও অন্যান্য খাদ্যে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামেঃ

খাবার ক্যালসিয়ামের

গরুর দুধ (তরল)    ১২০ মি. গ্রাম
গরুর দুধ (পাউডার) ৯৫০ ,,
জিরা                 ১০৮০ ,,
জইন                 ১৫২৫ ,,
পোস্তদানা            ১৫৮৪ ,,
ভাগন শুঁটকি         ৬২৩৫ ,,
ভেটকি শুঁটকি          ৯৩৯ ,,
চেলা শুটকি          ৩৫৯০ ,,
ব্রকলি                  ৬২৬ ,,
শুকনো নারিকেল      ৪০০ ,,
সরিষা                  ৪৯০ ,,
রাজমা ডাল            ২৬০ ,,
চানাডাল               ২০২ ,,
সয়াবিন                ২৪০ ,,

উৎস নিন, আই,সি, এম, আর ইন্ডিয়া।

দেখা যাচ্ছে দুধ ছাড়াও অনেক খাবার রয়েছে যেখান থেকে আমরা খুব সহজে আমাদের দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে পারি।

চাহিদার অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের সতর্কতাঃ

দৈনিক ৪০০০ মি. গ্রাম (৪ গ্রাম) বা তার বেশি ক্যালসিয়াম গ্রহণের ফলে হাইপার ক্যালসিয়াম দেখা দেয়! এর ফলে কিডনির কাজ কারার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, মাংসপেশী দুর্বল হয়। কিডনিতে পাথর হতে পারে, ঝিমুনী দেখা দেয়। তাছাড়া অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণে দেহে আয়রণের ঘাটতি দেখা দেয় এর ফলে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। খাবারের শোষণ ক্ষমতা কমে যায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। চাহিদার অতিরিক্ত কোন কিছুই খাওয়া উচিত নয়।

**************************
এস. এন শম্পা, কনসালটেন্ট নিউট্রিশনিষ্ট
অতিরিক্ত ওজন কমানো ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ
শমরিতা হাসপাতাল, ৮৯/১, পান্থপথ, ঢাকা।
ফোনঃ ০১৭১২০০৮২২১
দৈনিক ইত্তেফাক, ০১ নভেম্বর ২০০৮