আমরা যা চাই তা আছে এই মনের ভেতরে। ধ্যানচর্চা করলে আমরা পাই জীবনের নতুন অর্থ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। ধ্যানচর্চার মাধ্যমে আমরা জীবনভর সন্ধান পাই সেই অনন্তকালের প্রশ্নের- “আমি কে

ধ্যানচর্চা নিয়ে বেশ গবেষণা হয়েছে।

প্রাচীন ভারতবর্ষের রোগীদের এই জীবনধারা ও জীবনচর্চা এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে বড় রকমের স্থান নিয়েছে।

চীনের গবেষকদল ও ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নিউবোসায়েস্টিস্টস্‌দের জন্য এমন একটি ধারা আবিষ্কার করেছেন যাতে গবেষণা করা যাবে ধ্যান কিভাবে মানুষের মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং চাপের প্রতি সাড়া জাগায়।

চীন দেশে অনুষ্ঠিত হয় এই গবেষণাঃ কলেজের আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে ৪০ জনের দটো গ্রম্নপে ভাগ করা হলো। একটি হলো এক্সপেরিন্টাল গ্রম্নপ অন্যটি হলো কনট্রোল গ্রম্নপ। যে দলের, উপর পরীক্ষা করা হলো (এক্সপেরিন্টল গ্রম্নপ) এদেরকে ‘পাঁচদিনের ধ্যান প্রশিক্ষণ’ দেয়া হলো। কন্ট্রোল গ্রম্নপ পেল ৫ দিনের শিথিল হবার (জবষধীধঃরড়হ) প্রশিক্ষণ।’ দুটো দলকেই এরপর টেস্টের মুখোমুখি হতে হলোঃ তাদের মনোযোগ এবং মানসিক চাপের প্রতি প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হলো প্রশিক্ষণের আগে ও পরে।

কন্ট্রোল গ্রম্নপের চেয়ে এক্সপেরিমেন্টাল গ্রম্নপ চাপ মোকাবেলা করতে পারলেন অনেক ভালো। মানসাংক টেস্ট করা হলো তাঁদেরকে। প্রশিক্ষণে আগে মানসাংক করার পর দুটো দলের মধ্যেই দেখা গেলো স্ট্রেস হরেমোন কর্টিসোল ক্ষরণ অনেক বেড়ে গেছে। তবে প্রশিক্ষণের পর প্রথম গ্রম্নপের মধ্যে কটিসোল ক্ষরণ কমে যেতে দেখা গেলো, বোঝা গেল চাপ মোকাবেলায় এরা বেশি কুশলী। এই দলের মধ্যে কন্ট্রোল গ্রম্নপের তুলনায় উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, ক্লান্তিবোধ থাকে অনেক কম।

গবেষণাটি হয়ে ছিলো পাঁচদিনের প্রশিক্ষণের ফলাফল নিয়ে।

যারা অনেক বছর ধরে ধ্যানচর্চা করছেন এরা যে মনের চাপ মোকাবেলায় কত দক্ষ তা অনুমান করা যেতে পারে।

০ ধ্যানচর্চায় মগজেও আসে পরিবর্তন

যারা ধ্যান করেন এদের মগজ তরঙ্গ থেকে বোঝা যায় এরা অন্যের চেয়ে সুস্থ।

নিউরোসায়েন্টিস্টরা দেখেছেন, ধ্যানের ফলে তাদের মগজের কাজকর্ম কর্টেক্সের নানা এলাকায় সরে যায় যেমন মানসিক চাপ প্রবণ ডান পুরো কর্টেক্স থেকে মগজ তরঙ্গ সরে যায় প্রশান্তবাম পুরো কর্টেক্সে। মানসিক এই স্থান পরিবর্তনের ফলে চাপের নেতিবাচক প্রভাব কমে যায়, কমে যায় বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তার নেতিবাচক প্রভাবও। ‘এমিগডেলাতে’ও কাজকর্ম কমে যায়, মগজের এই এলাকায় মগজ ‘ভীতি ও আতংককে’ প্রক্রিয়াজাত করে।

ধ্যানের আরো সুফল আছে।

০ স্বাস্থ্য সুফলঃ

অনেকগুলো গবেষণায় দেখা গেছে, ধ্যানচর্চার রয়েছে অবশ্যই স্বাস্থ্য সুফল, ধ্যানের ফলে কমে আসে মানসিক চাপ। কমে আসে রক্তচাপ, হ্নদরোগের ঝুঁকি কমে, ক্‌নিক ব্যথার উপশম হয়।

০ নিজের চিন্তাভাবনা আসে নিয়ন্ত্রণেঃ

বেশিরভাগ লোকই নিজেদের চিন্তাভাবনার শিকার, মনে চিন্তার উথাল পাথাল ঢেউ নিয়ন্ত্রণের উপায় কি? নিয়মিত ধ্যান করলে আমাদের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আসে। এমনকি একে রোধ করাও সম্ভব হতে পারে। এতে মনে আসে প্রশান্তি আর এতে আমাদের অর্জনকে সম্ভব করে তোলার মত ব্যাপার ঘটে।

মন যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন কিছু কিছু জিনিস, এমনকি ছোটখাট জিনিস আমাদেরকে বিরক্ত ও বিব্রত করে। একমাত্র কার্যকরী সমাধান হলোঃ চিন্তা থেকে মনের বিচ্যুতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি সমুন্নত করা। ধ্যানচর্চার একটি বড় ও শক্তিশালী সুফল হলো- আমরা এর ফলে একটি ব্যাপক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি, তুচ্ছ জিনিস থেকে মনকে বিচ্যুত করতে পারি যাতে অবস্থা পরিস্থিতি ভেদে আমরা প্রশান্তি মানসিক সাম্য লাভ করতে পারি।

০ সুখও মনের শান্তি

ধ্যান আমাদেরকে দেয় মনের শান্তি এবং এটি আমাদেরকে নিয়ে যায় সুখের উৎসমূলে। আমাদের মন যদি থাকে ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত তাহলে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত সীমিত ধরনের ভাবনা আঘাত করবে। আমরা যদি স্থির মনে ধ্যান করতে পারি তাহলে আমরা আবিষ্কার করতে পারবো গভীর শান্তি ও সুখ।

০ মনোযোগঃ

ধ্যান মনোযোগ নির্মাণে সহায়ক। কাজকর্ম, খেলাধূলা, সঙ্গীত যাই হোক সব কিছুতেই চাই মনোযোগ। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে প্রয়োজন মনোযোগ। একই সময়ে একটি বিষয়ে লক্ষ্য দিতে পারি যত বেশি, আমরা হয়ে উঠি অনেক বেশি শক্তিশালী, ভাবনা ও মনের বিক্ষিপ্ত অবস্থা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে দূরে থাকতে পারি আমরা।

০ স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা-

মন যখন থাকে চিন্তায় নিমগ্ন, তখন অতীত বা ভবিষ্যৎ আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখে বেশি। মনকে যদি নীরব করে দেয়ার কৌশল আয়ত্ত করতে পারি। তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে যে কোন কিছুই সম্ভব, আমাদের জীবনের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা সজীব হয়ে উঠে।

০ জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আবিষ্কার করা চাই!

অনেকেই অনুভব করেন জীবনে কোনও কিছু যেন নেই। হয়ত অনেকের আছে ভালো চাকরি, সন্তান, সম্পর্ক, আত্মীয়-স্বজন, তবু কি যেন নেই! সাধারণত আমরা বহির্জগতে জীবনের মানে খুঁজতে যাই। আমরা যা চাই তা আছে এই মনের ভেতরে। ধ্যানচর্চা করলে আমরা পাই জীবনের নতুন অর্থ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। ধ্যানচর্চার মাধ্যমে আমরা জীবনভর সন্ধান পাই সেই অনন্তকালের প্রশ্নের- “আমি কে?”

**************************
অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস বারডেম, ঢাকা।
Email: Subhagata@msn.com
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮ নভেম্বর ২০০৮
subhagata choudhury@ymail.com