হেলপ: লাইন-১৬
দাম্পত্য ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে আপনি যা ভাবছেন তা সঠিক নাও হতে পারে। নিজের সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কেবলমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।

সুপ্রিয় পাঠক। সুদীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে পুরুষের সমস্যা এবং পরবর্তীতে হেলপ লাইন নামে এই কলামটি অব্যাহত রাখি। এই কলামটি দেশের লাখ লাখ তরুণকে সচেতন করার জন্য লেখার উদ্যোগ নেয়া হয়। মূলত মার্জিত ভাষায় তরুণ-তরুণী তথা পুরুষ ও মহিলাদের প্রাইভেট লাইফের নানা ভুল-ভ্রান্তি নিরসনের চেষ্টা হিসেবে কলামটি চালু করা হয়। হয়তবা এ কলামটি নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে একথাটি বলতে পারি আমার সুদীর্ঘ ২৬ বছর যাবৎ চিকিৎসা বিষয়ক লেখালেখিতে এত পাঠকপ্রিয়তা আমার কোন লেখা পায়নি। তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়স্ক থেকে সত্তোরোর্ধ পুরুষেরাও হেলপ লাইন কলামটির একনিষ্ঠ পাঠক। তবে আমি একথাটি বারবার বলে আসছি শুধুমাত্র ইত্তেফাক নয়, দেশের সমস্ত প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার উচিত তরুণ-তরুণী তথা নারী-পুরুষের শারীরিক সমস্যা তথা যৌন সমস্যার অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নেয়া। গত তিন বছরের প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে তথাকথিত হারবাল ও সনাতনি ঔষধের নামে তরুণ-তরুণী নববিবাহিত দম্পতি থেকে শুরু করে নানা বয়সের পুরুষ-মহিলারা কিভাবে প্রতারিত হয়েছেন। সামান্য ঠুনকো ভুল ধারণার কারণে কতশত ঘর ভেঙ্গে গেছে। এসব আলোচনায় দীর্ঘ গ্রন্থ রচনা হতে পারে। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আর বাড়াতে চাই না। পাঠকদের কাছে বিনীতভাবে জানাতে চাই ইত্তেফাকের অনেক পাঠক অন্যান্য কিছু বিষয়ে লিখতে অনুরোধ করেছেন। তাই আপাতত পুরুষের সমস্যাঃ হেলপ লাইন কলামটি বন্ধ থাকবে। আগামী সংখ্যা থেকে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে চেষ্টা করবো। তবে এ কথাটিও বলতে চাই, ২০০৯ সালের শুরু থেকে হেলপ লাইন কলামটি পুনরায় চালুর প্রত্যাশা রাখি। তবে আজ যে বিষয়টির আলোচনা করতে চাই তা হচ্ছে কাউন্সিলিং। আমার পিএইচডি থিসিসের বিষয় হচ্ছে, ‘সাইকো-সেক্সুয়াল সমস্যা এবং বাংলাদেশের তরুণ সমাজ’। এই থিসিসে তরুণ-তরুণী ও নববিবাহিত দম্পতিদের নানা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা স্থান পেয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আগামীতে ধারাবাহিকভাবে লেখার ইচ্ছা রইলো।

তবে পাঠকদের অবগতির জন্য সামান্য হলেও বলতে চাই কাউন্সিলিং কোন ভৌতিক বিদ্যা নয়। গত সপ্তাহের একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করতে চাই। নববিবাহিত দম্পতি বলাই ভালো। সবে তিন-চারমাস বিয়ে হয়েছে। দু’জনেরই শারীরিক কোন সমস্যা নেই। কিন্তু স্ত্রীর কোন কিছুই ভালো লাগে না। একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার কোন কিছু ভাল লাগানোর জন্য কোন ওষুধ নেই। এসব ক্ষেত্রে শতকরা ৯৯ ভাগ সংশিস্নষ্ট ডাক্তারই এন্টিডিপ্রোসিভ ওষুধ ও ভিটামিন দেন রোগীকে। আমি কখনও কাউকে কিছু ভালো লাগানোর জন্য ওষুধ দিয়েছি বলে মনে পড়ে না। আমার অপর একটা রোগী আছে। বিয়ে হয়েছে ২৪ বছর। অর্থাৎ দুই যুগ। এই দুই যুগ ধরেই পুরুষ বা স্বামীর স্ত্রীকে ভালো লাগে। স্ত্রীর মাঝে-মধ্যে অবসাদ থাকে। স্বামীর প্রতি অনীহা থাকে। সারাক্ষণ ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে। কিন্তু স্বামী অত্যন্ত কুল। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াঝাটি কমানোর জন্য পরামর্শ নিতে আমার চেম্বারে আসা। ওষুধ দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না নিঃসন্দেহে। ডাক্তার হিসাবে কারও পারিবারিক বিরোধ মিটানো কাজ নয়। তবুও এখানে ভূমিকা রাখতে হয় কাজও হয়। সাইকো-সেক্সুয়াল কাউন্সিলিং বলতে এসব ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া বুঝায় না। কেবলমাত্র যেসব দম্পতির ক্ষেত্রে কোন ধরনের শারীরিক সমস্যা নেই অথচ অজ্ঞতা ও ভুল ধারণার কারণে পারিবারিক ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি হচ্ছে তা নিরসনের চেষ্টা করা হয়। সব ক্ষেত্রে একই ধরনের কাউন্সিলিং করতে হয় এমন নয়। হঠাৎ একদিন এক কমবয়সী স্ত্রীর অভিযোগ, তার স্বামী একেবারেই ব্যাকডেটেড, স্মার্ট নয়।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যুবকটি ভীষণ লজ্জা পেলেন। আমি তরুণী স্ত্রীর কাছে জানতে চাই ‘ব্যাকডেটেড’ ও স্মার্টনেস-এর সংজ্ঞা কি। কেন স্বামীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ। তরুণী স্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে। অভিযোগ শুনে হাসি পায়। একেবারেই হাস্যকর অভিযোগ। তরুণীটির এক বান্ধবীর কথা অনুযায়ী তার স্বামীর স্মার্টনেস-এর বর্ণনা মেলাতে গিয়ে নিজের স্বামীকে নিয়ে এই বিভ্রান্তি। এ সমস্যারও কোন চিকিৎসা নেই। নেই কোন সুনির্দিষ্ট কাউন্সিলিং পদ্ধতি। তরুণীটকে কোন গসিপে বিশ্বাস না করার পরামর্শ দিয়ে বললাম- আপনার স্বামীকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আপনি আসলে ভাগ্যবান। আজকাল ভালো ছেলে পাওয়া কঠিন। এতে কাজ হলো। পরে আর কখনও এই দম্পতি আসেনি। মোট কথা, বেশীরভাগ বলবো না শতকরা ৯৫ থেকে ৯৮ ভাগ পুরুষ ও মহিলার রয়েছে এ ধরনের ভুল ধারণা। শুধুমাত্র কাউন্সিলিং করলেই এসব সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণ-তরুণীদে বুঝতে হবে তারা এ যুগের ছেলে-মেয়ে, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বশে জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে অসুন্দর করবেন না। আধুনিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে কাল্পনিক সমস্যার কোন স্থান নেই। ভবিষ্যতে শুধুমাত্র কাউন্সিলিং নিয়ে ধারাবাহিক লেখার ইচ্ছা রইল। পরিশেষে বলবো। দাম্পত্য ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে আপনি যা ভাবছেন তা সঠিক নাও হতে পারে। নিজের সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কেবলমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।


**************************
ডাঃ মোড়ল নজরুল ইসলাম
চুলপড়া, যৌন সমস্যা ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেজার এন্ড কসমেটিক্স সার্জন
বাংলাদেশ লেজার স্কিন সেন্টার, বাড়ী নং-৩৯, রোড-২,
আম্বালা কমপ্লেক্স, ধানমন্ডি, ঢাকা। ০১৯১১৩০৩০৯৯
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮ নভেম্বর ২০০৮