বড়দের ডায়াবেটিস হলে নিজেরাই এর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবাকে নিতে হয় মুখ্য ভূমিকা। এ ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ডায়াবেটিস প্রতিরোধের চেষ্টা করা। পরিবারে কারও ডায়াবেটিস থাকলে তার সন্তানের হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে তাই সতর্ক থাকতে হবে। গর্ভাবস্থায় মায়ের ভাইরাস, বিশেষ করে রুবেলার সংক্রমণ পরে শিশুর ডায়াবেটিসের আশঙ্কা বাড়ায়। তাই মেয়েদের উচিত গর্ভধারণের আগেই রুবেলার টিকা এমএমআর নেওয়া।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ‘ডি’ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। তাই ভিটামিন ‘ডি’র জন্য শিশুরা যেন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এবং সামুদ্রিক মাছ খায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের একটি বড় কারণ শিশুদের ওজন অতিরিক্ত বৃদ্ধি। এ ব্যাপারেও দৃষ্টি দিতে হবে। এত সতর্কতার পরও ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই থেকে যায়।

খেয়াল রাখতে হবে, প্রাথমিক অবস্থায় যেন শিশুর ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো জানা থাকলে এ কাজটা অনেক সহজ হয়। এ রোগের অন্যতম লক্ষণ হলো ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, জিভ শুকনো থাকার পরও ঘন ঘন প্রস্রাব ডায়াবেটিসেই হয়। এ ছাড়া পিপাসা লাগা, বারবার খিদে লাগা, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি বোধ, অমনোযোগিতা, উৎসাহের অভাব ইত্যাদি হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

শিশুর ডায়াবেটিসের ব্যাপারে নিশ্চিত হলে ভেঙে পড়বেন না, বরং মনোবল দৃঢ় করুন এবং সঠিকভাবে সন্তানের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হোন। প্রথমেই পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে একটি খাদ্যতালিকা তৈরি করে নিন। খাদ্য নিয়ন্ত্রণের ওপর ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা নির্ভরশীল। শিশুকে কখনো উচ্চ ক্যালোরি ও কলেস্টেরলযুক্ত খাবার দেবেন না। বড়দের জন্যও কিন্তু এসব খাবার ক্ষতিকর। তাই তাদেরও এসব বাদ দেওয়া উচিত। এ ছাড়া শিশুর সামনে অন্য কেউ এসব খাবার খেলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। খাবার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সন্তানের পর্যাপ্ত শরীরচর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। শুয়ে-বসে, টিভি দেখে, কম্পিউটার গেমস খেলে সময় কাটানোর চেয়ে বাইরের খেলাধুলার দিকে সন্তানকে আকৃষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্রতিদিন আধঘণ্টা করে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন শরীরচর্চা করলে সুফল পাওয়া যায়। এসবের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শমতো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য ট্যাবলেট এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে হয়।

অভিভাবকদের এ ইনজেকশন দেওয়া শিখে নিতে হবে এবং সন্তান একটু বড় হলে তাকেও শিখিয়ে দিতে হবে। এর সঙ্গে সব সময় গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখে একটি চার্টে লিখে রাখুন। গ্লুকোজের মাত্রা খুব বেশি বা কম হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ইনসুলিনের ডোজ ঠিক করে নিন। শিশুদের ইনসুলিন-নির্ভরশীল অর্থাৎ টাইপ-১ ডায়াবেটিস বেশি হয়; আর এ ধরনের ডায়াবেটিসে হঠাৎ রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ অবস্থাটা শিশুর জন্য খুবই মারাত্মক। তাই ইনসুলিন দেওয়ার পর পর্যাপ্ত খাবার দিতে হবে। ইনসুলিন দেওয়ার পর শিশুকে গরম পানিতে গোসল না করানো ভালো। এতে ইনসুলিন সহজে রক্তনালি দিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্লুকোজের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিতে পারে। রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো হলো প্রচুর ঘাম, মাথাব্যথা, তন্দ্রা ভাব, বুক ধুঁকপুক করা, চোখে ঝাপসা দেখা, খিঁচুনি, আচরণগত পরিবর্তন, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে গ্লুকোমিটারে গ্লুকোজের পরিমাণ দেখে নিয়ে শিশুকে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে। তাই সন্তান স্কুলে যাওয়ার সময় তার পকেটে বা ব্যাগে মিষ্টিজাতীয় খাবার রেখে দিন। স্কুলের শিক্ষকদেরও এ ব্যাপারে অবহিত করতে হবে। সম্ভব হলে স্কুলে একটি গ্লুকোমিটার রাখা উচিত এবং দুই-একজন শিক্ষককে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখে ইনসুলিন প্রয়োগের পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যাওয়া ছাড়াও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর চোখ, কিডনি, হৃৎপিণ্ড, থাইরয়েড ইত্যাদির বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। তাই এসব জটিলতার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তবে তার খাওয়াদাওয়া ও জীবনাচরণে খুব বেশি কঠোরতা আরোপ করবেন না। ডায়াবেটিক শিশুর সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করুন এবং তাকে সবার সঙ্গে মিশতে দিন।

মাঝেমধ্যে সামান্য বেশি খেলেও ক্ষতি নেই। সেদিন একটু বেশি সময় ব্যায়াম বা একটু বেশি মাত্রার ইনসুলিন দিলেই চলবে। মূলত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সমঝোতার পথে হাঁটুন। প্রয়োজনে সন্তানকে পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। অন্য যেসব শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের সঙ্গেও মিশতে দিন।

অভিভাবকেরা বিশ্বাস রাখুন যে ডায়াবেটিস কোনো ভয়ঙ্কর রোগ নয়। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে সারা জীবন সুস্থভাবে কাটিয়ে দিচ্ছে, এমন হাজারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাই শিশুর ডায়াবেটিস নিয়ে অযথা হতাশ ও উদ্বিগ্ন হবেন না। অস্থিরও হবেন না। এতে শিশু ভীত হয়ে নিজেকে অপরাধী ভাবতে পারে। গুটিয়ে নিতে পারে সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে। মনে রাখবেন, আপনার অপরিসীম ধৈর্য, ঐকান্তিকতা আর ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে আপনার সন্তান ডায়াবেটিস রোগ নিয়েও সুস্থভাবে জীবন গড়ে তুলতে পারবে। 
 
 
**************************
ডা· আবু সাঈদ শিমুল
চিকিৎসা কর্মকর্তা পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম
প্রথম আলো, ১২ নভেম্বর ২০০৮।