নাক ঝরা, হাঁচি-কাশি, সামান্য জ্বর, ঠান্ডা লাগা-অতি সাধারণ অথচ খুবই ছোঁয়াচে রোগ। শীতের শুরুতে পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগটির প্রকোপ বেড়ে যায়।

কীভাবে হয়ঃ বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস দিয়ে এ রোগ হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাস দিয়ে শ্বাসনালির সংক্রমণে হয় সর্দি। অন্যান্য ভাইরাসের মধ্যে আছে কোরোনা ভাইরাস, প্যারা-ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস প্রভৃতি।
লক্ষণঃ অপেক্ষাকৃত বড় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এ রোগের লক্ষণ হয় মামুলি। কিন্তু ছোট শিশুদের মধ্যে হতে পারে প্রকট। নাক দিয়ে পানি ঝরা, হাঁচি, কাশি, নাকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, শরীর ব্যথা করা, সামান্য জ্বর হওয়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, খাওয়ার অরুচি হওয়া, মাথা ব্যথা প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর কয়েক দিনের মধ্যেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। আর সাধারণত সপ্তাহখানেকের মধ্যে রোগটি ভালো হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। ছোট শিশুদের ফুসফুসে ইনফেকশন হয়ে হতে পারে ব্রংকিওলাইটিস, নিউমোনিয়া। হতে পারে মধ্যকানের প্রদাহ। বড়দের হতে পারে সাইনোসাইটিস।

কীভাবে ছড়ায়ঃ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে সুস্থ লোকের দেহে ভাইরাস ছড়াতে পারে খুব দ্রুত। রোগীরা যখন হাঁচি-কাশি দেয়, নাক ঝাড়ে, ভাইরাসগুলো তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকারূপে।

এগুলো শ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরে ঢুকে যেতে পারে। আবার রোগী যখন তার হাত দিয়ে নাক ঝাড়ে, হাত বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দেয়, তখন হাত বা রুমালে ভাইরাস লেগে যায়। হাত ও রুমালে লেগে থাকা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে কয়েক ঘণ্টা।

ভাইরাস লেগে থাকা হাত দিয়ে রোগী যখন সুস্থ কাউকে স্পর্শ করে বা হ্যান্ডশেক করে, তখন সুস্থ লোকটি সংক্রমিত হয়। রুমাল বা এ-জাতীয় বস্তু থেকেও সুস্থ মানুষ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে রোগটি ছড়ায় দ্রুত। স্কুল-কলেজ বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হয় বেশি। সাধারণত বন্ধু, বাবা, মা, ভাইবোনের কাছ থেকে শিশুরা সংক্রমিত হয়। রাইনো ভাইরাসের এক শরও বেশি প্রকারভেদ রয়েছে। এ জন্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে পরিপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। একই বছরে একটা লোক বেশ কয়েকবার আক্রান্ত হতে পারে।

চিকিৎসাঃ সাধারণত সপ্তাহখানেকের মধ্যে রোগটি ভালো হয়ে যায়। তবে রাইনো ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে পর্যাপ্ত। সর্দি নিয়মিত পরিষ্কার করে নাসারন্ধ্র খোলা রাখতে হবে। গরমপানির ভাপ বা নরমাল স্যালাইন, নাকের ড্রপ নাকের ছিদ্র খোলা রাখতে সহায়তা করে। ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া বা রান্নার ধোঁয়া সর্দির রোগীদের জন্য বাড়তি উপদ্রব। ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। নাক ঝরা কমাতে অ্যান্টিহিস্টামিন আর ব্যথা ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শে। শিশুদের ব্রংকিওলাইটিস, নিউমোনিয়াসহ যেকোনো জটিলতায় অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

প্রতিরোধ করা যায় সহজেইঃ ঘন ঘন হাত ধুয়ে ফেলা, নাক ঝেড়ে যেখানে সেখানে নাকের ময়লা না ফেলা, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় রুমাল বা হাত দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না আসা-এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করা যায় অনেকাংশেই।
 
**************************
ডা: মো: শহীদুল্লাহ
সহযোগী অধ্যাপক
কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
 প্রথম আলো, ১২ নভেম্বর ২০০৮।