একটা ভালো খবর শুনলে যেমন মনটা আনন্দে ভরে যায়, খারাপ কোনো ঘটনা বা খবরেও তেমনি মন খারাপ হতেই পারে। আবার কখনো এই ঘটনাগুলো বাইরের কিছু না হয়ে হতে পারে কোনো ভেতরের দ্বন্দ্ব, চিন্তা-ভাবনা এসব নানা কিছু। হতেই পারে তা অন্য কোনো রোগের সাথে যুক্ত একটা অনুভূতি। এই মন খারাপের ভাবটা যখন তার মাত্রায়, সময়ের মাপে অথবা প্রকাশে আসল কারণটাকে এমনভাবে ছাড়িয়ে যায় যে একটা অবুঝ না ভালো লাগা গোটা জীবনটাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, আমরা তখন তাকে বিষাদ রোগ বলি।

বিশেষজ্ঞরা বিষণ্নতার উপসর্গগুলোকে দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগে রয়েছে-

ক) ভালো না লাগার অনুভূতি

খ) উৎসাহ ও আনন্দের অভাব

গ) শারীরিক শক্তি এবং কাজকর্মের ক্ষমতা কমে যাওয়া

দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে

ক) মনোসংযোগের অভাব

খ) নিজের সম্পর্কে হীন মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব

গ) অপরাধবোধ

ঘ) প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা

ঙ) ঘুমের অসুবিধা এবং

চ) খিদে কমে যাওয়া

যদি কারো মধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিভাগের অন্তত দুটি উপসর্গ দেখা দেয়, তবে তার বিষণ্নতার মাত্রা হাল্কা বলেই ধরতে হবে। যদি কারো মধ্যে প্রথম বিভাগের অন্তত দুটি এবং দ্বিতীয় বিভাগের অন্তত তিনটি উপসর্গ দেখা দেয় তবে সে মাঝারি ধরনের বিষণ্নতায় ভুগছে। বিষণ্নতার চরম পর্যায়ে প্রথম বিভাগের সবক’টি এবং দ্বিতীয় বিভাগের অন্তত চারটি উপসর্গ দেখা দেয়াটা স্বাভাবিক। বিষাদ রোগে আক্রান্ত মানুষের একটা বড় অংশ বিষণ্নতার চরম পর্যায়ে বারে বারে আত্মহত্যার কথা ভাবেন এবং আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন।

বিষাদগ্রস্ত মানুষদের প্রায় সবাই কমবেশি অনিদ্রায় ভোগে। হয় তাদের ঘুম আসতে চায় না নয়তো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। ঘুম থেকে ওঠার পরও এদের মধ্যে ভাব দেখা যায়। বিষণ্নতার শারীরিক উপসর্গের মধ্যে-

- কারো কারো শরীরে জ্বালা-যন্ত্রণার অনুভূতি হয়

- শরীরে জ্বলুনির ভাব হতে পারে

- ঘাড়ে-মাথায় যন্ত্রণা

- কোমরে ব্যথা

- সেই সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিতে পারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে

- বিষাদের এমন কিছু লক্ষণ আছে যা থেকে রোগটিকে চিনে নেয়া যায় অনায়াসেই

- রোগীর কিছু ভালো না লাগা

- মনে আনন্দ-ফুর্তির অভাব

- সব সময়ে একটা দুঃখের ভাব

- সেইসঙ্গে হীনমন্যতা

- হতাশা

- আত্মবিশ্বাসের অভাব এগুলো সব বিষাদের প্রাথমিক লক্ষণ। বিষাদগ্রস্ত মানুষদের-

- কোনো কিছু খেতে ভাল লাগে না

- লোকের সঙ্গে গল্প-গুজব করা ভালো লাগে না

- খেলাধুলায় আগ্রহ লাগে না

- কাজকর্মে আলসেমি

- জড়তা

- ক্লান্তির ভাব দেখতে পাওয়া যায়

- এদের কেউ কেউ মনে করে নিশ্চয়ই তার শরীরের শক্তি কমে গেছে

- কেউ কেউ ভাবে তার ক্যান্সারজাতীয় শক্ত কোনো রোগ করেছে

- অনেক সময় রোগের ভয়ে রোগী খাওয়া-দাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেয়

বিষাদ রোগ অনেক সময় সামাজিক কারণেও দেখা দিতে পারে যেমন-

- প্রেমে ব্যর্থতা

- বেকারত্ব

- আর্থিক অনটন

- আত্মীয়-স্বজনের ব্যবহারে ক্রমাগত অশান্তি

- পারিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হলে

- সামাজিক বিপর্যয়

- দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত থাকা

- দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি

- সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে থাকলে

বিষাদ রোগ কমাতে গত দু’দশকে বেশকিছু কার্যকরী ওষুধ বাজারে এসেছে। প্রাথমিক ফল পেতে ২-৪ সপ্তাহ সময় লাগলেও এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম। ওষুধের সাহায্যে বিষণ্নতার তীব্রতা কমিয়ে আনার পর সাইকোথেরাপি অথবা কাউন্সিলিং করাতে পারলে সুফল পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারে লোকজন এবং বন্ধু-বান্ধবের সাহচার্য আর সহানুভূতির সাহায্যে বিষণ্ন মানুষটির নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারেন, তার মনের জোর বাড়াতে পারেন। বিষাদের মাত্রা যদি প্রচন্ড তীব্র হয়, রোগী খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেন, ঘর থেকে একেবারেই বেরোতে না চান, তার ওজন যদি ক্রমাগতভাবে কমতে থাকে এবং অলীক-উদ্ভট চিন্তায় আচ্ছন্ন হন তবে ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি বা শক থেরাপি (ইসিটি) কার্যকরী হতে পারে।

**************************
অধ্যাপক ডা: এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ
এমবিবিএস এফসিপিএস এমআরসিপি এফআরসিপি
পরিচালক ও অধ্যাপক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ নভেম্বর ২০০৮।