আটটি কোম্পানির দুধ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর আমাদের অনেক মায়ের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। প্রচারের জোরে এমন একটা অবস্থা হয়েছিল, আমাদের আধুনিক মায়েরা নিজের শিশুর জন্য নিজের বুকের দুধের চেয়ে বাজারে নিষিদ্ধ হওয়া দুধগুলোকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকতেন। এর আগে এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও বা ডাক্তাররা এর বিপক্ষে সব সময় বললেও আমাদের জনগণ বুঝতে চায় না। বেবিফুডের ভয়াবহ ক্ষতি ও প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার রফতানিকারক দেশগুলো ভালো করেই জানে। তার পরও নিজেদের রাষ্ট্রে কম ব্যবহার করে এগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রফতানি করে থাকে। বিজ্ঞাপনের ব্যাপার তো রয়েছে। ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করার জন্য অনেক কিছুই ওরা লিখে থাকে এসব দুধের গায়ে।

বুকের দুধই সন্তানের পক্ষে ভালো­ ডাক্তাররা বিশ্বাস করেন এবং তা মানার জন্য মায়েদের পরামর্শ দেন। মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে দুধ আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। মোটামুটি সুস্থ যেকোনো মা-ই সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। বুকে দুধ না আসা মা ৫০০-তে একজন পাওয়া দুর্লভ। দুধ না আসার ব্যাপারে মা নিজের দুধ দেয়ার চেষ্টা ভালোভাবে করেননি। টাকার ভাব দেখিয়ে অনেকেই জন্মের পরদিনই অনেক দুধ কিনে নিয়ে আসেন। আর আমাদের দেশে এমন অনেক মা রয়েছেন যারা শিশুকে বুকের দুধ না দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। অথচ মায়েরা জানেন না এ দুধের কারণে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ করে মেমরি সেলের মতো শিশুও দুধের কারণেই মাকে কাছে টানে বেশি।
যেসব মায়ের দুধ না আসে তাদের ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন। অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর পানি, মানসিক চিন্তার ফলে, কিংবা শিশুর মুখ স্তনবৃন্তে দেয়া হলে দুধ এসে যায়। স্তনে গরম বা ঠাণ্ডা সেকও দেয়। যদিও এর ভূমিকা নিয়ে এখনো সন্দেহ কাটেনি চিকিৎসা শাস্ত্রে। মায়ের দুধের বিকল্প কোনো দুধ হতে পারে না। বেবিফুডের চেয়ে মায়ের দুধের প্রোটিনে কেসিন কম থাকে। এর ফলে শিশুর হজম ভালো হয়। মায়ের দুধে ল্যাকপেজ কম থাকায় শরীরে সল্ট বা লবণও কম জমে। মায়ের দুধের চর্বিতে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, লেনোলেইক অ্যাসিড ও ভিটামিন ই থাকে­ যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। মায়ের দুধে Ca, Fe ঘটিত লবণ, শিশুর শরীরে ভালোভাবে শোষণ হয়। মায়ের দুধে Na-এর পরিমাণ নিরাপদভাবে কম বলে নবজাতক শিশুর বৃক্কে সমস্যা হয় না। বেবিফুড কখনো রোগ প্রতিরোধে লিম্ফোসটি, অ্যান্টিবডি থাকে না। যা মায়ের দুধে থাকে তাই বেবিফুড খায় এমন শিশুর ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, সিগেলা দিয়ে সংক্রমিত হয়। নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের বেলায় দেখা যায় এর আর্থিক সঙ্কটের ব্যাপার। তবু কষ্ট করে খাওয়ান বাবা-মায়েরা। শুধুই বিজ্ঞাপনের লোভে। শিশুকে বুকের দুধ দিলে সৌন্দর্যহানির ভয় করেন যে মহিলারা তাদের জন্য বলছি এটা নিতান্তই একটি ভুল ধারণা মাত্র। গর্ভাবস্থায় মায়ের দেহে চর্বি সঞ্চিত হয় যা শিশুকে স্তন্য পান করালে চলে যায়। আর এ চর্বি গেলে মায়ের শরীর তন্বী আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। যেসব মা বুকের দুধ দেন না তাদের অবেসিটিতে ভোগার সম্ভাবনা থাকে। স্তনের সৌন্দর্যের ব্যাপারে বলছি, এটি নির্ভর করে মূলত মায়ের বয়স ও পুষ্টি ও হরমোনের ওপর। মায়েরা অন্তত আপনার শিশুকে ছয় মাস পুরোপুরি বুকের দুধ খাওয়ান।

**************************
ডা. মোঃ ইসহাক বাবু
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৬ নভেম্বর ২০০৮।