১৭ নভেম্বর পালিত হলো বিশ্ব খিঁচুনি দিবস। এ রোগ সম্পর্কে আমাদের নানা রকম ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়াই হচ্ছে এ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। খিঁচুনি মস্তিষ্কের স্মায়ুতন্ত্রের জটিলতাজনিত একটি সাধারণ রোগ। সুস্থ ও স্বাভাবিক একজন লোক যদি হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে কাঁপুনি অথবা খিঁচুনির শিকার হয়, চোখ-মুখ উল্টে ফেলে কিংবা কোনো শিশুর চোখের পাতা স্থির হয়ে যায়, একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে অথবা মানসিকভাবে সুস্থ কোনো লোক অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে-তবে তাকে খিঁচুনির রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এসব অস্বাভাবিকতা মস্তিষ্কের অতিসংবেদনশীল কোষের উদ্দীপনার ফল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর দুই মিলিয়ন মানুষ নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

খিঁচুনি একটি পরিচিত রোগ। প্রতি ২০০ জনের মধ্যে একজন এতে আক্রান্ত হতে পারে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যদি একটি শহরের জনসংখ্যা ৫০ হাজার হয়, তবে সেখানে প্রতিবছর ২৫ জন নতুন করে খিঁচুনির রোগী দেখা যায়।

জ্বরের সময় খিঁচুনিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ জন, সারা জীবনে অন্তত খিঁচুনিতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১০০ জন এবং প্রকৃত খিঁচুনির রোগী পাওয়া যায় ২৫০ জন। এই রোগীদের শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগের বয়স ১৫ বছরের নিচে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে খিঁচুনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নইলে এটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।

যেসব কারণে খিঁচুনি হতে পারে
আমাদের শরীরের সব কাজ পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের স্মায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে। কোনো কারণে মানবদেহের কার্যপরিচালনাকারী মস্তিষ্কের স্মায়ুতন্ত্রের উদ্দীপক ও নিবৃত্তিকারক অংশদ্বয়ের কার্যপ্রণালীর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে খিঁচুনি রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

মস্তিষ্কের অতিসংবেদনশীলতা ছাড়াও ব্রেন টিউমার, স্ট্রোক, মাথায় আঘাত ও রক্তপাত, রক্তশিরার সমস্যা, ব্রেনের পুরোনো ক্ষত, ইনফেকশন, মাত্রাতিরিক্ত জ্বর, মানসিক প্রতিবন্ধিতা, আলঝাইমার, নেশাজাতীয় ওষুধ সেবন, শরীরের লবণ, ভিটামিন বা খনিজ পদার্থ হ্রাস পাওয়া এবং ডায়াবেটিস থেকেও খিঁচুনি রোগ দেখা দিতে পারে।

বংশানুক্রমেও খিঁচুনি রোগ দেখা দিতে পারে।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনে দুজন খিঁচুনি রোগে আক্রান্ত হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু বাবার দিক থেকে শিশুর খিঁচুনি রোগে আক্রান্ত হাওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি, আর শুধু মায়ের দিক থেকে শিশুর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা শতকরা পাঁচ ভাগেরও কম।

বাবা-মা উভয়েরই খিঁচুনি রোগ থাকলে এ আশঙ্কার হার কিছুটা বাড়লেও এটা বলা যায় না যে খিঁচুনি রোগ একটি বংশানুক্রমিক রোগ। অনেক সময় বাবা-মা কারও এ রোগ নেই, কিন্তু জন্মের সময় ত্রুটিযুক্ত মস্তিষ্কের গঠনের কারণেও এ রোগ দেখা দিতে পারে।

গর্ভকালে শিশু কিংবা শিশু গর্ভে ধারণ করা অবস্থায় মা খিঁচুনিতে আক্রান্ত হলে শিশুর জন্মের প্রথম মাসে খিঁচুনি দেখা দিলে বা মস্তিষ্কে আঘাত লাগলে কিংবা অক্সিজেনের ঘাটতি হলে শিশুর খিঁচুনি রোগ দেখা দিতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন খিঁচুনি হয়েছে
একজন খিঁচুনি রোগীর মধ্যে নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক লক্ষণ দেখা যেতে পারেঃ শরীর শক্ত হয়ে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যাওয়া, হঠাৎ নমনীয়ভাবে ঢলে পড়া, হঠাৎ শরীরের কোনো অংশে খিঁচুনি শুরু হওয়া বা পর্যায়ক্রমে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া, ছোট বাচ্চাদের শরীরে হঠাৎ ঝাঁকুনি খাওয়া, কাজে ঘন ঘন অমনোযোগী হয়ে পড়া, হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করা এবং হাত-পা ও মুখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া শুরু হওয়া, শরীরের কোনো স্থানে ভিন্ন ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া।

উল্লেখ্য, এ রোগের লক্ষণগুলো অন্য কোনো কারণেও প্রকাশ পেতে পারে। তবে খিঁচুনি রোগের ক্ষেত্রে সব সময় এসব লক্ষণ প্রকাশ পায় বলে এগুলো কোনো ব্যক্তির মধ্যে নিয়মিতভাবে দেখা দিলে তাকে খিঁচুনির রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

সাবধানে রাখুন রোগীকে
খিঁচুনি একটি রোগ, যা হঠাৎ করে যেকোনো পরিস্থিতিতে রোগীকে আক্রমণ করতে পারে এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেয়। ফলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনের ঝুঁকি অনেক বেশি। আর এ ঝুঁকি কমাতেই একদিকে যেমন রোগীর জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আবশ্যক, সেই সঙ্গে পারিপার্শ্বিক মানুষেরও করণীয় রয়েছে অনেক কিছু। সাধারণত খিঁচুনি শুরু হওয়ার পর নিজ থেকে থেমে যায়। খিঁচুনি হলে সেটি থামানোর জন্য শক্তি প্রয়োগ রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর ফলে তার মাংসপেশি ছিঁড়ে যাওয়াসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে।

খিঁচুনির সময় কিছু বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। যেমনঃ রোগীকে আগুন, পানি, ধারালো অস্ত্র, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি থেকে দূরে রাখতে হবে। চোয়াল বন্ধ হয়ে গেলে জোর করে খোলার চেষ্টা করা উচিত নয়, রোগীর মুখে চামড়ার জুতা, গরুর হাড়, লোহার শিক-এগুলো চেপে ধরা উচিত নয়।

এতে রোগীর ভালোর চেয়ে মন্দ হয় বেশি। খিঁচুনি রোগ হঠাৎ শুরু হয়ে আপনা-আপনি থেমে যায়। এ জন্য বাড়তি কিছু, যেমনঃ মাথায় পানি দেওয়া, হাত-পা চেপে ধরে ওষুধ খাওয়ানো-এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। রোগীকে নিজের মতো ছেড়ে দিতে হবে, রোগীর আশপাশে যেন ধারালো যন্ত্রপাতি, অস্ত্র বা আগুন, ইট-পাথর না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এসবের কারণে রোগী আঘাত পেতে পারে। রোগী রাস্তায় থাকলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। খিঁচুনির স্থায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি রাখুন, কৌতূহলী মানুষকে দূরে রাখুন, রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল হোন, তাকে সাহায্য করুন এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করুন। এ ছাড়া রোগীকেও সব সময় সাবধান থাকতে হবে, যেন মৃগীতে আক্রান্ত হয়ে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

এ জন্য সব সময় নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর-সংবলিত পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। যানবাহনে কিংবা রাস্তাঘাটে চলাচলে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।

শিশুর খিঁচুনি হলে বিশেষ গুরুত্ব দিন
খিঁচুনি রোগের লক্ষণগুলো প্রথমবারের মতো দেখা দিলে শিশুকে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। কারণ কোনো ধরনের খিঁচুনিতে শিশু আক্রান্ত বা আদৌ খিঁচুনি রোগ না অন্য কোনো সমস্যা-এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা দেন। শিশুকে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে, যদি খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়, শিশু একনাগাড়ে অনেকক্ষণ ধরে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে কিংবা অচেতন থাকে, খিঁচুনির সময় শিশু কোনোভাবে যদি আহত হয়, শিশু যদি প্রথমবারের মতো খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়।

খিঁচুনি রোগ নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিদ আত্রেয় এবং পরে প্রাচীন গ্রিসের হিপোক্রেটাস প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময়ই তাঁরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, খিঁচুনি রোগ আসলে একটি মস্তিষ্কের রোগ, অন্য কিছু নয়। এর পরও এই রোগের কুসংস্কারমূলক বিশ্বাসগুলো শতাব্দী ধরে মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে।

আমাদের দেশে গ্রামেগঞ্জে, এমনকি শহরেও অনেকে মনে করে, মৃগী রোগ এক ধরনের অভিশাপ। এমনকি এই একবিংশ শতাব্দীতেও একজন খিঁচুনির রোগীকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। খিঁচুনি অন্য সাধারণ রোগগুলোর মতোই একটি রোগ এবং এই রোগীদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। সব ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার ত্যাগ করে খিঁচুনি রোগীকে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য। শিশুদের খিঁচুনি হলে বাবা-মার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া যায়। 
 

**************************
অধ্যাপক ডা: মাহমুদ এ চৌধুরী
শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল
মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম
প্রথম আলো, ১৯ নভেম্বর ২০০৮।