কের ওপর ভাঙ্গা গড়ার খেলা চলছেই, উজ্জীবিত হচ্ছে, ঝরে পড়ছে ত্বক কোষ, বছরের পর বছর, তবু একদিন বয়সের ছাপ পড়ে ত্বকের ওপর। বয়স বাড়লে ত্বক পাতলা হয়, কোলাজেনহানি হয়, হানি হয় ইলাস্টিন, উপস্তকের নোঙরটি ঝুলে যায়। সংযোজক তনুগুলো দৃঢ় হয়, দুর্বল হয়, এলোমেলো হয়। দীর্ঘদিন রোদে পুড়লে ত্বকের বুড়ো হওয়া দ্রুত হয়, দশ বছর এগিয়ে যায়। তাই রোদে পুড়বেন কম, বুঝেশুনে।

আমাদের সারা শরীরকে মুড়ে রেখেছে ত্বক। এর বর্ণ নিয়ে কত না দ্বন্দ্ব। কালো না ধলা এ দুইয়ের মধ্যে বিদ্বেষ, হিংসা। শ্বেতকায় লোক তো কৃষ্ণকায়দেরকে দাবিয়ে রাখতে চায়, করতে চায় শোষণ। কিন্তু ধলাদের অসুবিধাও আছে। রোদে পুড়ে বাদামী হবার বাসনায় এরা বাঁধিয়ে ফেলে অনেক সময় প্রাণনাশী রোগ। মেলানোমা। কালো বা বাদামীদের রোদে পুড়ে এমন বিপর্যয় ঘটে কদাচিত।

লড়্গ লড়্গ ডলার খরচ হয় প্রতিদিন মেকআপ ও স্কিনকেয়ার প্রসাধনিতে। তবু একটা জিনিস অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়ঃ অতিবেগুণী রশ্মির বিরিদ্ধে সুরক্ষা।

ত্বক হল দেহে সর্ববৃহৎ অঙ্গ। হ্নৎপিন্ড, যকৃৎ, মগজের মতই দেহের একটি অঙ্গ। ত্বক যখন দগ্ধ হয়, কি ভয়ানক বিপর্যয় ঘটে। একটি ফুসফুস ছাড়া জীবন বাঁচে কিন্তু ত্বক ছাড়া বাঁচা যায় না।

পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং ’Skin: A Natural History’ গ্রন্থের প্রণেতা নিনা জি, জ্যাবলনস্কির মতেঃ ‘দেহের অঙ্গ বা দেহযন্ত্রের সংজ্ঞা হলো এক সারি টিস্যু যা একই লক্ষ্যে একত্রে কাজ করে এবং এদের রয়েছে রক্ত ও স্নায়ুর নিজস্ব সরবরাহ।’ ‘ত্বক সেরকমই’ তার বক্তব্যঃ ‘এর রয়েছে নিজস্ব রক্ত সরবরাহ, নিজস্ব স্নায়ু সরবরাহ এবং নিজস্ব দায়বদ্ধতা, অনেক দায়, বিস্ময়কর তো বটেই।’

দেহের বহিরঙ্গ তো ত্বক, অসংখ্য রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যুহ। দেহের অন্দরকে তো সুনসান রাখে এই ত্বক, রাখে আবৃত, দেহ তরল থাকে আবদ্ধ, দেহের ভেতরে নিজস্ব ছোট্ট সাগরে উঠে কত ঢেউ, ঘটে কত নব নব ঘটনা!

রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক যিনি ত্বক ও কেশের জীবতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন, এলিন ফাক্স বলেন, ‘আমাদের যদি ত্বক না থাকতো, তাহলে জলশূন্য হতে হতে মৃত্যু হতো আমাদের।’

অসংখ্য সংজ্ঞাবহ গ্রাহকে পরিপূর্ণ এই ত্বক হলো অন্দর ও বাইরের সেতুবন্ধ, নিজেকে সতর্ক করে এই স্নায়ুগুলো আর ইশারা জানায় অন্যদের।

শিশুর ত্বকে যখন মার শরীরের ছোঁয়া লাগে, শিশু তখন ভালোবাসার অর্থ বোঝে। শেখে ভালোবাসা, শেখে ভালোবাসতে।

মাপ-পরিমাপ করে বলা যায়, ত্বক হলো শরীরের সবৃবৃহৎ অঙ্গ, পুরো এলাকা গড়ে ২০ বর্গফুটওজন প্রায় ৯ পাউন্ড। এর মধ্যে রয়েছে বিশ ধরনের কোষঃ দুইটি মৌলিক ক্ষেত্র এদের পাতলা অংশটি আমরা দেখতে পাই আর নিচে রয়েছে পুরু অংশটি।

সবচেয়ে উপরের স্তর হলো উপত্বক বা epidermis  তবে এর ঘনত্বের বা স্তরের স্থান বিশেষে তারতম্য হয়, করোটিত্বকে খুব পাতলা মাত্র পাঁচটি কোষের স্তর আবার হাতের তালু এবং পায়ের গুলির ওপরের ত্বক খুব পুরু শত শত কোষের স্তরে বিন্যস্ত।উপত্বক অনবরত ওপর থেকে ঝরছে, আবার নতুন করে গড়ে উঠছে উপস্ত্যক অন্তত্বক থেকে বিভাজিত আদিকোষগুলো নির্মাণ করে নতুন আবরণ। চারসপ্তার মধ্যে নির্মাণস্থল থেকে ছাড়া পায় নতুন ত্বক কোষগুলো, উঠতে থাকে উপরদিকে, কোষের মল ও বর্জ ঝরতে থাকে, কোষের শক্ত প্রোটিন কেরাটিন আর দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলে, তেলতেলে কিছু চর্বি যোগ হয়, গড়ে তোলে আবরণ।

উপস্তকে আরো রয়েছে মেলানোসাইটস। এই কোষ থেকে ত্বকে তৈরি হয় মেলানিন রঞ্জক এই রঞ্জকের কারণেই আমরা কেউ নানাবর্ণের, কেউ বাদামী, কেউ কালো। অতিবেগুণী রশ্মি বেশি ত্বকে পড়লে তা থেকে ত্বকের প্রাথমিক সুরক্ষর অস্ত্র হলো মেলানিন।

বেশিরভাগ প্রাণী, শিম্পাঞ্জির কথাও যদি বলি, কেশবৃন্তের চারধারেই হয় মেলানিন উৎপাদন, দেখেন প্রাণীদের শরীরের লোম কত রঙিন অথচ ত্বক অনেক হালকা, অনেক ফর্সা। ডাঃ জেবলোনক্সির বলেন, আদিম মানুষদের জন্তুদের শিকারের জন্য অস্ত্র নিক্ষেপ করতে হতো। খুব শ্রমের জীবন ছিলো। শিকার করা, খাবার যোগাড় করার সেসব দিন। ঘাম ঝরতো শরীরে, রোদে পুড়তে হতো, সুরক্ষার মেলানিন উৎপাদন হলো ত্বকে।

ত্বকের নিচে তৈরি হয় ভিটামিন ডি আর এজন্য প্রয়োজন রোদের অতিবেগুণী রশ্মি তবে ত্বক বিজ্ঞানীরা বলেন, সপ্তাহে মাত্র ২০ মিনিট রোদে থাকলেই কাজটি হয়ে যায়। উপস্তকের নিচে রয়েছে ‘ডার্মিস’। এই স্তরটি পুরু। এতে রয়েছে রক্তনালীর জালের জঙ্গল, স্নায়ু ও স্বেদগ্রন্থির, কেশবৃন্ত, পাইলোইরেকটার পেশীর বন। এই পাইলোইরেকটার পেশীর টানেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ত্বকের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ‘কোলাজেন’।, এই প্রোটিনগুলো দেখতে অনেকটা পাকানো দড়ির মত ডার্মিসকে নোঙর করে রাখে উপস্তকের সঙ্গে। এছাড়া রয়েছে প্রোটিন ‘ইলাস্টিন’, এর শক্তিতেই ত্বককে টান করলে আবার ফিরে আসে স্বস্থানে।

ত্বকের ওপর ভাঙ্গা গড়ার খেলা চলছেই, উজ্জীবিত হচ্ছে, ঝরে পড়ছে ত্বক কোষ, বছরের পর বছর, তবু একদিন বয়সের ছাপ পড়ে ত্বকের ওপর। বয়স বাড়লে ত্বক পাতলা হয়, কোলাজেনহানি হয়, হানি হয় ইলাস্টিন, উপস্তকের নোঙরটি ঝুলে যায়। সংযোজক তনুগুলো দৃঢ় হয়, দুর্বল হয়, এলোমেলো হয়। দীর্ঘদিন রোদে পুড়লে ত্বকের বুড়ো হওয়া দ্রম্নত হয়, দশ বছর এগিয়ে যায়। তাই রোদে পুড়বেন কম, বুঝেশুনে।


************************************
লেখকঃ অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা।
উৎসঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ নভেম্বর ২০০৭