প্রকৃতির রাজ্যে নানা বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রতিনিয়তই চলছে। নিয়মের ব্যতিক্রম আমাদের মাঝেমধ্যে নিয়মের কথাই পুনরায় ্নরণ করিয়ে দেয়। নবজাতকের গঠনের সামান্য থেকে বড় ব্যতিক্রম বিভিন্ন লক্ষণ দেখে শনাক্ত করা যায়। নবজাতকের গঠনের কিছু বিচ্যুতি একটু সাবধান হলেই নির্ণয় করা সম্ভব। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ গঠনবিচ্যুতির কথা আজ তুলে ধরা হলো।

ঠোঁটকাটা
যদিও ঠোঁটকাটা শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে, আসলে এখানে ঠোঁট কাটা যায় না, বরং ওপরের ঠোঁটের কিছু অংশ তৈরিই হয় না। প্রতি হাজারে একটি শিশু এ সমস্যা নিয়ে জন্ম নিতে পারে। অনেক সময়ই বংশগত একটা প্রবণতা এ রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায়। বিশেষ করে মা মৃগীরোগের জন্য চিকিৎসাধীন থাকলে এ রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

তালুকাটা
ঠোঁটকাটা না থাকলে তালুকাটা জন্মের সময় ধরা নাও পড়তে পারে। তালুকাটা প্রতি হাজারে একজন বাচ্চার ক্ষেত্রে ঘটতে পারে। আবার তালুকাটারও রকমফের আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তালুর সামনের অংশ দাঁতের মাঢ়িসহ কাটা থাকতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে আলজিভ থেকে তালুর পেছনের অংশও কাটা থাকতে পারে। সব নবজাতককেই জন্মের পর তালুকাটার জন্য পরীক্ষা করতে হবে। এমনকি বাহ্যিক তালুকাটা দেখা না গেলেও আলজিভ দ্বিখণ্ডিত থাকলে বুঝতে হবে, মিউকাস ঝিল্লির নিচে তালুও দ্বিখণ্ডিত আছে।
কোন বয়সে ঠোঁট ও তালুকাটার চিকিৎসা করতে হবে, এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

অতীতে ১০-এর নামতা বলে একটি নিয়ম তালু ও ঠোঁটকাটার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। অর্থাৎ ঠোঁট কাটা থাকলে অস্ত্রোপচার করতে হবে ১০ সপ্তাহ বয়সে ১০ পাউন্ড ওজন হলে, আর তালুকাটার ক্ষেত্রে ১০ মাস বয়সে ১০ কেজি ওজন হলে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যত দ্রুত সম্ভব জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যেই ঠোঁটকাটার চিকিৎসা করানো উচিত। এমনকি অতিশব্দ (আল্টাসাউন্ড) পরীক্ষার মাধ্যমে মাতৃগর্ভে নির্ণয় করে সে অবস্থাতেই শল্যচিকিৎসার একটি চিন্তাভাবনাও চলছে। শিশু ও প্লাস্টিক সার্জনরা সাধারণত এসব শল্যচিকিৎসা করে থাকেন। দাঁতের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও দরকার হয়।

অসম্পূর্ণ খাদ্যনালি
অনেক সময় খাদ্যনালি পাকস্থলীতে গিয়ে শেষ না হয়ে মাঝপথে একটি বন্ধ বেলুনের মতো শেষ হয়ে যায়। জন্মের আগেই অতিশব্দ পরীক্ষায় মাতৃজঠরে অত্যধিক পানি দেখা গেলে এটা সন্দেহ করা যেতে পারে। যদি খাদ্যনালি পুরো বন্ধ না হয়ে এর সঙ্গে শ্বাসনালির সংযোগ থাকে, তাহলে পাকস্থলীতেও গ্যাস দেখা যাবে। জন্মের পর এ ধরনের বাচ্চাদের মুখে ফেনা দেখা যায়। ঠোঁটের রং কালো হয়ে যায়। লালা গড়িয়ে পড়ে এবং খাওয়াতে গেলে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এসব বাচ্চার নাক দিয়ে পাকস্থলীতে নল ঢোকাতে গেলে তা কিছুদূর গিয়ে আটকে যায়। এ বিষয়টি এক্স-রে করলে ধরা পড়ে। এসব বাচ্চার যত্নের জন্য মাথা ওপরে তুলে রাখতে হয়। নল দিয়ে খাদ্যনালির বন্ধ অংশ থেকে ক্রমাগত তরল সেচে আনতে হয়। রক্তে গ্লুকোজ ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য যথাযথ তরল শিরায় দিতে হয়। অবস্থা থিতু হলেই এদের অস্ত্রোপচারের জন্য সার্জনের কাছে পাঠাতে হবে। এক হাজার ৫০০ গ্রামের চেয়ে বেশি ওজনের বাচ্চাদের অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে অস্ত্রোপচারে ভালো হয়ে যাওয়ার ৯৭ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।

সরু পাইলোরস
এটি সাধারণত জন্মের পরপর বোঝা যায় না। নবজাতক বয়সের শেষের দিকে এটি দেখা যায়। জন্মের পর তুলনামূলক সুস্থ একটি বাচ্চা তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে এমন বমি শুরু করে যে পাকস্থলীর ভেতরের খাবার ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। প্রায়ই শিশু পানিশূন্যতায় ভোগে। বাচ্চার চেহারায় দেখা যায় অস্থিরতা এবং গোগ্রাসে খায় সে। শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্যহীনতা প্রায়ই এ রোগীর জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। খাওয়ার পর এ রোগীর পেটে হাত রাখলে রসুনের মতো একটি গোটা হাতে লাগে। অন্ত্রের নড়াচড়া ও ঢেউয়ের মতো চোখে পড়ে। অতিশব্দ পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষ পরীক্ষক রোগ নির্ণয় করতে পারেন। সাধারণত এর শল্যচিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

জন্মগত স্কীত বৃহদন্ত্র
এটি হার্সপ্রাংগের রোগ নামেও পরিচিত। এতে বৃহদন্ত্রের শেষাংশে স্মায়ুকোষ ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় এর নড়াচড়া শ্লথ হয়ে যায়। মল বের হতে না পেরে এ অংশটি স্কীত হয়ে যায়। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পায়খানা না হলেই সন্দেহটি মাথায় আনতে হবে। এ সময় পেট ফুলে যায়। বমি হয়। বমি শেষ পর্যন্ত পীতবর্ণ হয়ে যায়। সাধারণ এক্স-রে বা বর্ণিল রাসায়নিক দিয়ে এক্স-রে করে রোগ নির্ণয় সম্ভব। জন্মের পরপরই শল্যচিকিৎসার ওপর বর্তমানে জোর দেওয়া হচ্ছে।

হার্নিয়া
অন্ত্রের কিছু অংশ অণ্ডকোষে নেমে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত শল্যচিকিৎসা প্রয়োজন।
অনেক সময় নাভির ভেতর অন্ত্রের কিছু অংশ চলে আসে। দেখতে খারাপ দেখালেও প্রায় ক্ষেত্রে এর কোনো চিকিৎসার দরকার নেই।

অন্তত চার বছর বয়স পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা যেতে পারে। যেসব সমস্যা সাধারণ দৃষ্টিতে চোখে পড়ে, এ রকম কিছু বলা হলো। এর বাইরেও যেকোনো অস্বাভাবিক দেখলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 
 

**************************
ডাঃ মাহবুব মোতানাব্বি
নবজাতক ও শিশুবিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রথম আলো, ০৪ মার্চ ২০০৯।