এখনকার মা দিদিরা আর বলেন না, ‘পেট ভরে খাস, বাবা’। খেতে বসে খাওয়ার শেষে তৃপ্তির ঢেকুর না তুললে যেন খাওয়াই হলো না। আজকাল গুরুজনরা বলেন, পেট ভরার আগেই উঠে যাস। এতো খাসনে। পেট যেন একটু খালি থাকে। সবাই এখন কমবেশি স্বাস্থ্য সচেতন। সবাই জানেন, পেটভরে খাওয়া মানে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ হয়ে গেল। আর একটা কথা খুব বেশি বসে থাকলে বা দীর্ঘক্ষণ বসে বসে থাকলেও ক্যালোরি খরচ কমে যায়। তাই সাধারণ জ্ঞানে বলতে পারেন, আহার ও জীবনযাপনের এই দুটো অভ্যাস থাকলে শরীরের ওজন বাড়বেই। যাহোক সাম্প্রতিক দুটো গবেষণা থেকে দেখা গেছে, বসে থাকা ও আহার এ দুটো অভ্যাস আলাদাভাবে কিরকম প্রভাব ফেলে শরীরের ওজন বাড়ার উপর। এ দুটো গবেষণার একটি থেকে দেখা গেছে, বেশ অনেকক্ষণ বসে থাকলে ওজন বাড়তে পারে শরীরের, আর অন্য গবেষণা থেকে দেখা গেছে, খুব তাড়াতাড়ি খেলেও কি করে ওজন বাড়ে।

খুব বেশিক্ষণ বসে থাকা

‘ডায়াবেটিস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গবেষকরা বলেছেন, আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ বসে বসে থাকি, তখন মেদকে দহনের জন্য যে রাসায়নিক ভূমিকা রাখে, এর কাজকর্ম প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। আর সমস্যা হলো, দিনের শেষভাগে ব্যায়াম করলেও এই বেশি সময় বসে থেকে থেকে দেহের ক্ষতি হলো যা, একে খণ্ডন করা যাবে এমন গ্যারান্টি নাই।

ঠিকইতো, শরীর চর্চা না করা এবং শুয়ে-বসে থাকা জীবন ইতিমধ্যে জনগণের স্বাস্থ্যের উপর বেশ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আরো যে খারাপ হচ্ছে তা হলো, আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতি এবং এর সহজলভ্যতা, উঁচুতলা বাড়িতে বেশি বেশি ইলিভেটার ও এসকেলাটার, গাড়িতে পাওয়ার স্টিয়ারিং ও অটোউইনডো, রিমোট কন্ট্রোল, আরো আছে আধুনিক জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা, বিলাস, কম্পিউটার ও ক্যাবল টিভি, শত সহস্র চ্যানেল- এসব বেশিরভাগ মানুষের শরীরচর্চা ও শরীরকে খেলানোর সুযোগ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এসব উপাদান মিলে মেদ স্থূলতা, হৃদরোগ ও অন্যান্য জীবনযাপনও খাদ্য সম্পর্কিত অসুস্থকে তুঙ্গে তুলে ধরেছে জনগণের মধ্যে।

তবে সুখের কথা হলো, উপবেশন আসন থেকে নেমে হাঁটাচলা করলে, অল্পকিছু সময়ের জন্যও সচল হলে খাবার সূচিত হয় মেদকে দহনের প্রক্রিয়া।

সম্ভাব্য সমাধান? যদি চাকরি এমন হয় যে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয় এক সাথে, তাহলে ব্যবহার করুন এমন কম্পিউটার সফটওয়্যার যা মনে করিয়ে দেবে ৩০-৪৫ মিনিট পর পর যে এবার উঠতে হবে, হাত-পা ছুঁড়তে হবে, স্ট্রেচিং এবং অল্প একটু হাঁটতে হবে। এ খুব বড় কাজ না, কষ্টও না, তবে পরিণতিতে এই সহজ-সরল নিয়ম মানলে স্বাস্থ্যের ওপর অনেক প্রভাব ফেলবে তো বটেই। এছাড়া প্রতিদিন আর একটু বেশি সময় হাঁটুন, হাঁটুন জোরে, কয়েকটি সিঁড়ি বেশি বেয়ে উঠুন। প্রতিদিন এমনি একটু বেশি বেশি শরীরটা সুফল আনবে শেষমেশ।

খুব দ্রুত আহারঃ

জাপানে একটি গবেষণা হয়েছিল এ নিয়ে। প্রকাশিত হয়েছিল ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে, এতে গবেষকরা দেখেছিলেন যে, যেসব লোক খুব তাড়াতাড়ি আহার করেন এদের শরীর বেশ ভার হয়ে যায়। তাই কতটুকু খেলেন, কি কি খেলেন তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কিভাবে খাবারকে গলাধঃকরণ করলেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

৩০০০ লোক যাদের বয়স ৩০-৬৯ বছরের মধ্যে এদের আহারের অভ্যাস পর্যালোচনা করে গবেষক দল পেলেন যে, যারা গোগ্রাসে খাবার দ্রুত গিলেছেন এবং উদরপূর্তি করেছেন এদের স্থূল হবার সম্ভাবনা, যারা ধীরে এবং পেট পুরো না ভরে খেয়েছেন, এদের তুলনায় তিনগুণ বেশি।

আবার, আমাদের সমাজ ও জীবনধারার বর্তমান অবস্থা একটি বড় ভূমিকা রাখে, সন্দেহ নেই। আমাদের অনেকেই আর ঘরে খাবার টেবিলে বসে ধীরে-সুস্থে আহার করি না। জীবনটা এখন শশব্যস্ত, আহার করা মানে যেন বেঁচে থাকার জন্য কিছু মুখে দেয়া। আমরা প্রায়ই ফাস্ট ফুড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোক-ফান্টার পানির সঙ্গে গলা দিয়ে নামিয়ে দিলেই বাঁচি।

সম্ভাব্য সমাধান কি হতে পারে? গবেষক দল উপসংহারে বলেছেন, মা-বাবারা তাদের সন্তানদেরকে ধীরে ধীরে খেতে উৎসাহিত করবেন, এছাড়া শান্ত পরিবেশেও আহার করতে বলবেন। আমাদের সবার জন্যই আহারের নিয়ম ও পরিবেশ এমনই হওয়া উচিত।

মন লাগিয়ে খাওয়া একটি অভ্যাসের ব্যাপার বটে, স্বাস্থ্যের কুশলের জন্য দরকারী তো অবশ্যই। এছাড়া, প্রতিটি গ্রাসের স্বাদ নেয়া ও এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগও এভাবে আসে। এই ক্ষুদ্র অভ্যাস পরিশেষে আমাদের স্বাস্থ্যের উপর বড়রকমের হিতকরী প্রভাব ফেলে তো বটেই।

**************************
অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস,
বারডেম, ঢাকা।
E-mail: Subhagata@msn.com
Subhagata@dab-bd.org
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭ মার্চ ২০০৯।