সস্তায় পুষ্টি
সবুজ পাতা জাতীয় সবজি (Green leafy vegetable) ভালো স্বাস্থ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুষ্টিকর খাদ্য যা রোগ প্রতিরোধের ভূমিকা রাখে। সবুজ পাতা জাতীয় সবজির মধ্যে পুষ্টিগত দিক থেকে জনপ্রিয় হলঃ

১। পালংশাক ২। লাউ শাক ৩। ডাঁটাশাক

৪। পুঁইশাক ৫। মেথি শাক ৬। পুদিনা পাতা ও ৭। ধনিয়া পাতা উল্লেখযোগ্য।

এগুলো খনিজ উপাদান ও আয়রনে ভরপুর।

মা ও শিশু

আমাদের দেশে স্বল্পআয়ের পরিবারে গর্ভবতী মা, দুগ্ধদানকারী মা ও শিশু আয়রনের অভাবে মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

রক্তস্বল্পতাঃ আয়রনের অভাবে ৭৪% মহিলা, ৮০% গর্ভবতী মহিলা এবং ৭৩% পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

অন্ধত্বঃ ভিটামিন ‘এ’র অভাবে প্রতিবছর ৩০,০০০ শিশু অন্ধ হয়ে পড়ছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশু অন্ধ হয়ে পড়ার পর মারা যায়।

রক্তস্বল্পতা ও অন্ধত্বের কারণঃ এর প্রধান কারণ হলো ছোট ছেলে-মেয়েদের ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ শাক-সবজি খাওয়ানো হয় না এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা চাহিদা অনুযায়ী আয়রন জাতীয় খাবার গ্রহণ করেন না।

রক্তস্বল্পতা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধঃ আমরা অনেকেই জানি না যে প্রত্যেকদিন খাদ্য তালিকায় সবুজ শাক ও সামান্য লেবু যুক্ত করে রক্তস্বল্পতা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা যায়।

পুষ্টিমূল্যঃ সবুজ পাতা জাতীয় সবজিতে পাওয়া যায়ঃ

১। আয়রন ২। ক্যালসিয়াম ৩। বিটা ক্যারোটিন (ভিটামিন-এ) ৪। ভিটামিন-সি ৫। বি-কমপ্লেক্স।

গুরুত্বপূর্ণ কাজ

১। অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে। ২। রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।

পুষ্টিমূল্য শোষণের ধারণা

ছোট ছেলে-মেয়ে, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি মায়ের পাতা জাতীয় সবজি (এখঠ) রান্নায় একটু বেশি তেল ব্যবহার করতে হবে ও খাবারের সময় ১ টুকরো লেবু খেতে হবে। তবেই ভিটামিন ‘এ’ ও আয়রনের শোষণ বাড়বে। ক্যারোটিন পাওয়া যায় সবুজ শাকে যা শরীরে প্রবেশের পর ভিটামিন-‘এ’তে রূপান্তরিত হয়। এই ভিটামিন ‘এ’ অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে।

সবুজ পাতা জাতীয় শাক-সবজির ভিটামিন ‘সি’ রক্ষা করতে হলে বেশি সময় ধরে শাক রান্না বন্ধ করতে হবে। বেশি সময় ধরে রান্নার ফলে পুষ্টিমূল্য নষ্ট হয়।

সবুজ পাতা জাতীয় সবজির দৈনিক চাহিদা জউঅ (RDA (Recommended dietary allaowance)

প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা-১০০ গ্রাম

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-৪০

শিশু (১-৩ বছর)-৪০ গ্রাম

শিশু (৪-৬ বছর)-৫০ গ্রাম

বালক-বালিকা (১০ বছর) ৫০ গ্রাম।

[উৎসঃ আই,সি,এম আর, ইন্ডিয়া]

পাতা জাতীয় সবজির সম্পর্কের ভ্রান্ত বিশ্বাসঃ

অনেক মা বিশ্বাস করেন শাক বাচ্চাদের ডায়রিয়া তৈরি করে। এই ধারণায় মায়েরা পাতা জাতীয় সবজি খাওয়ান না। মাকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে মাটি এবং পানির মাধ্যমে সবুজ পাতায় ব্যাকটেরিয়ায়, জীবাণু, পোকা-মাকড় এবং অন্যান্য বহিরাগত উপাদান সংস্পর্শে আসে। একে যদি রান্নার আগে পরিষ্কার করে ধোয়া না হয় তবেই এটি ডায়রিয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে।

খাদ্য তৈরিতে সর্তকতাঃ

১। পাতা জাতীয় সবজি রান্নার আগে অবশ্যই ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। (কল ছেড়ে প্রবাহিতে পানির নিচে)

২। শিশুদের বেলায়, শাক রান্নার পর চটকে নরম করে প্রয়োজনে বাড়তি আঁশ ফেলে দিয়ে খাওয়াতে হবে।

৩। সবুজের পুষ্টিমূল্য রক্ষায়-

অল্প সময়ে শাক রান্না শেষ করতে হবে (প্রায় ১৫ মি•) এতে ভিটামিন ‘সি’ এর অপচয় অনেক কমে যাবে।

৪। সবুজ শাক সেদ্ধ করে কখনই পানি ফেলে দেয়া যাবে না, এতে পুষ্টির অপচয় রোধ হবে।

৫। শাক ঢেকে রান্না করতে হবে। এতে আলোর সংস্পর্শে ভিটামিনের কার্যকারিতা নষ্ট হবার সুযোগ কমবে।

৬। রান্নার আগে সবুজ শাক সূর্যের আলোতে ফেলে রাখা যাবে না এতে ক্যারোটিন ভিটামিন ‘এ’ অপচয় রোধ হবে।

৭। শাক ভেজে খাওয়ার অভ্যাস বদলাতে হবে।

সবুজের চাষ

সবুজ পাতা জাতীয় সবজি চাষে সবাই উৎসাহিত হলে সারাবছর ধরেই সস্তায় এবং সহজেই এর সরবরাহ বাড়ানো যাবে। গ্রামে বাড়ির আঙ্গিনায়, রান্নাঘরের পিছনে খালি জায়গায়, শহরে ছাদের টবে, বারান্দার টবে, স্কুলের বাগানে সবুজ পাতা জাতীয় সবজি উৎপাদন করা যেতে পারে।

ফলাফলঃ

সবুজের সঠিক চাষ, সঠিক সরবরাহ ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে রান্না ও চাহিদা অনুযায়ী সবুজ পাতা জাতীয় সবজি গ্রহণের মাধ্যমে এদেশের মায়েদের রক্তস্বল্পতা ও শিশুদের অন্ধত্ব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ফলশ্রুতিতে আমরা পাবো সুস্থ জাতি।

**************************
এসএন শম্পা
কনসালটেন্ট নিউট্রিশনিস্ট
শমরিতা হাসপাতাল,
৮৯/১, পান্থপথ, ঢাকা-১২০৫।
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ মার্চ ২০০৯।