পরিপাকতন্ত্রের শেষ অঞ্চলকে আমরা বলি বৃহদন্ত্র। রেকটাম (পায়ুপথ) ও মলদ্বার। সার্জারির যে শাখাটি এই অঙ্গগুলোর সমস্যা সমাধানে নিবেদিত তাকে বলে কলোরেকটাল সার্জারি। পায়ুপথের বিভিন্ন রোগের ভেতর ক্যান্সার হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক রোগ। এই ক্যান্সারের বিভিন্ন উপসর্গের মধ্যে রয়েছে মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন, খুব সকালে পায়খানার বেগ হওয়া, মলত্যাগের পরও মল রয়ে গেছে এরূপ অনুভূতি হওয়া, পায়খানার সাথে রক্ত ও মিউকাস (আম, শ্লেষ্মা, ল্যালপা) যাওয়া, পেটে ব্যথা, মলদ্বারে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। এ রোগ শনাক্ত করতে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে পাইলস সংক্রান্ত বিভ্রান্তি। রেকটাম ও মলদ্বারের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর বেশির ভাগই ‘আপনার কী সমস্যা?’ জিজ্ঞাসার জবাবে বলবেন­ তার পাইলস হয়েছে। তাদের কেউই এনালফিশার, ফিস্টুলা বা ক্যান্সার হয়েছে বললে সহজে মানতে চান না। পায়ুপথের ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য কোলনস্কোপি, সিগময়েভোস্কপি ও বেরিয়াম এনেমা এক্স-রে করা প্রয়োজন। যত তাড়াতাড়ি এ রোগ ধরা পড়ে চিকিৎসা তত কার্যকর ও সহজ হয়। এ রোগের প্রধান চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন। অনেক শিক্ষিত লোকের ধারণা, ক্যান্সার অপারেশন না করাই ভালো। অপারেশন করলে আরো ছড়িয়ে যায়। এ ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। এখন পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সারের প্রধান চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন। বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সার হলে অপারেশনের সময় কতটুকু কাটতে হবে এবং কী কী টিস্যু এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে তার নীতিমালা নির্ধারণ করা আছে। অপারেশনের পর ক্ষেত্রভেদে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেয়ার প্রয়োজন হয়।

রেকটাম ক্যান্সারের প্রধান চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন। এমনকি যদি মনে হয়, অনেক দিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং রোগী আর মাত্র কয়েক মাস বাঁচবেন তাহলেও অপারেশন করা উচিত। এতে জীবন ধারণের গুণগত মানের উন্নতি হয় এবং রোগী প্রশান্তি লাভ করেন।
এই ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়টি হলো এই, এই অপারেশনের পর রোগী তার স্বাভাবিক পথে মলত্যাগ করতে পারবেন নাকি পেটে মলত্যাগের ব্যাগ (কলোস্টমি) লাগাতে হবে? মলদ্বারের গভীরে ক্যান্সার হলে সাধারণত পেটে ব্যাগ লাগাতে হয় না, কিন্তু ক্যান্সার মলদ্বারের কাছাকাছি হলে পেটে ব্যাগ লাগানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং কখনো কখনো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যে ক্ষেত্রে ক্যান্সার অপারেশনের পর হাত দিয়ে সেলাই করে রেকটাম জোড়া দেয়া যায় না সে ক্ষেত্রে কৌশলগত সমস্যাকে অতিক্রম করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের স্টেপলিং যন্ত্র বানিয়েছেন। এসব যন্ত্রের সাহায্যে হাত দিয়ে সেলাই করা সম্ভব নয়। এমন সব ক্ষেত্রে বৃহদন্ত্র ও রেকটাম জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায়। যার কারণে পেটে কলোস্টমি না করে পারা যায় অর্থাৎ রোগী স্বাভাবিক পথে মলত্যাগ করতে পারবেন। এ যন্ত্রগুলো আমেরিকার দু’টি কোম্পানি বানিয়ে থাকে। বিভিন্ন আকৃতির এগুলো হয়ে থাকে। যেমন­ সাকুêলার স্টেপলার, লিনিয়ার স্টেপলার ও রেটিকুলেটর। যন্ত্রগুলো কিছুটা ব্যয়বহুল। উন্নত দেশে এ যন্ত্রের সাহায্যে রেকটাম ক্যান্সারের বেশির ভাগ অপারেশন হয়ে থাকে। কারণ আর্থিক খরচের ব্যাপারটি তাদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতোমধ্যে দেশেও এ পদ্ধতিতে অপারেশন হচ্ছে। এতে রোগীর মলদ্বার কেটে ফেলতে হয়নি।

আমাদের দেশে পায়ুপথ ক্যান্সার উন্নত দেশ অপেক্ষা অনেক কম হয়। মলদ্বারে রক্ত গেলেই পাইলস হয়েছে এ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। এ রক্ত যাওয়ার কারণ অনেক হতে পারে। যেমন­ পাইলস, এনালফিশার, পলিপ, ক্যান্সার, ফিস্টুলা, আলসারেটিভ কোলাইটিস ইত্যাদি। মলদ্বারে রক্ত যায় এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি সিগময়েডোস্কপি পরীক্ষা করা হয় তাহলে বেশির ভাগ ক্যান্সার আগে ধরা পড়বে এবং চিকিৎসা সহজ ও কার্যকর হবে। সাধারণত দেখা যায় মলদ্বারে রক্ত গেলে পাইলস ভেবে এর ভুল চিকিৎসায় দীর্ঘদিন কাটিয়ে দেন রোগীরা। অবস্থা যখন বেগতিক দেখেন তখনই তারা ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রাজি হন। ততক্ষণে ক্যান্সার বিস্তৃতি লাভ করে যায়।

*************************
অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম ফজলুল হক
লেখকঃ বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। চেম্বারঃ জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৫ মার্চ ২০০৯।