মাতৃত্বই নারীকে পুর্ণ করে। মাতৃত্বের সুচনা নারী মনে জন্ম দেয় এক অনির্বচনীয় অনুভুতির। নিজের মধ্যে আর একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সত্তার আবির্ভাবে স্বভাবতই হয় উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত। শুরু হয় নতুন এক ভুবনের সুচনা, দীর্ঘ ন’মাসের এই সফর শুধুই ভালোবাসা, যত্মের ও সাবধানতার। অজানা ভয়, অনেক সংশয় আর অনেক কৌতুহলেরও। মা হওয়া একজন নারীর জন্য জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম মুহুর্ত। এই সময় মা অনেক স্বপ্নের জাল বোনেন, গর্ভস্হ সন্তানটি দেখতে কেমন হবে, হাসিটা কার পাবে? গায়ের রং কেমন হবে? ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু। সত্যি তো একটি সুন্দর, সুস্হ, সবল শিশু ও সুস্হ মা আমাদের সবারই কাম্য। অথচ পরিসংখ্যান দেয় দুঃখজনক তথ্য। বিশ্বে প্রতি বছর ছয় লাখ মেয়ে প্রাণ দেয় মা হতে গিয়ে। গর্ভাবস্হার কারণে যেসব মা মারা যান তার প্রায় ৯৮/৯৯ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোর। আর বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীতে যে সংখ্যায় মা মারা যান তার ১৫ গুণ অর্থাৎ ৯০ লাখ মা প্রতি বছর প্রেগন্যাসি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোনো না কোনো রোগগ্রস্ততায় ভোগেন আর কিছু ক্ষেত্রে যার ভার বহন করতে থাকেন সারা জীবন ধরে। তাই শারীরিক এই স্হায়ী অসুস্হতার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন অনেক মহিলা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৩ কোটি সক্ষম দম্পতির মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মা মারা যান শুধু অবৈধ ও অনিরাপদ অ্যাবরশনের কারণে। এছাড়াও আমাদের দেশে কত মা যে কুসংস্কার, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন তার হিসাব কে রাখছেন, কতজন মা স্বাস্হ্য সেবার আওতাধীন হতে পারছেন?

সুস্হ-সবল শিশুর জন্ম দেয়া ও সুস্হ থাকা শুধু প্রসুতির নিজের নয়, এই দায়িত্ব বাড়ির সবার, তথা সমাজেরও। বাড়ির নতুন বউটি সন্তানসম্ভবা হয়েছে জানলে বাড়িতে খুশির ঢেউ উঠে, আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির ওপর জারি হয় নানারকম বিধিনিষেধের বেড়াজাল-এটা কর না, ওটা কর না, এসব শুনতে শুনতে বেচারি হবু মায়ের প্রাণ হাঁপিয়ে উঠে। দু’তিনজন সন্তান যে মায়ের আছে, তার প্রতি বাড়ির সবার আচরণ এমন থাকে-আগের বাচ্চাগুলো সুস্হ-স্বাভাবিক হয়েছে তার জন্য বাড়তি কোনো যত্মের প্রয়োজন নেই, এবারকার সন্তানও সুস্হ হবে। অথচ আপনারা কি জানেন মহারানী মমতাজ আগ্রায় তার চতুর্দশ সন্তানের জন্মের ঠিক পরপরই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান, এর পরের ইতিহাস তো সবার জানা। সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতিতে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল। একটি মেয়ের যখন গর্ভসঞ্চার হয়, তখন এর জন্য তার মৃত্যুর বিপদ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেড়ে যায়। ১৯৮৭ সালে নাইরোবিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা এবং ১৯৮৮ সালে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক সংস্হা ব্রাজিলে নিরাপদ মাতৃত্বের ডাক দেয়। এর উদ্দেশ্য মা ও শিশুর স্বাস্হ্যের সুরক্ষা ও উন্নতি সাধন করা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সন্তান সম্ভাবনার যে যে কারণে মায়ের মৃত্যু হয়, তার ৮০ ভাগ প্রতিরোধযোগ্য। এ সময়ে মায়ের মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলো হলো-সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, রক্ত স্বল্পতা, উচ্চরক্তচাপ অপারেশন জটিলতা ও জন্ডিস। বলা বাহুল্য এছাড়া আমাদের দেশে অনেক পরোক্ষ কারণও মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আর্থসামাজিক অবস্হা, দারিদ্র্য, নিরক্ষতা, কুশিক্ষা, নিম্নমানের বাসস্হান, পরিবহন ব্যবস্হার অপ্রতুলতা। এই চমকে দেয়া তথ্যগুলো অনেক হবু মাকেই আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতে পারে।

-- প্রত্যেক হবু মায়ের জানা উচিত গর্ভাবস্হা কোনো শারীরিক অসুস্হতা নয়। এটি একটি সম্পুর্ণ স্বাভাবিক শারীরিক অবস্হা।

-- গর্ভ সঞ্চারণের আগে প্রত্যেক মাকে গর্ভ ধারণের জন্য সম্পুর্ণ মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

-- সঠিক বয়সে মা হোন। বেশি বয়সে মা হতে গেলে, গর্ভাবস্হায় মা নানা রকম ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। মায়ের বয়স যত বাড়ে, অস্বাভাবিক শিশুর জন্ম হারও তত বাড়ে।

-- স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে যথাযাথ কাউসেলিং ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিয়ে সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। প্রি-কসেপশাল কাউসেলিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সুস্হ মায়ের কোলে সুস্হ শিশু তুলে দেয়া।

-- সন্তান গর্ভে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তার নির্দেশমত চলতে হবে।

-- সন্তান গর্ভে আসার প্রথম দিকে বমি বমি ভাব, সকালে খালি পেটে বমি, বুক জ্বালাপোড়া করা, অনেকের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য, শ্বাসকষ্ট, শিরদাঁড়ায় ব্যথা, নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়, যা গর্ভাবস্হার নানা পর্যায়ে মায়েদের চিন্তিত করে তোলে। এ সময় চিন্তামুক্ত থাকুন, আপনার শারীরিক অসুবিধার বিভিন্ন দিক আপনার ডাক্তারের কাছে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করুন।

-- পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে বিশেষ যত্মবান হোন। শুধু তাই নয় গর্ভাবস্হায় উপযোগী এমন পোশাক-পরিচ্ছদ ও জুতা পরুন।
-- গর্ভাবস্হায় ডেনজার সিগনাল সম্পর্কে আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। যা আপনাকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে সাহায্য করবে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে হবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান খুলে দিচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। যেখানে আমাদের দেশের মায়েরা পাচ্ছেন না ন্যুনতম প্রসবকালীন স্বাস্হ্যসেবা সেখানে আজকে উন্নত দেশে চলছে মায়েদের বেদনাহীন প্রসবে সাহায্য করার প্রচেষ্টা। নিরাপদ মাতৃত্ব আমাদের সবার কাম্য। মা-বাবা হওয়ার যে বিপুল আনন্দ তা প্রত্যেকের জীবনে আসুক। মায়েরা স্বাস্হ্য সচেতন হোন, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন যে কোনো ধরনের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ভালো থাকুন ও সুস্হ-সবল শিশুর গর্বিত মা হোন।


************************
ডাঃ কানিজ ফাতেমা ডোনা 
লেখকঃ বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল), শাহবাগ, ঢাকা
আমার দেশ, ১৭ মার্চ ২০০৯।