যক্ষ্মা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম জনস্বাস্হ্য সমস্যা। এইচআইভি/এইডসের দ্রুত বিস্তারের ফলে যক্ষ্মা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের ৬০০ কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ ২০০ কোটি মানুষ যক্ষ্মা জীবাণু সংক্রমিত।

বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়, যক্ষ্মা রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রাইভেট প্রাকটিশনারদের বিরাট ভুমিকা রয়েছে। আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ যক্ষ্মা রোগী রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রথমে প্রাইভেট প্রাকটিশনারদের শরণাপন্ন হন। যেহেতু প্রাইভেট সেক্টরে রোগী নিবন্ধনের কোনো ব্যবস্হা নেই সেজন্য তারা কতজন রোগীর চিকিৎসা করছেন এবং তাদের মধ্যে কতজন চিকিৎসা সম্পন্ন করেন সেসব তথ্য অজানা থেকে যায়। বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণে নিম্নহারের এটা প্রধান কারণ। সুতরাং যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত বিপুল সংখ্যক প্রাইভেট প্রাকটিশনারকে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচিতে সম্পৃক্ত করা না গেলে একদিকে যেমন রোগী শনাক্তকরণের হার বৃদ্ধি পাবে না; অন্যদিকে মাল্টিড্রাগ রেসিসট্যাস টিবি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কারণ প্রাইভেট সেক্টরে রোগী নিবন্ধন এবং ফলোআপের তেমন কোনো ব্যবস্হা নেই। তাই যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলো কোনোভাবে কার্যকারিতা হারালে দেশ এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হবে। আজকাল যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্হায় ৬ থেকে ৮ মাসে একজন যক্ষ্মা রোগীর চিকিৎসায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে, সেখানে একজন মাল্টিড্রাগ রেসিসট্যাস টিবি রোগীর চিকিৎসায় ব্যয় হবে এক লাখ টাকার বেশি, যা আমাদের মতো দেশের রোগীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে। এছাড়া মাল্টিড্রাগ রেসিসট্যাস টিভি রোগীদের নির্ধারিত হাসপাতালে কঠোর নিয়মের মধ্যে চিকিৎসা দিতে হবে। এত বেশিসংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়ার মতো বিছানাও আমাদের নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২ শতাংশ মাল্টিড্রাগ রেসিসট্যাস টিবি রোগী আছে। এ অবস্হায় প্রাইভেট সেক্টরকে রেকর্ডিং ও রিপোর্টিং ব্যবস্হার আওতায় আনা না গেলে মাল্টিড্রাগ রেসিসট্যাস টিবি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং দেশে এক ভয়াবহ অবস্হার সৃষ্টি হবে। এ ধরনের পরিস্হিতি কারোরই কাম্য হতে পারে না। সুতরাং দেশকে এ অবস্হা থেকে বাঁচাতে হলে দেশের সব প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারকে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচিতে সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য। আবার যোগ্য প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের শতকরা ৯০ ভাগই শহরে থাকেন বলে এই কর্মসুচি শহরে সম্প্রসারণ বেশি জরুরি।

যেহেতু প্রাইভেট প্র্যাকটিশনাররা আইনের দিক থেকে কোনো কতৃêপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ নন, সেজন্য এই কর্মসুচি বাস্তবায়ন কঠিন ও দুরুহ। তবে উল্লিখিত কর্মসুচির লব্ধ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সরকার ও এনজিওদের পর্যায়ে এক পৃথক শক্তিশালী সংগঠনের আওতায় কার্যকর তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং ব্যবস্হার মাধ্যমে এই কর্মসুচি বাস্তবায়ন সম্ভব। সরকার বা কোনো এনজিওর পক্ষে কাজটি করা সম্ভব নয়। কারণ এদের কারো অফিস সময়সুচির সঙ্গে প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের রোগী দেখার সময়সুচির কোনো মিল নেই। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচি ও এনজিওদের সহযোগিতায় একটি পৃথক শক্তিশালী সংগঠন প্রয়োজন যারা প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে এই কর্মসুচি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে পারে।

ফিলিপাইনে এ ধরনের সংস্হার আওতায় প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচিতে সম্পৃক্ত করার কাজে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সফলভাবে এই কর্মসুচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের স্বার্থের প্রতিও নজর দেয়া প্রয়োজন, তাহলে তারা এই কর্মসুচিতে সহযোগিতাদানে উৎসাহিত হবেন।

**************************
ডাঃ এ কে এম ডি আহসান আলী  
লেখকঃ জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল (এআইডিসিএইচ) এবং যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ সার্ভিসেসের সাবেক পরিচালক
আমার দেশ, ২৪ মার্চ ২০০৯।