কসমেটিক: ডার্মাটোলজি-১৪

প্রতিটি নারী-পুরুষের শরীরে কম-বেশি লোম রয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝে মাঝে এই লোম সমস্যা নিদারুণ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। যদি মেয়েদের মুখে স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক লোম পরিলক্ষিত হয়। এ ধরনের সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সমস্যায় রূপ নেয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করে। আমি শুরুতেই বলেছি নারী-পুরুষের শরীরে লোম তৈরি হওয়ার জন্য এক ধরনের হরমোন দায়ী। প্রত্যেক নারী ও পুরুষের শরীরে টেসটেসটেরন নামক এক ধরনের হরমোন রয়েছে। এই টেসটেসটেরন হরমোনকে পুরুষ হরমোন নামে অভিহিত করা হয়। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদের শরীরেও এই টেসটেসটেরন হরমোন সামান্য পরিমাণ থাকে। কিন্তু মেয়েদের শরীরে এই হরমোনের পরিমাণ বেশি থাকলে অথবা হরমোনের পরিমাণ বেড়ে গেলে মেয়েদের শরীরেও পুরুষের মত অধিক লোম গজাতে পারে। ডাক্তারী ভাষায় মেয়েদের এই শারীরিক সমস্যাটিকে ‘হারসুটিজম’ বলা হয়। যদিও এই ‘হারসুটিজম’ সমস্যাটি একটা হরমোনজনিত সমস্যা তবুও চিকিৎসার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেয়েদের শরীরের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণে লেজার চিকিৎসা এক বৈপ্লবিক সুযোগ এনে দিয়েছে। লেজারের মাধ্যমে নারী-পুরুষের শরীরের অবাঞ্ছিত লোম দূর করা যায়। সাধারণত মহিলাদের আপার লিপ বা ঠোঁটের উপরের অংশে ও মুখের অন্যান্য স্থানে অবাঞ্ছিত লোম গজাতে পারে। অতীতে এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে দেশে লেজার চিকিৎসা ছিল না। বর্তমানে একাধিক লেজার সেন্টারে এ ধরনের সমস্যার চিকিৎসা হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে লেজারের মাধ্যমে মেয়েদের মুখের লোম অপসারণ কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘হেয়ার রিডাকশন’। অনেকে ভুল তথ্য দিয়ে রোগীদের প্রলুব্ধ ও প্রতারিত করে আসছে। যারা লেজারের মাধ্যমে মুখের লোম অপসারণ করতে চান তাদের অবশ্যই সংশিস্নষ্ট লেজার সেন্টারের বিশেষজ্ঞের কাছে জানতে চাওয়া উচিত হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে লেজার-এর মাধ্যমে শরীরের লোম অপসারণ করলে পুনরায় লোম গজাবে কি না। কোনভাবেই লেজার বিশেষজ্ঞ বা স্কিন বিশেষজ্ঞের কাছে এ প্রশ্নের জবাব না পাওয়া পর্যন্ত লেজার-এর মাধ্যমে লোম অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও সিঙ্গাপুরের একাধিক লেজার সেন্টারে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় কথনও বিশেষজ্ঞদের বলতে শুনিনি লেজারের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে মুখের লোম বা শরীরের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ করা যায়। তবে একথাটি অস্বীকার করা যাবে না যে লেজারের মাধ্যমে হেয়ার অপসারণের পর দীর্ঘদিন আর লোম গজায় না। অনেক ক্ষেত্রে লেজারের মাধ্যমে মুখের অবাঞ্ছিত লোম অপসাণের পরও তিন মাস, ছয় মাস বা এক বছর পর আবার কিছু কিছু লোম গজাতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুনরায় দু’/একবার লেজার ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। তবে লেজার করার পর শরীরের উক্ত স্থানে লোম গজানোর মাত্রা থাকে অনেক কম। সাধারণতঃ লেজারের মাধ্যমে অবাঞ্ছিত লোম অপসারণের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে একবার করে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাতটি সেশন করতে হয়। অনেকে ক্ষেত্রে দশ থেকে পনের সেশন পর্যন্ত লাগাতে পারে।

আমি পূর্বেই বলেছি মেয়েদের মুখের অবাঞ্ছিত লোম একটি হরমোনজনিত সমস্যা এবং এই রোগটির নাম ‘হারসুটিজম’। অনেক লেজার বিশেষজ্ঞ লেজারের মাধ্যমে অবাঞ্ছিত লোম অপসারণের পাশাপাশি তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। লেজার এবং ওষুধ একসঙ্গে অধিক কার্যকর। তবে হরমোনজনিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবশ্যই রোগীকে যে কোন হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।

তাই শরীরের অবাঞ্ছিত বা অধিক লোম অপসারণ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ভালো করে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এ কথাটি সব সময় মনে রাখতে হবে লেজার কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। শুধু মুখের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ নয়, লেজার চিকিৎসার মাধ্যমে মুখের লাবণ্যতা তৈরি, ব্রণ চিকিৎসা, দাগ তোলা কোনটিই স্থায়ী নয়। এ বিষয়টি পরে আলোচনা করব। তবে যারা লেজারের মাধ্যমে মুখের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ করতে চান তাদের প্রথমে উচিত সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েদের মুখে অবাঞ্ছিত লোম গজানোর কারণ নির্ণয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত আপনি লেজার করবেন কিনা। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে লেজার কোনভাবেই লোম সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও রোগীদের এই তথ্যটি জানানো উচিত। তথ্য গোপন করে রোগীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা এক ধরনের অপরাধ। মোট কথা লেজার চিকিৎসার ভাল-মন্দ জেনে যিনি লেজার চিকিৎসায় উদ্বুদ্ধ হবেন কেবল তারই লেজার করা উচিত।

**************************
ডাঃ মোড়ল নজরুল ইসলাম
চুলপড়া, যৌন সমস্যা ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেজার এন্ড কসমেটিক্স সার্জন
বাংলাদেশ লেজার স্কিন সেন্টার,
বাড়ী নং-৩৯, রোড-২, আম্বালা কমপ্লেক্স,
ধানমন্ডি, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক. ২৮ মার্চ ২০০৯।