কিডনি দেখতে সিমের বিচির মত, যা দৈর্ঘ্যে মুষ্টিবদ্ধ হাতের সমান। এর অবস্থান মেরুদন্ডের দুই পাশে কোমরের পেছনে। স্বভাবতই সংখ্যায় এক জোড়া। আমাদের দেহকে সুস্থ রাখতে এর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এরা ছাকুনির মতো আমাদের রক্তকে পরিশোধন করে। অন্য কথায় সব আবর্জনাকে দেহ থেকে বের করে দেয়। শুধু কি তাই? দেহের বাড়তি পানি, লবণ ও খনিজ পদার্থ প্রয়োজন মতো সংরক্ষণ ও নিষ্কাশনের কাজ তারই। দেহের রক্তচাপ সে-ই নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি রক্ত তৈরিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। হাড়কে সবল রাখতে যে ভিটামিন ডি’র প্রয়োজন কিডনি তাও করে।

কিডনির কার্যক্ষমতা যদি কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায় তাকে acute kidney failure (কিডনির সাময়িক কার্যক্ষমতা হারানো) বলা হয়। বিভিন্ন কারণ এর জন্য দায়ী। যেমনঃ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, বমি বা ডায়েরিয়ার কারণে দেহে পানি শূন্যতা, অতিমাত্রায় সংক্রমণ, গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি রোগ (eclampsia or pre-eclampsia), পুড়ে গেলে, অতিরিক্ত প্রহার, ব্যায়াম, মেরাথন দৌড় ইত্যাদি। তবে সময়মতো রোগ নির্ণয় ও সময়োপযোগী চিকিৎসায় কিডনির হারানো কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে কিডনির কার্যক্ষমতা যদি তিন মাসের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে অথবা দিন দিন আরো কমতে থাকে তখনই সেই অবস্থাকে বলা হয় chronic kidney failure (কিডনির স্থায়ী কর্মক্ষমতা হারানো)। এ ধরনের রোগ রোগীর অজান্তে বাড়তে থাকে। এমন একটা সময় সে তা উপলব্ধি করতে পারে। যখন তাকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। অনেক সময় এ রোগের সঠিক কারণও জানা যায় না। তবে বেশ কিছু রোগ আছে যা সময়ের ব্যবধানে কিডনিকে আক্রান্ত করে। আমরা যদি জানতে পারি কি কি কারণে সেগুলো হয় তবে সময়মতো এসব রোগের চিকিৎসা করে কিডনির উপর এর ক্ষতির প্রভাব অনেক কমানো যেতে পারে। নিম্নোক্ত রোগগুলো এর প্রধান কারণ। যেমনঃ ডায়াবেটিস , উচ্চ রক্তচাপ, হেপাটাইটিস বি ও সির সংক্রমণ, কিডনির প্রদাহজনিত রোগ, কিডনির বংশগত রোগ, কিডনির পুরনো সংক্রমণ এইড্‌স ও ব্যথার ঔষধ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যেহেতু ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ সার্বজনীন (common)। আমরা দেখিনা কেন আমাদের অবস্থা কি? যদি এ রোগে আক্রান্ত হয়েও থাকি। কতোটা নিয়ন্ত্রণে আছে। কারো যদি ডায়াবেটিস হয়ে থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। পরিমিত খাবার, ব্যায়াম, ঔষধ এবং সময় সময় রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা। উচ্চ রক্তচাপের বেলায় তার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। অনেক দিনের অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ কিডনির সমূহ ক্ষতি করে থাকে। এ ক্ষেত্রেও পরিমিত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও ঔষধই যথেষ্ট।

রোগ নিয়ন্ত্রণে সময়মতো হেপাটাইটিস টিকা নেয়া প্রয়োজন। রক্ত নেয়ার দরকার হলে রক্ত পরীক্ষা (screening) করে নেয়া। একই সিরিঞ্জ সবাই ব্যবহার না করা। উশৃঙ্খল যৌন জীবন পরিহার করা। যতদূর সম্ভব ব্যথার ঔষধ লম্বা সময় ধরে ব্যবহার না করা। যাদের কিডনির প্রদাহজনিত রোগ আছে দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্যের সাথে চিকিৎসা করানো এবং চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। যাদের কিডনির কর্মক্ষমতা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের বেলায় এ কথাটি আরো বেশি প্রযোজ্য। একজন চিকিৎসকের উদ্দেশ্য হল যতদিন সম্ভব দুর্বল কিডনির কর্মক্ষমতাকে চলমান রাখা। রোগীকে পরিমিত আমিষ দেয়া হলে রোগীর দেহে পানি ও লবণের প্রবণতা বেড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে পরিমিত লবণ ও পানি অথবা ঔষধ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

চিকিৎসক ও রোগীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিয়মতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা এ রোগের গতিকে শস্নথ করে দেয়। যা প্রতিটি রোগীর কাম্য।


**************************
ডাঃ মোসাদ্দেক আহমদ
কনসালটেন্ট নেফ্রোলজিষ্ট,
স্কয়ার হাসপাতাল, পান্থপথ, ঢাকা
দৈনিক ইত্তেফাক. ২৮ মার্চ ২০০৯।