ওবেসিটি কথাটির অর্থ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন। ‘আপা ওজন কমাতে চাই’। এই সিদ্ধান্ত ৩১ বছর বয়সী একজন স্কুল শিক্ষিকার। তার পরিচয়ঃ

নামঃ শান্তি মল্লিক। পেশাঃ শিক্ষকতা

ওজনঃ ৮৫ কেজি। উচ্চতাঃ ৫'-২" ।

তার স্বামী একজন ব্যবসায়ী। সে এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী। পুরোনো ঢাকার দেবেন্দ্র নাথ দাস লেন, কাগজীটোলা, সূত্রাপুর থেকে তিনি আসেন। শমরিতা হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগে শুধুমাত্র ‘ওজন কমাতে’। কারণ অতিরিক্ত ওজন শরীরের শত্রম্ন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার নিম্নের রোগগুলো হবার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যাবে। রোগগুলো হলোঃ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে চর্বি বেড়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, জয়েন্টে ব্যথা, মানসিক অস্থিরতা। আসলে এ রোগগুলো হবার ঝুঁকি ছাড়াও অতিরিক্ত ওজনের কারণে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। যেমন-

১. দৈহিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে। ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিগত জীবনে বহু সমস্যা দেখা দেয়।
২. রোগের সম্ভাবনাকে বাড়ায়।
৩. রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়ায়।
৪. অতিরিক্ত ওজন দেহ বহন করতে অক্ষম হয়। ফলশ্রুতিতে হাত, পা, কোমড় ও সমস্ত শরীরে ব্যথা হয়।
৫. ফ্যাটি লিভারের সম্ভাবনা থাকে।
৬. মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব, ঋতুস্রাবে জটিলতা, শ্বাসকষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে।
৭. শরীরে ফাটা দাগ দেখা যায়। সমস্যাগুলো এড়াতে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। শান্তি মল্লিকের ভাষায় ‘কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছি কিন্তু শুকাতে পারছি না।’

শান্তির কথা শুনে মনে হলো আসলেই সে ওজন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী এবং তার ভাষায় ‘শুকানোর’ জন্য সে পুরোপুরিভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তার এই মানসিক প্রস্তুতিকেই আমি কাজে লাগালাম। প্রথমেই আমি তাকে ‘হাঁটা’ সম্পর্কে অবগত করলাম এবং দ্বিতীয়ত তার জন্য উপযোগী খাদ্য ব্যবস্থাপত্র (ডায়েট চার্ট) তৈরি করে দিলাম। এই দুই পদ্ধতির মাধ্যমে শান্তি চেষ্টা শুরু করেন ওজন কমানোর।

হাঁটার উপকারিতাঃ
১। হাঁটা ক্যালরি খরচ করে স্থূলকায় ব্যক্তির ওজন নিয়ন্ত্রণে আনে।
২। হাঁটলে ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বাড়ে এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সম্ভব।
৩। হাঁটা রক্তের চর্বি (কোলেস্টেরল, এলডিএল, ট্রাইগিস্নসেরাইড) নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে।
৪। রক্তে উপকারী চর্বি (এইচডিএল) কমে গেলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্যে করে।
৫। হাঁটা শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে কর্মক্ষম রাখে। চিন্তাশক্তি বাড়ে। মানসিক চাপ কমে।
৬। নিয়মিত হাঁটা ভালো ঘুমের পেছনে কাজ করে।
৭। নিয়মিত হাঁটার ফলে পেটে মেদ জমতে পারে না ও খাদ্য হজমে সাহায্য করে।
৮। হাঁটা হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস ভালো রাখে।
৯। উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
১০। হাঁটা কোলন ক্যান্সার ও প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। হাঁটার সঠিক সুফল পাওয়ার জন্য এর সঠিক ব্যবস্থাপনা জানতে হবে।

সঠিক ব্যবস্থাপনাগুলো হলোঃ
১। মজবুত আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা।
২। হাঁটার সময় হীল ও খোলা সেন্ডেল ব্যবহার বর্জন করা।
৩। আরামদায়ক পোশাক পরা।
৪। হাঁটার সময় মোবাইল ব্যবহার না করা।
৫। হাঁটার সময় বিরক্তি ভাব না এনে হাঁটাকে উপভোগ করা। আমরা অনেকেই ওজন কমানোর ব্যাপারে খুব উৎসাহিত হলেও হাঁটার ব্যাপারে একেবারেই নিরুৎসাহিত।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই সাধারণ পরিস্থিতিগুলোকে জয় করে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য হাঁটতে হবে।

যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে চান তাদের জন্য হাঁটা আবশ্যক। শরীরের ক্যালরি খরচ করার যতগুলো পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে তারমধ্যে হাঁটা সর্বোত্তম। এতে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কোন আর্থিক ব্যয় নেই। শুধু ইচ্ছা ও সময়ের প্রয়োজন।

হাঁটা ও ওজন নিয়ন্ত্রণঃ
সারাদিনে কমপক্ষে ১ বার ৪০ মিনিট হাঁটা এভাবে সপ্তাহে ৫-৬ দিন হাঁটলে ধীরে-ধীরে শরীরের ওজন কমতে থাকবে। আবার হাঁটার পর যদি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া হয় তবে ওজন না কমে বরং বাড়বে। অনেকের ধারণা ১ ঘণ্টা হাঁটার পর ইচ্ছামত সবকিছু খাওয়া যাবে; মোটেই না। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে হাঁটার পাশাপাশি ‘সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা’ মেনে চলতে হবে। হেঁটে যতটুকু ক্যালরি খরচ হলো ঠিক ততটুকু বা তার বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা হলে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে হাঁটাই বৃথা। ওজন এবং চর্বিঃ আমরা অনেকেই ওজন কমানোর জন্য খাদ্য তালিকা থেকে ঘি, মাখন, ডালডা, প্রাণীজ চর্বি বাদ দিয়ে সরিষা তেল, সয়াবিন তেল, সানফ্লাওয়ার তেল অথবা অলিভ অয়েল ব্যবহার করে থাকি। মনে রাখতে হবে, যে কোন প্রকার তেল বা চর্বি থেকে ১ গ্রামে ৯ ক্যালরি পাওয়া যায়। ১ টেবিল চামচ তেল/চর্বি থেকে ১২০ ক্যালরি পাওয়া যায়। দিনে ১ ঘন্টা হাঁটলে ৩১৫ ক্যালরি খরচ হয় এবং ৩ টে. চামচ রান্নায় তেল খেলে ৩৬০ ক্যালরি গ্রহণ করা হয়।

হাঁটা ও ওজন না কমাঃ হাঁটার পরও ওজন নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ ক্যালরি খরচের তুলনায় ক্যালরি গ্রহণ বেশি হওয়া।

হিসেব চার্টঃ
১ ঘন্টায় হাঁটায় ক্যালরি খরচ ৩১৫, ১০০ গ্রাম বাদাম ক্যালরি গ্রহণ ৭০০, ১৮০ গ্রাম চকলেট ক্যালরি গ্রহণ ৬০০, ১১০ গ্রাম ফ্রেঞ্চফ্রাই ক্যালরি গ্রহণ ৪০০, ২৩০ গ্রাম ভাত ক্যালরি গ্রহণ ৩২০, ১টি হটডগ ক্যালরি গ্রহণ ৩৬০, ১টি বারগার ক্যালরি গ্রহণ ৫২০, ২০০ গ্রাম পিজা ক্যালঢির গ্রহণ ৬৫০, ১৫০ গ্রাম পেষ্ট্রি ক্যালরি গ্রহণ ৫০০, ১ কাপ মিষ্টি দই ক্যালরি গ্রহণ ৪০০, ১ কাপ ডিমের হালুয়া ক্যালরি গ্রহণ ৭০০, ১ কাপ হালিম ক্যালরি গ্রহণ ৫৩০, ১টি সমুচা/সিঙ্গারা ক্যালরি গ্রহণ ২২০। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের খাদ্যের ক্যালরি খরচ ও ক্যালরি গ্রহণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শান্তি মল্লিকের ওজন কমানোর চিকিৎসাঃ
১। হাঁটার উপকারিতা ব্যাখ্যা।
২। ক্যালরি খরচ ও ক্যালরি গ্রহণ সম্পর্কে ধারণা।
৩। শান্তির ওজন, উচ্চতা, বয়স, পরিশ্রম, লিঙ্গ, পূর্বের খাদ্যাভাস, শারীরিক অবস্থা বিশেস্নষণ করে ‘সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা’ (ডায়েট চার্ট) প্রদান।
৪। ওজন কমানোর ব্যাপারে তার মানসিক প্রস্তুতির জন্য তাকে ধন্যবাদ ও উৎসাহ প্রদান।

ফলাফলঃ
৫ মাসে শান্তি ওজন কমালেন শুধুমাত্র হাঁটা ও ডায়েট চার্টের মাধ্যমে) ১৮ কেজি। শান্তির ভাষায় ‘খুব হাল্কা ও ভালো লাগছে।’

শারীরিক ও মানসিক অবস্থাঃ
(১) সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত।
(২) কোন ক্লান্তি ভাব নেই।
(৩) মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি।
(৪) নিজের প্রতি যত্ন ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে অনেক।

চিকিৎসায় যা ব্যবহার হয়নিঃ

১। ওষধি দেয়া হয়নি।
২। অস্ত্রপচার করা হয়নি।
৩। মেশিন বা যন্ত্রের সাহায্যে ব্যায়াম করানো হয়নি।

১৮ কেজি ওজন কমানোর মূল তথ্যঃ

মূল তথ্য হলো শান্তির নিজের সচেতনতা। এই ফলাফলের জন্য শান্তির আত্মবিশ্বাসের প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ। কেননা চিকিৎসকের চেষ্টা বিফলে যেত শান্তি নিজে সচেতন না হলে। যে কোন রোগ মুক্তির জন্য দরকার চিকিৎসকের নিরলস বলিষ্ঠ চেষ্টা ও রোগীর সচেতনতা।

শান্তি একাগ্রচিত্তে মেনে চলেছে চিকিৎসকের কথা। তার বর্তমান স্বস্তিতে যে কেউ আশ্বস্ত হবেন। তার ভাষায় ‘আপা ১ দিনও হাঁটা বাদ দেইনি।’ দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণকারী শান্তিকে ধন্যবাদ।’

পরিশেষে বলতে চাই, অতিরিক্ত ওজন আপনার শত্রম্ন। ওজন স্বাভাবিক রাখুন রোগ প্রতিরোধ করুন, আজ থেকেই হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন।


**************************
এসএন শম্পা,
কনসালটেন্ট নিউট্রিশনিস্ট, অতিরিক্ত ওজন কমানো ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ, শমরিতা হাসপাতাল। ৮৯/১, পান্থপথ, ঢাকা-১২১৫।
দৈনিক ইত্তেফাক. ২৮ মার্চ ২০০৯।