স্বাস্থ্যকথা - http://health.amardesh.com
বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ নয়
http://health.amardesh.com/articles/1513/1/aaaaaaaaa-aaaaaa-aaaaaa-aa/Page1.html
Health Info
 
By Health Info
Published on 04/25/2009
 
একটি নবজাতকের কান্না একজন মায়ের মুখে স্বর্গীয় হাসি ফোটাতে পারে তা নিজের চোখে না দেখলে আর প্রাণের গভীর অনুভব না করলে সঠিক মূল্যায়ন করা যায় না। ২০ অক্টোবর শীতের বিকেল ৫টায় চার দিক যখন আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে, অস্তমিত সূর্যের সোনালি আভা যখন পশ্চিম আকাশে অনেকটা আবীর ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটার সিজারিয়ান অপারেশন করে অনুরাধার একটি ছেলে হলো।

বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ নয়

একটি নবজাতকের কান্না একজন মায়ের মুখে স্বর্গীয় হাসি ফোটাতে পারে তা নিজের চোখে না দেখলে আর প্রাণের গভীর অনুভব না করলে সঠিক মূল্যায়ন করা যায় না। ২০ অক্টোবর শীতের বিকেল ৫টায় চার দিক যখন আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে, অস্তমিত সূর্যের সোনালি আভা যখন পশ্চিম আকাশে অনেকটা আবীর ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটার সিজারিয়ান অপারেশন করে অনুরাধার একটি ছেলে হলো। ক্ষিপ্ত হাতে ও অত্যন্ত সুচারুভাবে অপারেশন করতে হলো অনুরাধার। কারণ ১০ বছর ধরে একটি সন্তানের কচি মুখ দেখার জন্য অনুরাধার হৃদয় আকুল হয়েছিল। এর আবেদন পরপর দু’টি এবরশন বা গর্ভপাত হয়েছে অনুরাধার। দুই বা তিন মাসেই এর কারণ তার। এর পর গত দুই বছরে তার গর্ভে আর কোনো সন্তান আসেনি। অস্ত্রোপচারের পর নবজাতকের শ্বাস-প্রশ্বাস ছিল না বললেই চলে। তবে তার নাভীমূলে স্পন্দন ছিল। যদিও তার এটি ক্ষীণ। অনেক চেষ্টার পর পজেটিভ প্রেশার ভেনটিলেশন বা এন্যাসথেশিয়া মেশিনের বেবি সাইজ টিউব শিশুর গলায় ঢুকিয়ে তার পর তাকে অক্সিজেন দেয়া হলো। একটু একটু করে নবজাতকের শ্বাসের গতি স্বাভাবিক হলো এবং সে বেশ জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্না যে কত আনন্দের এবং স্বস্তির কারণ হতে পারে তা অনুরাধার অস্ত্রোপচার করতে পেরে আমি মন দিয়ে অনুভব করলাম। মনে পড়ল সেই সুন্দর কবিতাটি­ প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে/তুমি মাত্র কেঁদেছিলে/হেসেছিল সবে/সত্যি তাই।

কবির কবিতা আর বিজ্ঞানের সত্যতা এক ও অনন্য ধ্রুবতারা। প্রয়াত বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন, গাছের জীবন আছে। কবির কবিতায় গুবাক তরুর মারি প্রাণের ভাষায় কথা বলে। আমার মনে হলো সদ্যপ্রসূত অনুরাধার ছেলেটি অক্ষরে হৃদয়ের গভীর আনন্দের সাড়া জাগাল। আমি সফল অস্ত্রোপচারে সক্ষম হলাম। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের ওয়ার্ডের ৬ নম্বর শিটে শুয়ে আছে অনুরাধা। আজ অপারেশনের পর তার চতুর্থ দিন। সে এখন স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছে। তার বিছানায় বুকের কাছে শুয়ে আছে তুলার মতো নরম তুলতুলে শিশুটি। পরম নিশ্চিন্তে শিশু মায়ের বুকের দুধ পান করছে। বন্যেরা বনে সুন্দর/শিশুরা মাতৃ ক্রোড়ে। ওই কবিতাটি যেন জীবন্ত হয়ে একটি তাজা পদ্মফুলের মতো দু’টি আছে ওই ছয় নম্বর সিটের বিছানায়। না... বাহ্যিকভাবে এমন কিছু অতুলনীয় নয়, কিন্তু আমি জানি, অনুরাধার সফল মাতৃত্ব এক সাধনার ধন। মা হতে না পারায় তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্বামী সবাই ক্ষুব্ধ ছিল। তার নিজের মনেও ছিল শূন্যতার হাহাকার। কত দিন আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসে অনুরাধা মিনতি ভরা কণ্ঠে বলেছে­

ডাক্তার আপা, আমার কি কোনো দিন সন্তান হবে না?

অবশ্যই হবে। তাকে আশ্বাস দিয়েছি।

কেন এত ভেঙে পড়েছ? সন্তান অনেকেরই একটু দেরিতে হয়। তা ছাড়া তোমার তো সন্তান গর্ভে এসেছিল। তার স্বামী সিতাংশু আবার বিয়ে করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। শাশুড়ি বসুমতি এসেছিলেন আমার কাছে চূড়ান্ত উপদেশ নেয়ার জন্য­ বৌমার সন্তান আদৌ হবে কি না। নতুবা ছেলের আবার বিয়ে দেবো।

না, বিয়ে দেবেন না। আপনার ছেলের বউ অন্তঃসত্ত্বা।

আমি হাসিমুখে তাকে শুভ সংবাদ দিলাম। অনুরাধার শাশুড়ি সে দিন খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল­ ডাক্তার সাহেবা, আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। আপনি আমাকে বড় রকমের দুশ্চিন্তার হাত থেকে বাঁচালেন। আসলে আমার বৌমা লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু কী করব মা, বংশ রক্ষার জন্য আমরা ওই রকম চিন্তাভাবনা করেছিলাম।

অনুরাধা সে দিন কৃতজ্ঞ চিত্তে আমাকে সালাম করে বলেছিল­

ডাক্তার আপা, আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনার কাছে আসাতেই আমার গর্ভে সন্তান এসেছে। আপনি বলেছিলেন, আমার সন্তান হবে।

কিন্তু একটি কথা­ এবার তোমাকে সতর্ক ও সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। প্রতি মাসে নিয়মিত চেকআপে আসতে হবে।

ঠিক আছে আপা, আপনি যেমন বলবেন তেমনি হবে।

এর পর অনেক সময় চলে গেছে ভালোভাবেই এবং অনুরাধার গর্ভে সন্তান আস্তে আস্তে বেড়ে উঠেছে। না, এবারে ওর ঠিক সময় মতোই প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। যথাসময়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল, অনুরাধার প্রসবদ্বার সন্তানের মাথার চেয়ে বেশ ছোট এবং সফল প্রসব করানোর জন্য তার সিজারিয়ান অপারেশন করা একান্ত প্রয়োজন। অনুরাধার স্বামীকে সে কথা জানালাম।

আপনি যা ভালো বোঝেন করুন, ডাক্তার আপা। ওয়ার্ড রাউন্ড শেষ করে ফিরে আসছিলাম, চোখে পড়ল অনুরাধা তার শিশুপুত্রকে পরম যত্নে কাছে টেনে নিচ্ছে। ফুটফুটে ছেলে যেন অনুরাধার কোল আলো করে আছে। যেন জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো এসে লুটিয়ে পড়েছে অনুরাধার বিছানায়।

*************************
অধ্যাপিকা ডাঃ সুলতানা জাহান
লেখকঃ সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধান (গাইনি অ্যান্ড অবস) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। ফোনঃ ৮১১৬১৭৩
 দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৯ মার্চ ২০০৯।