স্বাস্থ্যকথা - http://health.amardesh.com
বিশেষজ্ঞের চেম্বার থেকে
http://health.amardesh.com/articles/1525/1/aaaaaaaaaa-aaaaaaa-aaaa/Page1.html
Health Info
 
By Health Info
Published on 04/25/2009
 
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে পাঠকের সমস্যার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

বিশেষজ্ঞের চেম্বার থেকে


উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে পাঠকের সমস্যার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
 
পরামর্শ দিয়েছেন
এ বি এম আবদুল্লাহ
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সমস্যাঃ
আমার মায়ের বয়স ৬০ বছর। স্বাস্থ্য মোটামুটি। ওজন ৫৫ কেজি। ডায়াবেটিস নেই। ১০ বছর ধরে তিনি উচ্চ রক্তচাপ এবং পাঁচ বছর ধরে উচ্চ কোলেস্টেরল সমস্যায় ভুগছেন। একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তিনি লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি, টিথ্রি, টিফোর, টিএসএইচ হরমোন পরীক্ষা করেন। এতে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ, ট্যাকিকার্ডিয়া ও হাইপোথাইরয়েডিজম শনাক্ত হয়। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ সেবন করার পর তিনি সুস্থ আছেন। রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে আছে। আমার মায়ের ঘুম খুবই কম। বর্তমানে যে ওষুধগুলো খাচ্ছেন, তা দীর্ঘ মেয়াদে সেবন করলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি? ট্যাকিকার্ডিয়া কী? নিরাময়ের পরামর্শ কী? ওষুধ খেয়ে বা না খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে (যেমন-খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ) উল্লিখিত সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা আছে কি? উল্লিখিত সমস্যাগুলোর জন্য কোন ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তা জানাবেন কি?
গিয়াস উদ্দিন
চুয়াডাঙ্গা।

পরামর্শঃ
আপনার মা যেহেতু চিঠিতে উল্লিখিত ওষুধগুলো খেয়ে ভালো আছেন, তাই সেগুলোই আপাতত চালাতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধগুলো সেবন করলে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা তেমন ক্ষতিকর নয়। উচ্চ রক্তচাপ হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ খেতেই হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ীই ওষুধ সেবন করতে হবে। ওষুধের মাত্রা বাড়ানো-কমানো বা ওষুধ পরিবর্তন করা-কোনো কিছুই নিজে নিজে কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারও পরামর্শে করা যাবে না। নিয়মিত আপনার মায়ের রক্তচাপ মাপিয়ে দেখবেন তা ঠিক আছে কি না। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন।

নাড়ির স্পন্দন (পালস) প্রতি মিনিটে ১০০-এর বেশি হলে একে ট্যাকিকার্ডিয়া বলা হয়। বিভিন্ন কারণে নাড়ির স্পন্দন বাড়তে পারে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা, ধূমপান, অতিরিক্ত চা, কফি পান প্রভৃতি এর প্রধান কারণ। তাই এগুলো থেকে যতটুকু সম্ভব দূরে থাকতে হবে। একেবারে বাদ দিতে পারলেই ভালো।

নাড়ির স্পন্দন বেশি হলে কারণ বের করে এর চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজনে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। না হলে হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, কিডনি ও চোখের সমস্যা এবং নানা রকম জটিলতা হবে। তাই নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি খাদ্য নিয়ন্ত্রণও করতে হবে। চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া, একেবারে না খেলেই ভালো। চা ও কফি কমিয়ে খাওয়া, তামাক ও ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন যেকোনো বয়সেই মেনে চলতে হবে।

সমস্যাঃ
আমার বয়স ৪৮ বছর। বর্তমানে আমার রক্তচাপ ৯৫/১৪০। ছয় মাস আগে আমার রক্তচাপ ছিল ১১০/১৬০। স্থানীয় চিকিৎসককে দেখালে তিনি রক্ত ও রক্তচাপ পরীক্ষার পর নিয়মিত একটি ওষুধ এবং এক মাসের জন্য আরেকটি ওষুধ খেতে বলেন। আমি নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পর (প্রতিদিন একটি করে রাতে) একসময় দেখা গেল রক্তচাপ ৯০/১২০ হয়েছে। কিন্তু আমার মূল সমস্যা হলো মাথা ঘোরা ঘোরা ভাব এবং শরীর মাঝেমধ্যে দুর্বল বোধ হয়। এমনকি যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যায়। এ পর্যায়ে কিছুদিনের জন্য রক্তচাপ আবার কম থাকায় ওষুধ খাওয়া বাদ দিই। কিন্তু তাতে রক্তচাপ আবার ৯৫/১৪০ হয়। উল্লেখ্য, আমি সকালে ৩০ মিনিট নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করেছি। চর্বিজাতীয় খাবার খুবই কম খাই। আমি জানতে চাই, ওষুধপথ্যের মাধ্যমে এ রকম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় আছে কি না। কারণ, ওষুধ খেলে রক্তচাপ কমে ঠিকই, কিন্তু স্বাভাবিক কাজ করতে, এমনকি মোটরসাইকেল চালাতেও সমস্যা হয়। কারণ মাথা ঘোরায়। চাকরির প্রয়োজনেই আমাকে মোটরসাইকেল চালাতে হয়। অথবা কম শক্তির কোনো ওষুধ আছে কি না, যা নিয়মিত খেলে শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। আমার দিনে ঘুম হয় না, রাতে স্বাভাবিক হয়।
মোতালেব হোসেন
রাজবাড়ী।

পরামর্শঃ
ওষুধ সেবন না করেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে সব ক্ষেত্রে নয়। আপনি ওষুধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কি না, তা আপনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বলা যাচ্ছে না। উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। দুশ্চিন্তা কমিয়ে ফেলুন। নিয়মিত হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করুন। নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। উচ্চ রক্তচাপ না কমলে চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চলতে হবে।

সমস্যাঃ
আমি পুলিশ বিভাগে কর্মরত। বয়স ৩১ বছর। অবিবাহিত। রাতে-দিনে ডিউটি করতে হয়। কাজের চাপ থাকে। যখন সময় পাই, তখন ঘুম আসে না। মাঝেমধ্যে দুপুরবেলায় ঘুম আসে, আবার কখনো আসে না (যখন ডিউটি থাকে না)। বছরখানেক বিদেশে ছিলাম। এরই মধ্যে পাঁচ কেজি ওজন বেড়ে গিয়েছিল এবং ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হওয়ায় রক্তচাপ মাপালাম, ১৪০/৯০। এরপর আমার মায়ের উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ অর্ধেক খেলাম। দু-তিন দিন পর আবারও শরীর খারাপ লাগলে একইভাবে ওষুধ খেলাম। কয়েক দিন পর একজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি ওষুধ খেতে নিষেধ করলেন এবং ওজন কমাতে বললেন। কিন্তু কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বললেন না। আমি দুই মাসে পাঁচ কেজি ওজন কমিয়েছি এবং ডায়েটও করছি। আমার উচ্চতা পাঁচ ফুট ১০ ইঞ্চি। কিন্তু এখনো প্রায়ই বুক ধড়ফড় করে, মাথা ঝিমঝিম করে। আমি কোন বিষয়ের চিকিৎসক দেখাব বা কী ব্যবস্থা নেব, তা জানালে উপকৃত হব। উল্লেখ্য, আমার বাবা মাত্র ৫০ বছর বয়সেই ব্রেইন হেমারেজে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং মা ৩০ বছর বয়স থেকে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে মায়ের বয়স ৫০ বছর। তাঁর ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরামর্শ পেলে উপকৃত হব।
এস এ হাসিব
এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।

পরামর্শঃ
আপনার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ সেবনের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে আপনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর। আপনার বেশ কিছু পরীক্ষা করতে হবে, যেমন, রক্তের চিনি, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড প্রভৃতি। এসব পরীক্ষা করিয়ে মেডিসিন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করুন। আপাতত ট্যাবলেট ফ্রেনজিট রাতে একটি করে এক মাস সেবন করতে পারেন।

সমস্যাঃ
আমার বয়স ৩৭ বছর। ওজন ৭৮ কেজি, উচ্চতা র্৫-র্৭র্ । মাস ছয়েক আগে বেলা ১১টার দিকে আমার শরীর হঠাৎ করে ঘামতে থাকে এবং পা দুটো খুব হালকা হয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে। প্রায় ২০ মিনিট এ রকম থাকে। কিছুক্ষণ পর শরীর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসে। পরে ফার্মেসিতে গিয়ে রক্তচাপ মাপানোর পর চিকিৎসক বলেন, হঠাৎ আমার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল। তিনি আমাকে প্রতিদিন সকালে একটি করে ক্যামলোডিন-৫ খেতে বলেন। আমি প্রতিদিনই রক্তচাপ মাপাচ্ছি। প্রায় ছয় মাস উল্লিখিত ওষুধটিও খেয়ে যাচ্ছি। রক্তচাপ ১২০/৯০। এখন আমার প্রশ্ন, আমার কি সারা জীবনই এই ওষুধ খেয়ে যেতে হবে? আমি কি নিয়মিত ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করতে পারব? আমার খাবারের কী কী বিধিনিষেধ আছে?
গোলাম রায়হান ভূঁইয়া
পুরানা পল্টন, ঢাকা।

পরামর্শঃ
উচ্চ রক্তচাপ একবার হলে তা আর ভালো হতে চায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো হয়ও না। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নিয়মিত ওষুধ সেবনসহ কিছু নিয়ম সব সময়ই মেনে চলতে হবে।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন জরুরি। চিনি, মিষ্টি, ভাত, চর্বিজাতীয় খাবার একেবারে কম খাবেন। ধূমপান, মদ্যপান, তামাক পাতা, জর্দা প্রভৃতি কখনো নয়। এসবের অভ্যাস থাকলে এখনই বাদ দিন। নিয়মিত ব্যায়াম করুন। তবে অতিরিক্ত নয়, পরিমিতভাবে যন্ত্রপাতি দিয়ে বা ব্যায়ামাগারে গিয়ে ব্যায়াম করতে পারবেন কি না তা মেডিসিন বা ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।

পরামর্শ দিয়েছেন
আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সমস্যাঃ
আমার বয়স ৩৬ বছর, ওজন ৭৮ পাউন্ড। আমার ব্লাড প্রেসার ১১০/৮৫-এর মধ্যে থাকে। মাঝেমধ্যে ১২০/৯০ হয়, তখন আমি একটু অস্থিরতা অনুভব করি। আমি জানতে চাই, যদি আমার প্রেসার হঠাৎ খুব বেড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকে, সে ক্ষেত্রে বাসায় নিজের প্রেসার মেপে কোনো ওষুধ বা অন্য কোনো উপায়ে প্রেসার কমানোর ব্যবস্থা আছে কি?
হাদী চৌধুরী
রোনালস্‌ রোড, ঝালকাঠি।

সমস্যাঃ
উচ্চ রক্তচাপে আমার পরিবারের কয়েকজন সদস্য আক্রান্ত। অধিক দুশ্চিন্তা, খাদ্যের তারতম্যের কারণে মাঝেমধ্যে এ রোগের উপসর্গ দেখা যায়। তাই এ রোগের উপসর্গ দেখা মাত্র প্রাথমিক চিকিৎসা কী হবে এবং পরে কীভাবে চলতে হবে তা জানালে খুব খুশি হব।
জয়দেব
রাজারহাট এম আই কলেজ
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।

পরামর্শঃ
আপনাদের মতে অনেকেরই ভয় থাকে, রক্তচাপের সামান্য তারতম্য হলেই দেহযন্ত্রের কোনো একটা অঘটন বুঝি ঘটে যাবে। আসলে কিন্তু তা নয়। জীবনের একটা পরিচায়ক হলো পরিবর্তন। কাজেই জীবন্ত মানুষের ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ যে তার দেহের চাহিদা ও মনের অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে, সেটা বলাই বাহুল্য। আমরা শুয়ে থাকলে বা ঘুমিয়ে থাকলে পুরো দেহযন্ত্রটিও বিশ্রামে থাকে। কাজেই শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় রক্তচাপও তখন স্বভাবতই কম থাকবে। আবার আমরা যখন সকালে জগিং করছি বা জোর পায়ে হেঁটে গিয়ে চটজলদি অফিসের বাসে উঠছি, তখন দেহের চাহিদা অনুযায়ী রক্তচাপও আগের চেয়ে কিছুটা বেশি হতেই হবে। আর কখনো যদি খুব রেগে গিয়ে মাথায় রক্ত চড়ে যায়, তখন কিন্তু রক্তচাপও খুবই বেশি থাকে। পরক্ষণেই মাথা ঠান্ডা হলো তো রক্তচাপ তার স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এল। আমাদের দেহযন্ত্রটি তাই স্বাভাবিকভাবেই এ রকম রক্তচাপের ওঠা-নামা বা তারতম্যের জন্য যথোপযুক্তভাবেই তৈরি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। যারা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের রোগী, তাদের সমস্যা হলো এই রক্তচাপ ওঠা-নামার বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি আকারে বা ম্যাগনিফাইডভাবে হয়। ফলে তাদের ভয়ের মাত্রাটিও বেড়ে যায় অনেকখানি। এ ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো, আপনার নিয়মিত ওষুধটি খেয়ে বেসলাইন রক্তচাপটিকে ঠিক রাখা। আর যে কারণে এ রকম ওঠা-নামা বেশি হয়, সে রকম পরিস্থিতি বা কর্ম এড়িয়ে চলা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব রোগীর ওষুধ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই, বরং সামান্য দুশ্চিন্তা কমানোর ওষুধ বা ঘুমের ওষুধ খেলেই তাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসে। একটুখানি গান শুনলে বা প্রিয়জনের সঙ্গে বাইরে পায়চারি করে এলেও কিন্তু এ ক্ষেত্রে উপকার হবে। আপনারা দুজনই যেমন রোগ হওয়ার আগেই ভয় পেয়ে ওষুধ খেতে চাইছেন, তা না করাই ভালো। লবণ কম খাওয়া, চর্বিযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলা, ধূমপান না করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা বা হাঁটা, প্রচুর ফলমূল-শাকসবজি, মাছ খাওয়া এবং দুশ্চিন্তার মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা করে একটি ডিসিপ্লিনড লাইফের ছকে এলে আপনাদের মতো রোগীদের বহুদিন পর্যন্ত কোনো ওষুধ ছাড়াই রক্তচাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা সম্ভব।

সমস্যাঃ
আমার বয়স ২৬ বছর। আমি চাকরিজীবী। আমার সমস্যা, সব সময় রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিলি পারদ। মাঝেমধ্যে ১৫০/৯০ হয়। আমি ১০ মাস ধরে হোমিও ওষুধ খেয়েছি, কোনো ফল পাইনি। আমাকে রাতে ডিউটি করতে হয়। আমার পরিবারের কারও উচ্চ রক্তচাপ নেই। আমি কীভাবে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করব? এটা আসলে সম্ভব কি? এখন আমি খুব চিন্তায় আছি। এ অবস্থায় আমার প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় কী কী রাখা এবং কী কী বর্জন করা উচিত, দয়া করে জানাবেন। প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম যেমন ব্যায়াম, হাঁটা ও দৌড়ানো কত মিনিট করা যাবে?
মোঃ শফিকুল ইসলাম
ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক।

পরামর্শঃ
আপনার প্রশ্নের অংশ মূলত তিনটি। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের বিষয়ে এর আগের প্রশ্নেই জবাব দেওয়া হয়েছে।
শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটার বিষয়ে একটি সহজ পরামর্শ হলো, আমাদের বেসলাইন শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রার ওপর নির্ভর করে আমাদের ব্যায়াম বা হাঁটা অথবা দৌড়ানোর পরিকল্পনা করা উচিত। সারা দিনেও যার টেবিলে কলম পেষা থেকে ওঠা হয়নি, তিনি যদি প্রথম দিনেই আধঘণ্টা দৌড়াতে যান, তাহলে বিপদ হবে। তাঁকে শুরু করতে হবে ১৫-২০ মিনিট হাঁটা দিয়ে, ধীরে ধীরে যার মাত্রা বাড়িয়ে এক ঘণ্টা হাঁটা বা আধাঘণ্টা জগিংয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। যে পরিমাণ পরিশ্রম করলে আপনার ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ে এবং ঘাম ছুটে যায়, সেটিই আপাতভাবে আপনার টপ লিমিট বলে ধরে নেবেন। সময়ের সঙ্গে এই লিমিটটি বাড়তে থাকে দেহযন্ত্রের কন্ডিশনিংয়ের জন্য। তবে সপ্তাহে কমপক্ষে চার-পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট জোর পায়ে হাঁটাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। আপনি উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক পর্যায়ের রোগী মাত্র। কাজেই আপনার যদি ডায়াবেটিস না থাকে বা কিডনির কোনো সমস্যা না থাকে, তবে হয়তো বা শুধু উচ্চ রক্তচাপের প্রতিরোধক লাইফ স্টাইল অবলম্বন করেই আরও কিছু দিন চলতে পারবেন। তবে একজন মেডিসিন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ পরামর্শ নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সমস্যাঃ
আমার বয়স ২৬ বছর। ওজন ৫৮ কেজি, উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। আমার সমস্যা, প্রথমে ঘন ঘন প্রস্রাব হতো, কিন্তু বুকে ব্যথা হওয়ার কারণে ২০০০ সালের মে মাসে আমার প্রথম উচ্চ রক্তচাপ (৯০/১৫০) ধরা পড়ে। কিন্তু মেডিসিন ও কার্ডিওলজি চিকিৎসককে দেখানোর পর তিনি পরীক্ষা করে ট্যাবলেট প্রপানল-১০ মিগ্রা, ট্যাবলেট অ্যামপলিন ও ভ্যাসোপ্রিল-৫ মিগ্রা এবং আরও কিছু ওষুধ দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন খাওয়ার পরও রক্তচাপ ৯০/১৫০-এর নিচে আসেনি। তাই রক্তচাপ না কমার কারণে ওষুধ দীর্ঘদিন খাইনি। এর মাঝে বেশ কিছু চিকিৎসককে দেখিয়েছি, কিন্তু ফল পাইনি। অবশেষে গত বছরের ২৬ মে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাই। তিনি ইসিজি, আরবিএস, প্রস্রাব, রক্তের ক্রিয়েটিনিন, তলপেটের আলট্রাসনোগ্রাম প্রভৃতি পরীক্ষা করার পর ট্যাবলেট ফ্লেক্সোকর্ড, রিভোট্রিল, সেকলো ও ডরমিকম খেতে দেন। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ কমেনি। বর্তমানে ভালো ঘুম হয় না, ঘন ঘন প্রস্রাব ও রং লাল, বুক ধড়ফড়, খাবার হজমের সমস্যা, মাঝেমধ্যে বুকে ব্যথা, কোমরে ব্যথা-এসব সমস্যার কারণে মাঝেমধ্যে জীবন নিঃশেষ করতে ইচ্ছে করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
গাইবান্ধা।

পরামর্শঃ
আপনি ২৬ বছর বয়সে সংসারবিবাগী হয়ে ইহলোক ত্যাগ করতে চাইছেন-এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রক্তচাপ যখন নিয়ন্ত্রিত হতে চায় না, তখন আমরা কয়েকটি বিষয়ে নজর দিই-রোগী কি ওষুধ আসলেই ঠিকমতো খাচ্ছে? ওষুধের মাত্রা কি রক্তচাপ অনুযায়ী যথোপযুক্ত? রোগী কি ব্যথার ওষুধ অথবা বাতের ওষুধ খাচ্ছে? রোগীর কিডনি কি ঠিকমতো কাজ করছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের সমাধান খুঁজলেই অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো, একটি ওষুধ শুরু করার পর তার পূর্ণ কার্যক্ষমতা প্রকাশ পেতে অন্তত চার সপ্তাহ সময় দেওয়া প্রয়োজন। সময়ের আগেই আবার উচ্চ রক্তচাপ কন্ট্রোল হলো না বলে মাতম করে ওষুধ এবং ডাক্তার বদলানো-কোনোটিই রোগীর জন্য ভালো নয়। আপনাকে আমি ফিক্সোকার্ড ওষুধের সঙ্গে ডাইসিস প্লাস (৮০) যোগ করে তিন-চার সপ্তাহ ধৈর্য ধরতে বলব। তাতেই কাজ হবে। আর বাকি যে সমস্যা, সেগুলোর কোনোটিই উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এগুলো হলো মানসিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এসব কিছুতে ভয় না পেয়ে এই তরুণ বয়সে জীবনকে উপভোগ করতে শেখা দরকার। জীবনযাপনের নির্দিষ্ট ছক ভেঙে এই সুন্দর পৃথিবীর লুকানো সৌন্দর্য বের করতে সাহস করে এগিয়ে গেলে আর সহজে রোগী হতে হবে না।

সমস্যাঃ
আমার বয়স ২৪ বছর। আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ি। দেড় মাস আগে আমার মাথা ঘোরা, শরীর দুর্বল, অস্থির ভাব, চোখে ঝাপসা দেখা, কানে কম শোনা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। তখন আমি জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিই। তিনি প্রথমে অ্যাকোরেন-২৫ এবং টেনিল-৩ খাওয়ার পরামর্শ এবং কিছু পরীক্ষা করতে দেন। যেমন রক্ত, মূত্র, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম-এগুলোর রিপোর্ট দেখালে বলেন, ভালো। ওষুধ খেয়ে আমার সব সমস্যা ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর মাথা ঘোরাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। আমি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আবার চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করি। তিনি তখন আগের ওষুধ বাদ দিয়ে অ্যামডোকাল-৫ খেতে দেন। আমার রক্তচাপ প্রথম থেকেই ১৪০/১০০, ১৩০/৯০, ১৪০/৯০-এ ওঠা-নামা করে। আমি বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে আছি। আমার পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
মোঃ আসাদুজ্জামান
জয়পুরহাট।

পরামর্শঃ
আমার দৃষ্টিতে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হওয়াটা হলো মনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। কেউ হয়তো হার্টের বাইপাস সার্জারি করেছে, দিনে আটটি করে ওষুধ খায়, অথচ জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘আমার বিশেষ কোনো অসুবিধা নেই।’ এরা দুনিয়ার সব কাজকর্ম হাসিমুখে করে বেড়ায় আর সন্ধ্যাবেলায় পরিবার-পরিজনকে নিয়ে দিব্যি বেড়াতে যায়। অসুখ ও ওষুধকে তারা মাথার ওপর উঠতে দেয়নি, পায়ের কাছে দাবিয়ে রেখেছে। আবার অনেকেই আছেন, রোগী হওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত। আসলে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হতে না চাইলে সহজে কেউ আপনাকে রোগী বানাতে পারবে না একগাদা অসুখ দিয়েও। আর রোগী হতে চাইলে ভালো করতে পারবেন না নামকরা বিশেষজ্ঞরাও। শরীরের নাম মহাশয়, যা সহায় তাই সয়। কথাটি কিন্তু খুব ভুল নয়। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছা ও তার প্রয়াস। মাত্র ২৪ বছর বয়সে সামান্য উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে ভয় পাওয়াটা আসলে ঠিক নয়। আপনি অ্যামডোকাল-৫ নামের যে ওষুধটি খাচ্ছেন সেটিই ধৈর্য ধরে খেতে থাকলে এবং লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের যে কথাগুলো আগেই বলা হয়েছে, সেটি মেনে চললেই আপনাকে আর রোগী হতে হবে না।

সমস্যাঃ
একজন রোগীর বয়স ৪৫ থেকে ৫০ বছর। তাঁর ব্লাড প্রেসার ডায়াস্টলিক ৮০ ও সিস্টোলিক ১৭০। আবার কোনো রোগীর দেখা যায় ডায়াস্টলিক ১১০ ও সিস্টোলিক ১২০। বয়স সেই ৪৫ থেকে ৫০ বছর। এ অবস্থায় যদি ডায়াস্টলিক ও সিস্টোলিক চাপে সমন্বয় না থাকে, তাহলে ওই রোগী কি ওষুধ সেবন করতে পারে? উচ্চ রক্তচাপের রোগী বলে চিকিৎসক বলেন, যেন টেনশন না করি। আমিও টেনশন করতে চাই না, তবুও চলে আসে। এই টেনশন না করার কোনো ওষুধ আছে কি? কোনো টেনশন না থাকলেও প্রেসার বেশি থাকে।
এন এ ইসলাম খান
তারাগন, আখাউড়া।

পরামর্শঃ
উচ্চ রক্তচাপের সংজ্ঞা অনুযায়ী যদি রক্তচাপ সিস্টোলিক (ওপরের প্রেসার) ১৪০ মিমি পারদ বা তার বেশি এবং ডায়াস্টলিক (নিচের প্রেসার) ৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি হয় এবং একাধিক সময়ে মেপেও এ রকম বেশি পাওয়া যায়, তবেই তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হবে। সাধারণত ৪০ বছরের নিচের বয়সীদের ডায়াস্টলিক রক্তচাপই বেশি থাকে, আর ষাটোর্ধ্ব রোগীদের সিস্টোলিক প্রেসারই শুধু বেশি থাকে। আর মাঝবয়সীদের প্রায়ই দুটোই বেশি থাকে। সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসা করতে হয় এবং সে ক্ষেত্রে টারগেট প্রেসার হলো চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তচাপ কমপক্ষে ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা সম্ভব হলে (বিশেষ করে ডায়াবেটিকদের ক্ষেত্রে) ১৩০/৮০ মিমি পারদের নিচে নামিয়ে আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, কাম্য রক্তচাপের রেঞ্জটা তখন বয়স ও রোগীর সিম্পটম অনুযায়ী ১১০/৬০ থেকে ১৩০/৮০ মিমি পারদের মধ্যবর্তী যেকোনো রক্তচাপ হতে পারে। কম বয়সী রোগীদের বিশেষ করে যদি আর কোনো কার্ডিও ভাসকুলার রিস্ক ফ্যাক্টর (হৃদরোগ সম্পর্কিত ঝুঁকি) না থাকে, তাহলে লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের যে কথাগুলো আগে বলা হয়েছে, তাতেই অনেক রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ওষুধ কোনটি খাবেন, সেটি কিন্তু নির্ধারণ করবেন আপনার চিকিৎসক। 
 
 
**************************
প্রথম আলো, ০৮ এপ্রিল ২০০৯।