শরীর ও মন উভয়ই শিশুর সামগ্রিক গঠনের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম জীবন থেকেই শিশুর শরীরের হয় বৃদ্ধি আর মনের হয় বিকাশ। শরীরের বৃদ্ধি মানে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিবর্তন ও আকৃতি বৃদ্ধি পাওয়া। অন্যদিক মনের বিকাশ মানে শিশুর জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, আবেগ ও অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করার দক্ষতা অর্জন করা। শিশুকে পরিপুর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক বৃদ্ধি বা মনের বিকাশেরও সমানভাবে সুযোগ করে দিতে হবে। অত্যধিক জনসংখ্যা অধ্যুসিত বাংলাদেশের একেকটি শিশুকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে দেশের সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে এর বিকল্প নেই। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকাসক্তি তথা সব ধরনের সামাজিক অবক্ষয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে শিশুর পরিপুর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

গর্ভাবস্হা থেকে প্রথম পাঁচ বছর শিশুর বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ সময়। জীবনের প্রথম বছরগুলোতে শিশু যা শেখে, যেভাবে শেখে তাই তাদের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিক ও সামাজিক আচরণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক বিকাশ মস্তিষ্কের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্হায় নিউরন নামক মস্তিষ্কের কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গর্ভবতী মায়ের সুষম খাবার, শারীরিক এবং মানসিক সুস্হতা গর্ভস্হ শিশুর নিউরনের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। জন্মের পর এ কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি হয় না, তবে পারস্পরিক ক্রিয়ামুলক উদ্দীপনার দ্বারা নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটে এবং সেগুলো সক্রিয় হয়। এজন্য শিশু যাতে তার পাঁচটি ইন্দ্রিয় প্রতিদিন বারবার ব্যবহারের সুযোগ পায় তার দিকে যত্মবান হতে হবে। এতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংযোগ ঘটবে এবং বারবার ব্যবহৃত সংযোগগুলো স্হায়ী হয়ে শিশুর দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকবে। শিশুর প্রথম জীবনে এ ধরনের বিকাশের জন্য বাবা-মা’সহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও বিশেষ ভুমিকা প্রয়োজন। নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে একটি শিশু সুষ্ঠু, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ লাভ করবেঃ

- গর্ভাবস্হায় মায়ের সুষম খাবার, শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্হ্য নিশ্চিত করা। নিরাপদ প্রসব ও প্রসব-উত্তর পর্যাপ্ত যত্মের ব্যবস্হা করা।
- শিশুর জন্মের পর পর শালদুধ ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ এবং পরে বুকের দুধের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার দেয়া।
- শিশুকে প্রচলিত সাতটি রোগের টিকা দেয়া এবং অসুস্হ হয়ে পড়লে প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসার ব্যবস্হা করা।
- বুকের দুধ খাওয়ানো কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় শিশুর দিকে তাকিয়ে কথা বলা, মৃদু স্বরে গান গাওয়া, দিনের কিছু সময় মৃদু শব্দে শিশুকে উদ্দীপ্ত করা।
- শিশুর সঙ্গে লুকোচুরিসহ বিভিন্ন ধরনের আনন্দময় খেলাধুলা করা। হাত-পা নেড়ে হালকা ব্যায়াম করানো এবং সঙ্গে আনন্দসুচক শব্দ করে কথা বলা। গান, ছড়া ও মজার মজার গল্প বলে শিশুকে সক্রিয় করা।
- শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ পরিবেশের নতুন নতুন জিনিসের সঙ্গে শিশুর পরিচয় করে দেয়া। শিশুকে ছোট ছোট প্রশ্ন করা এবং জবাব দেয়া।
- শিশুকে বসতে, দাঁড়াতে এবং হাঁটতে সহায়তা করা। নিরাপদ পরিবেশে বাড়িতে ছোটাছুটি বা গড়াগড়ি করতে দেয়া (এমনকি আঙ্গিনা মাঠের সবুজ ঘাসেও)।
- শিশুকে দাঁত মাজা, হাত ধোয়া, নিজে নিজে পোশাক পরা, প্রস্রাব-পায়খানার নির্দিষ্ট স্হান ব্যবহার করতে শিখানো।
- শিশুকে পরিবারে ছোট ছোট কাজে উৎসাহিত করা, পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্হা করা এবং শিশুর ভালো কাজের প্রশংসা করা।
- অন্য শিশু এবং পরিবারের বাইরের লোকদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দেয়া। বড়দের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে তা শিখানো এবং পালন করতে উৎসাহিত করা।
 
**************************
ডঃ কানিজ ফাতেমা ডোনা      
আমার দেশ, ০৭ এপ্রিল ২০০৯।