যেসব ছেলেমেয়ে নিয়মিত অ্যালকোহলের নেশা করে তাদের মধ্যে আচার-আচরণের অস্বাভাবিকতা বা অসংলগ্নতা দেখা যায়। তারা কিন্তু অ্যালকোহলের জন্য এই আচার ব্যবহারের অস্বাভাবিকতাকে ‘অস্বীকার’ করে থাকে। অস্বীকার করাটাই একটা বিশেষ মানসিকতা, যা নেশা করার জন্য ধীরে ধীরে গভীরে তৈরি হয়।

রুহিত বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ পালিয়ে বারে বসে রোজ আড্ডা দেয় ও মদ খায়। কেন দেরি করে বাড়ি ফেরে এই প্রশ্ন করেছিলেন বলে মাকে যাচ্ছে তাই অপমান করল। কিন্তু পরে যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো যে সে এরকম কেন করেছে তার উত্তরে সে প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে মাকে অপমান করার কথা অস্বীকার করল। তার বক্তব্য সে রকম কিছুই হয়নি।

অস্বীকার করা, মিথ্যা বলা বা অজুহাত দেয়া যারা নিয়মিত অ্যালকোহলের নেশা করে, তাদের অনেকের মধ্যে দেখা যায়। দায়িত্ব এড়ানোর জন্য তাদের ওপরে অন্যের ভরসাও চলে যায় এবং অনেকেই এদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এই অস্বীকার করার পেছনে যে মানসিকতা কাজ করে তা হলো অ্যালকোহল সম্বন্ধে ভিন্ন চিন্তাধারা।

মদ খেয়ে বা মদের নেশায় অস্বাভাবিক আচার-আচরণ যাকে সোজা কথায় ‘মাতলামি’ বলা হয়, কেউই সহ্য করতে চান না। যারা অ্যালকোহল খায় তাদের প্রায় ২০% এর অপকারিতার শিকার হয়, তারা নিজেদের সংযত করতে পারে না, অ্যালকোহলের পরিমাণ ক্রমশ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিপদ ডেকে আনে। সুতরাং মদ বা অ্যালকোহল যে খায় তাকে ‘দুষ্ট স্বভাবের মানুষ’ না মনে করে ‘অসুস্থ’ ভাবলে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

‘আমি মদ খাই, মদ আমাকে খায় না’ এই মনোভাবই অ্যালকোহলের নেশাকে বাড়িয়ে দেয়, যে মদ্য পান শুরু করে তার সঙ্গে হাজারো যুক্তিও থাকে। যেমন-

০ আমি দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই মদ খাই।

০ নেশা করলে আমার শরীর-মন ভাল থাকে।

০ কাজকর্মে উৎসাহ পাই অথবা

০ আমি জানি কতটুকু অ্যালকোহল খেতে হবে

০ কী পরিমাণে খেতে হবে

০ কী পরিমাণে খেলে ক্ষতি হয়।

০ আমি এত বোকা নই যে নিজের ক্ষতি করব, এই সমস্ত হলো অস্বীকার করার বিভিন্ন অজুহাত।

নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের নেশা ছাড়ানোর মানসিক প্র‘তি অনেক সময়েই থাকে না। তাদের মোটিভেট না করেই তাড়াহুড়ো করে চিকিৎসা করালে ফল পাওয়া কঠিন। অনেক ছেলেমেয়েই ‘নেশাবিহীন’ অবস্থায় সাময়িকভাবে নেশা ছাড়ার সদিচ্ছা বা মনোভাব প্রকাশ করে থাকে।

মানসিক অবস্থার বিচার-বিবেচনা, পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা দিয়ে একজন সত্যিই নেশা ছাড়তে ইচ্ছুক কিনা বুঝতে পারা যায়। অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো কোনো সময় ভুল হতেই পারে। তবু সম্ভাব্যতার ওপর বিচার-বিবেচনা করেই এগোতে হয়। অনেক সময় একজন নেশাগ্রস্ত ছেলে নেশার কবলে পড়ে নানারকম অজুহাত তৈরি করে। তারা বলে থাকে ‘কী করব নেশা তো ছাড়তেই চাই কিন্তু নেশা করি আর না-ই করি বদনাম দেবেই’ এছাড়া অজুহাত দেখায়। ঝগড়াঝাটি, বিরক্তি, হতাশা প্রভৃতির কারণে অনেক নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েই মনের উত্তেজনা, নেশা ছাড়ার জন্য সাময়িক কষ্ট, সাময়িক বিভিন্ন উপসর্গ সহজে মেনে নিতে চায় না। ‘অবচেতন’ মনকে ‘চেতন’ মন দিয়ে অনেক সময় অস্বীকার করলেও অবচেতন মন মনের অবদমিত আবেগ, নিগূঢ় ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করবেই। নিজেকে কষ্ট দেয়া, নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা, মৃত্যুর আকাঙক্ষা মানুষকে নেশায় আসক্ত হওয়ার পথে ঠেলে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত শত যুক্তি-তর্ক বা বিচার-বিবেচনা তখন কোনো রকমে কাজ করে না বা করতে চায় না।

মাদকদ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ এবং ব্যবহারের খারাপ ও ভয়াবহ পরিণতি কখনো কখনো নেশাক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের বিচলিত, বিভ্রান্ত, ভীত করে থাকে। নেশা শুরু করার পর ছাড়া যায় না অথবা নেশা বন্ধ করলে এত কষ্ট হয় যে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে প্রভৃতি কথা তাদের মনকে এতটাই বশীভূত করে যে তারা কিছুতেই নেশা ছাড়ার জন্য চিকিৎসা করাতে রাজি হয় না। এছাড়া নেশার চিকিৎসা সম্বন্ধে ভুল ধারণা, অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি, নেশাক্রান্ত ছেলেমেয়ের পরিচয় গোপন না রাখা নেশার চিকিৎসাকে ব্যর্থ করে থাকে। যারা চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত তারা অনেক সময় নিজেদের প্রচার ও বাহবার জন্য সবার সামনে নেশাগ্রস্ত ও নেশা ছেড়েছে- এমন ছেলেমেয়েদের পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

নেশায় আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের অভিভাবক বা মা-বাবা প্রথমে নেশার ব্যাপারটি জানতে বা বুঝতে অনেকটাই সময় নিয়ে নেন। অবশ্য এর জন্য তাদের দোষ দেয়া যাবে না, কারণ অন্যান্য অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে কতগুলো বাহ্যিক লক্ষণ থাকে, যা দিয়ে রোগীকে সহজেই চিনে নেয়া যায়। কিন্তু নেশার ব্যাপারে প্রথম থেকেই একটা অলিখিত লুকোচুরির খেলা শুরু হয়ে যায়। না জেনে মাদকদ্রব্য অনেক ছেলেমেয়েই প্রথমে ব্যবহার করে ও পরে আসক্ত হয়ে পড়ে। যে নেশা করছে সে যখনই বুঝতে পারে যে তার নেশা করাটা অনেকের চোখেই ভালো নয় তখনই সে লুকাতে চেষ্টা করে। নেশা করা খারাপ- এটা অনেক ছেলেমেয়েই জানে তবুও ‘জেনে শুনে বিষপান’ এর মতো নেশার প্রতি আসক্ত পড়ে। সুতরাং যে কিশোর-কিশোরী জেনেশুনেই নেশা শুরু করেছে সে নেশা ছাড়তেই বা চাইবে কেন? নেশার চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে-

০ নেশার দ্রব্যের গুণাগণ

০ একজনের নেশা করার ক্ষমতা

০ কতদিন ধরে ব্যক্তিটি আসক্ত হয়েছে

০ তার মানসিক অবস্থা কী পর্যায়ে আছে ইত্যাদির ওপর

পরিবেশ এবং পরিস্থিতির ওপরও মাদকাসক্তির চিকিৎসা অনেকখানি নির্ভর করে থাকে। একটি ছেলে বা মেয়ের বাড়ির পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব, পাড়া-প্রতিবেশির আচার-ব্যবহার তার নেশা করা বা নেশা ছাড়া দুটিকেই যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অনেক সময় নেশা করতে গিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক দিক দিয়ে অনেক রকমের সমস্যার সৃষ্টি হয়। পাড়াতে, মহল্লায় বা বাড়িতে নেশা করার জন্য মারধর, ভয় দেখানো, ঘরে বন্ধ করে রাখা, পুলিশি হামলা, ঝামেলা অনেক সময় ছেলেমেয়েদের নেশা ছাড়ার থেকে নেশা করে যাওয়ার দিকে নিয়ে যায়।

নেশার চিকিৎসা বিষয়টি যেমন জটিল, কষ্টসাধ্য, তেমনি অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন। তাই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ মনোবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। নেশার জিনিসের প্রতি আসক্তি কিন্তু একটা অসুখ- যা শরীর-মন দুটোকেই অসুস্থ করে তোলে এবং কিশোর বা কিশোরীর সামাজিক জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনে।

**************************
অধ্যাপক ডাঃ এ এইচ মোঃ ফিরোজ
দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ এপ্রিল ২০০৯।