হাইপোসপেডিয়াস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে মূত্রনালির মুখ বা ছিদ্র লিঙ্গের পরিবর্তে লিঙ্গের নিচের দিকে অবস্থান করে। উল্লেখ্য যে, মূত্রনালি বা ইউরেথ্রা হলো একটি নল যার মধ্য দিয়ে প্রস্রাব মূত্রথলি থেকে প্রবাহিত হয়ে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়।

হাইপোসপেডিয়াস একটি সাধারণ রোগ। প্রতি ৩০০ নবজাতক ছেলে শিশুর মধ্যে ১ জনের এ সমস্যা দেখা দেয়। এ অবস্থাটি জন্মের সময় দেখা দেয়। কিছুক্ষেত্রে এটা বংশগত হতে পারে।

অনেক সময় বাবা-মা শিশুর লিঙ্গের এ সমস্যাটি লক্ষ্য করেন না, যার ফলে পরবর্তী শিশুর জীবন করুণ ও দূর্বিসহ হয়ে উঠে। শল্য চিকিৎসা করালে সাধারণত লিঙ্গ তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়। হাইপোসপেডিয়াসের সাফল্যজনক চিকিৎসায় বেশিরভাগ পুরুষ প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর স্বাভাবিক যৌনকাজ চালাতে পারেন।

উপসর্গ

হাইপোসপেডিয়াসের ক্ষেত্রে মূত্রনালির মুখ লিঙ্গের মাথার বদলে লিঙ্গের নিচের দিকে অবস্থান করে। এ অবস্থান একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূত্রনালির মুখ লিঙ্গের মাথার কাছে অবস্থান করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই মুখ বা ছিদ্র লিঙ্গের মাঝামাঝি জায়গায় কিংবা লিঙ্গের গোড়ায় অবস্থান করে। খুব অল্প মানুষের এই মুখ অন্ডথলিতে বা অন্ডথলির নিচে অবস্থান করতে দেখা যায়।

অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে-

০ লিঙ্গ নিচের দিকে বেঁকে যাওয়া।

০ লিঙ্গের মাথার অর্ধেকটা লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বক দ্বারা ঢেকে থাকে।

০ প্রস্রাব করার সময় প্রস্রাবের ধারা অন্যদিকে ছড়িয়ে যাওয়া।

কারণ

হাইপোসপেডিয়াস জন্মগতভাবে উপস্থিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এর কারণ অজানা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা বংশগত।

পুরুষ ভ্রূণের লিঙ্গের বৃদ্ধির সময় কিছু হরমোন মূত্রনালি ও লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বক গঠনে উদ্দীপনা যোগায়। এসব হরমোনের কার্যকলাপে ত্রম্নটি ঘটলে হাইপোসপেডিয়াস হয় অর্থাৎ অস্বাভাবিক মূত্রনালি তৈরি হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

যেসব পরিবারে হাইপোসপেডিয়াসের ইতিহাস রয়েছে সেসব পরিবারের শিশুদের এ অবস্থা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

টেস্টটিউব শিশুদের হাইপোসপেডিয়াসের ঝুঁকি বেশি থাকে। এটা হয় আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) প্রক্রিয়ার সময় মা প্রাকৃতিক হরমোন প্রোজেস্টেরন-এর সংস্পর্শে থাকার কারণে।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

অধিকাংশ শিশুর হাইপোসপেডিয়াস নির্ণয় করা হয় শিশু জন্মের পর হাসপাতালে থাকার সময়টাতেই। তবে অনেক সময় হাইপোস পেডিয়াস খেয়াল নাও করা হতে পারে।

যাহোক, যখনই আপনি লক্ষ্য করবেন যে আপনার ছেলের মূত্র নালির মুখ লিঙ্গের মাথায় অবস্থিত নেই, সঙ্গে সঙ্গে আপনি আপনার ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। যদি দেখেন যে আপনার ছেলের লিঙ্গে অগ্রভাগের চামড়ার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেনি, কিংবা তার লিঙ্গ উত্থিত হবার সময় নিচের দিকে বেঁকে যায়, তাহলেও দেরি করবেন না, অতিসত্ত্বর চিকিৎসকের শরনাপন্ন হোন।

পরীক্ষা- নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়

সাধারণত চিকিৎসক আপনার ছেলের শারীরিক পরীক্ষা করেই হাইপোসপেডিয়াস নির্ণয় করেন।

জটিলতা

যদি হাইপোসপেডিয়াসের চিকিৎসা করা না হয় তাহলে শিশুর প্রস্রাব করতে খুব সমস্যা হতে পারে। শিশু যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হবে তখন যৌনমিলনে সমস্যা হবে। যৌন মিলন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা

মূত্রনালির মুখ সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হলো শল্য চিকিৎসা, প্রয়োজনে লিঙ্গটাকে সোজা করে দেয়া হয়। অপারেশনের সময় সার্জন লিঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া থেকে টিস্যু গ্রাফট করে প্রস্রাবের রাস্তাকে পুনর্গঠন করেন এবং হাইপোসপেডিয়াস ঠিক করে মূত্রনালির মুখকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসেন। অপারেশনের ক্ষেত্রে সাধারণত ৯০ মিনিট থেকে ৩ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। এ সময় শিশুকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হয়। কখনো কখনো দু’বার কিংবা তার বেশি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিক বয়সে অপারেশন করালে সবচেয়ে ভাল হয়, সাধারণত ৩ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে। তবে যেকোনো বয়সে অপারেশন করানো যায় এমনকি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায়ও। এ অপারেশনের আগে কিছুতেই শিশুর খৎনা করানো উচিত নয়, কারণ অপারেশনের সময় লিঙ্গের অগ্রভাগের চামড়ার প্রয়োজন হতে পারে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপারেশনের পর লিঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থায় কিংবা স্বাভাবিকের কাছাকাছি অবস্থায় ফিরে যায় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা হয় না। শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ ক্ষেত্রে লিঙ্গের নিচের দিকে ফিস্টুলা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ছিদ্রপথে প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে এবং এটা ঠিক করতে আরেকটি অপারেশনের প্রয়োজন হয়।

**************************
ডাঃ মিজানুর রহমান কল্লোল
লেখকঃ জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন, কমপ্যাথ লিমিটেড, ১৩৬, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা
দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ এপ্রিল ২০০৯।