কি খাবেন, কি খাবেন না

চুলপড়া সমস্যা যে শুধু শারীরিক সমস্যার কারণে হয় তাই নয়, যথাযথ পরিচর্যার অভাব এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের অভাবেও পুরুষ ও মহিলাদের চুল পড়ে। শারীরিক সমস্যা যেমনঃ থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, টাইফয়েডসহ কিছু রোগ-ব্যাধি, শরীরে ইনজেকশন, মাথায় খুশকি ও চর্মরোগ, দীর্ঘমেয়াদী এন্টিবায়োটিক সেবন, মহিলাদের হরমোন ট্যাবলেট সেবন, নারী-পুরুষের শরীরে একটি বিশেষ হরমোনের আধিক্য (এন্ড্রোজেনেটিকে এলোপেসিয়া), মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, হতাশা, পিতা-মাতার চুল পড়ার সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণে চুল পড়তে পারে। এছাড়া বিবাহিত মহিলাদের সন্তান ধারণের সময়ও চুল পড়তে পারে। যদি চুল পড়ার প্রকৃত কারণ সনাক্ত করে চিকিৎসা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে অবশ্যই চুলপড়া সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে চুলপড়া সমস্যার তাৎক্ষণিক কোন চিকিৎসা ও প্রতিকার নেই।

ক্ষেত্রবিশেষ চুলপড়া সমস্যা রোধের জন্য ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এছাড়া চুলপড়া রোধ ও নতুন চুল গজানোর ক্ষেত্রে হাতেগোনা মাত্র দুই-চারটি ওষুধ বের হয়েছে মাত্র।

মনে রাখতে হবে চুলপড়া সমস্যা রোধে শুধু ওষুধই একমাত্র পন্থা নয়। চুলের পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন এবং চুলবান্ধব আহারের মাধ্যমে চুলপড়া অনেকখানি রোধ করা যায়। আমি প্রায় ক্ষেত্রে লেখার সময় দুই-একটা উদাহরণ দিয়ে থাকি। আজো একটা উদাহরণ দেবো। আমি তিনজন সুপার স্পেশালিস্টের তত্ত্বাবধানে চুলপড়া সমস্যার চিকিৎসা ও হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পর্কে খানিকটা জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাই। আমি আগেও উল্লেখ করেছি এরা হলেন আমেরিকার বিখ্যাত হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডাঃ বার্নার্ড কোহেন ও ট্রাইকোলজিস্ট ডাঃ উলারি এবং সিঙ্গাপুরে ডাঃ লি। ডাঃ কোহেন বয়সে প্রায় আমার দেড়গুণ বড়। কিন্তু হ্নদয়ের দিক থেকে আমার চেয়েও কোমল। মায়ামির অপরূপ নৈসর্গিক অভিজাত এলাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে ডাঃ কোহেনের ডাক্তারী চেম্বার। অন্যরকম ব্যাপার। হোটেলটির একটি ফ্লোর ডাক্তারদের চেম্বার হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, মায়ামি হার্ট ইনস্টিটিউটের একটি ফ্লোরে রয়েছে লেসার ও কসমেটিক সেন্টার। আমি আমেরিকার ডাঃ উলারি ও সিঙ্গাপুরের ডাঃ লি-এর প্রসঙ্গে আলোচনা আর একদিন করবো। শুধু বার্নার্ড কোহেনের একটি কথা বলতে চাই। ডাঃ কোহেন আমেরিকার প্রখ্যাত হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট এন্ড ডার্মার্টো সার্জন। ক্যারিয়ার শুরু করেন ডার্মাটোলজিস্ট হিসেবে। প্রতিদিন ৪/৫টার বেশি রোগী দেখেন না। প্রতিদিন দুইটি হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করেন। এই হচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ কোহেন। আমাকে প্রায়ই বলতেন রোগীদের কখনো চুল নিয়ে কোন গ্যারান্টি দেবে না। চিকিৎসার পাশাপাশি চুলের পরিচর্যা, খাবার-দাবার এবং শৃঙ্খল জীবন-যাপনের পরামর্শ দেবে। ডাঃ কোহেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ডার্মাটোলজির ভলান্টারি প্রফেসর। আমি ডাঃ কোহেনের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করি। আমি রোগীদের কখনো আশার বাণী শুনাই না। আমি চুলপড়া সমস্যাকে কোন রোগের পর্যায়ে বিবেচনা করতে চাই না। তবে চুলের পরিচর্যা এবং যথাযথ খাদ্য তালিকা অনুসরণ করেও বহুক্ষেত্রে চুলপড়া সমস্যা রোধ করা যায়। চুলের পরিচর্যার বিষয়টি আর একদিন আলোচনা করবো। আজ শুধু চুলের জন্য সহায়ক খাবার নিয়ে লিখতে চাই।

চুলের সহায়ক খাবার রান্নাঘর থেকেই শুরু করুন। মনে রাখতে হবে সবুজ শাক-সবজির মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস বা পুষ্টি উপাদান চুলের জন্য খুব উপকারী। শাক-সবজি কখনো অধিক ফুটিয়ে রান্না করবেন না। এতে ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। খাবারে লবণ কম খাবেন। লবণ মাথার ত্বকের কোষে পানি জমে থাকতে সাহায্য করে। মাথার ত্বকের কোষে পানি জমে থাকলে চুলের গোড়া নরম হয়ে অধিক চুল পড়তে সাহায্য করে।

গরীব-মধ্যবিত্তের চুলের সহায়ক খাবার হচ্ছে সবুজ শাক-সবজি। দেশীয় ফল-মূল, প্রচুর পানি পান, প্রোটিন যেমন- প্রতিদিন একটা করে ডিম খাওয়া ইত্যাদি। তবে সামর্থøবানরা আঙ্গুরের রস (গ্রেপ ফ্রুইট ককটেল), আলু, বাঁধাকপি, মিক্সড সালাদ, কলা, মুরগির মাংস, ডিম খেতে পারেন।

ইটিং ফর হেয়ার পলিসিঃ

যা খাবেনঃ কম চর্বিযুক্ত খাবার যেমন-কম চর্বির চিজ, মাছ, মুরগি, রেড মিট, ডিম, দই, বাদামী চালের ভাত, বাদাম, তাজা ফল ও শাক-সবজি, গ্রীন সালাদ, হোলমিল ব্রেড এবং সিরিয়াল, মাখন নেই এমন দুগ্ধ ইত্যাদি।

যা খাবেন নাঃ আইসক্রিম, পেস্ট্রি কেক, লবণ, ফাস্টফুড, জাংক ফুড, চিনি, পশুর চর্বি, বাটার, ক্রিম, অধিক চর্বিযুক্ত চিজ, হুয়াইট ব্রেড ও ময়দা, ভাজা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, চকলেট এবং হোল মিল্ক ইত্যাদি। পাশাপাশি ধূমপান সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে।

**************************
লেখকঃ   ডাঃ মোড়ল নজরুল ইসলাম
চুলপড়া, যৌন সমস্যা ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেজার এন্ড কসমেটিক্স সার্জন
চেম্বারঃ লেজার স্কিন সেন্টার
বাড়ী নং-২২/এ, রোড-২, ধানমন্ডি, ঢাকা।
উৎসঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ০২ ডিসেম্বর ২০০৭