শিশুর মানসিক স্বাস্হ্য ও মনের বিকার নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, শিশুদের অনেক আচরণগত ত্রুটিই মানসিক রোগের পথ ধরে আসে। বয়স্কদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, অনেক অসুখ ও আচরণের বিচ্যুতি একমাত্র শিশুদের মধ্যেই বিদ্যমান। তার মধ্যে অতিপরিচিত- আঙ্গুল চোষা, দাঁত দিয়ে নখ কাটা থেকে মানসিক ভারসাম্যহীনতা পর্যন্ত হতে পারে। অনেক বাবা-মা তাদের বাচ্চার আঙ্গুল চোষা বা দাঁতে নখ কাটা নিয়ে বেশ বিচলিত  বোধ  করেন। এই লক্ষণ বহু শিশুর মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু এগুলো যে মোটেই মারাত্মক বা দুরারোগ্য ব্যাধি নয়, এটাও অভিভাবকদের জানা দরকার।

আঙ্গুল চোষা
এটা এক হিসেবে সর্বজনীন কুঅভ্যাস। পৃথিবীর যে কোনো দেশের শিশুদের মধ্যে এটা দেখা যায়। দু-তিন মাস বয়সের পর থেকেই অনেক বাচ্চা আঙ্গুল চুষতে শুরু করে। অবশ্য এক-দেড় বছরের পর থেকে সে অভ্যাসে কিছুটা ভাটা পড়ে। আঙ্গুলের মধ্যে বুড়ো আঙ্গুল চোষার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। এর ইংরেজি নাম ‘থামব[ &ৗ২৫০৯; ] সাকিং’। অনেক বাচ্চা আবার মাঝখানের দুটি আঙ্গুল মুখে পুরে দেয়। যে কোনো আঙ্গুল চোষাতেই নখ এবং দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে অনেক বাচ্চার সামনের দাঁত উঁচু হয়ে যায়।

এই অভ্যাসের কারণ
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাত্যহিক জীবনে শিশু কোনো ধরনের চাপের মুখোমুখি হলে মুখে আঙ্গুল দেয়। আবার ঘুমানোর সময় সম্ভবত ঘুম আনার জন্য আঙ্গুল মুখে দেয়া অনেক বাচ্চার স্বভাব। যদিও তিন বছরের পর থেকে আপনা আপনি এ প্রবণতা কমে যায়। আর যদি ৫/৬ বছর পরও শিশুর মধ্যে এ অভ্যাস থেকে যায় তবে এর পেছনে কোনো মানসিক কারণ আছে বলে ধরে নিতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, নিশ্চয়ই কোনো উদ্বেগ আর অশান্তি বা উৎকণ্ঠা আপনার শিশুকে বিচলিত করেছে। শিশু যখন ক্লান্ত হয় বা অনিশ্চিত বোধের শিকার হয়, তখন সে আঙ্গুল চুষে উত্তেজনার প্রশমন ঘটায়। দেখা গেছে, অন্য বাচ্চাদের তুলনায় অন্তর্মুখী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ অভ্যাস বেশি। যে কারণে ৫/৬ বছর বয়সের সময় কোনো কোনো শিশুর আঙ্গুল চোষার অভ্যাস আবার ফিরে আসে।

এর ফলাফল বা ক্ষতি
আঙ্গুল চোষার ফলে শিশুর সামনের দাঁত উঁচু হয়ে যায়। এ ব্যাপারে অবশ্য দ্বিমত রয়েছে অনেক দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের। তারা বলেন, ‘যে শিশু বংশগত নিয়মে সুঠাম দাঁতের অধিকারী, তার এ ক্ষতির সম্ভাবনা কম।’ তবে কিছু ক্ষতির ব্যাপার নিয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। যেমন- আঙ্গুলের নখের ক্ষয়। এছাড়াও অপরিচ্ছন্নতার কারণে পেটের পীড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এক্ষেত্রে করণীয়
একটা বয়সের পর শিশু যদি উল্লিখিত কুঅভ্যাস না ছাড়ে, তবে সেটা অবশ্যই সমস্যা। তাছাড়া এ আচরণ দৃষ্টিকটু তো বটেই। অনেক বাবা-মা বিব্রতকর এ পরিস্হিতি থেকে বাঁচতে শিশুকে সারাক্ষণ বকাবকি, ঠাট্টা, বিদ্রুপ এমনকি মারধরও করে থাকেন। এতে রোগমুক্তি তো ঘটেই না; উপরন্তু জেদের বসে প্রকাশ্যে আঙ্গুল চোষা বন্ধ করলেও আড়ালে বিপুল উদ্যমে এ অভ্যাস চালিয়ে যেতে থাকে।
শিশু মনোচিকিৎসক শিশুর আবেগের জগৎকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য সাইকোথেরাপি ও কাউসেলিংয়ের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি মনে করেন, বাচ্চার মা-বাবারও পরামর্শ প্রয়োজন। যাতে তারা পারিবারিক খুঁটিনাটি, ঝগড়া-বিবাদের হাত থেকে শিশুমনকে রক্ষা করতে পারেন।

দাঁত দিয়ে নখ কাটা
এ অভ্যাস শিশুদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। শিশুরা সবসময় এ কাজ যে ভেবে-চিন্তে করে তা কিন্তু নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ থেকে আঠারো বছর বয়সিদের অন্তত পাঁচ ভাগের দু’ভাগ এ কাজ করে থাকে। দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাস ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কম। আঠারো বছর পর এই অভ্যাস লক্ষণীয়ভাবে কমতে থাকে। তবে আঠারো বছর পরেও কিছু কিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে এ কুঅভ্যাস থেকেই যায়।

এই অভ্যাসের কারণ
হ মনোচিকিৎসকরা মনে করেন, শিশু যদি বাবা-মা কোনো একজনের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ বা প্রতিযোগী মনোভাব পোষণ করে-তখন নখ কামড়ানোর মধ্য দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

- এ বিদ্বেষের হাত থেকে মুক্তি পেতে শিশু তার নিজের নখ কামড়ায় এবং তার মধ্য দিয়েই বিদ্বেষকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে। নিজেকে আহত করে সে নিজেকেই শাস্তি দেয়।

- নখ-দংশন আসলে ধ্বংসকামী, উত্তেজনা প্রশমনের এক প্রন্হা।
- কোনো কারণে অত্যধিক উদ্বেগ ও একঘেয়েমিতে বিরক্ত হয়ে পড়লেও শিশু এ অভ্যাসের সুযোগ নেয়।

প্রতিকার বা করণীয়
- যেসব শিশু নখ কামড়াতে অত্যধিক শক্তি প্রয়োগ করে না, তাদের আত্মনির্ভরতা বাড়িয়ে এ কুঅভ্যাসের হাত থেকে মুক্ত করা যায়। আর একবার এ কুঅভ্যাস থেকে মুক্তি পেলে সে বুঝতে পারে-পরিবারের আর সবার মতো সে নিজেই নিজের সমস্যার সমাধান করতে পারবে।

-অনেক সময় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নখ-দংশনের কারণ বলে ডাক্তাররা ‘মাইনর ট্রাংকুলাইজার’ বা উৎকণ্ঠা কমানোর ওষুধ দিয়ে থাকেন।

এছাড়াও মনে রাখতে হবে, যেসব শিশু পারিবারিক নানা কারণে অপমানিত, লাঞ্ছিত হয়, অকারণে তিরস্কৃত হয়-তাদের সুপরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ কাজে চিকিৎসকের পাশাপাশি মা-বাবা এবং অভিভাবকদের ভুমিকা অনস্বীকার্য। ভুলে গেলে চলবে না, শিশুরা আকারে ছোট হলেও তাদের মান-অপমানবোধ বয়স্কদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়।


**************************
ডাঃ মোঃ আবদুল্লাহ-আল-ফারুক
লেখকঃ এমবিবিএস, এমডি (শিশু স্বাস্হ্য); নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ; কনসালট্যান্ট, নিওনেটোলজি ও শিশুরোগ বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
আমার দেশ, ২১ এপ্রিল ২০০৯।