সব মায়েরই প্রার্থনা, রোগবালাই যেন দূরে থাকে তাঁর খোকা থেকে। অনেক মা এমনও দোয়া করেন, খোকার যত অসুখ আমার হোক, তবু যেন খোকা সুস্থ থাকে। কিন্তু হিমোফিলিয়া রোগের বেলায় মা নিজের অজান্তে রোগটি বহন করেন এবং উত্তরাধিকারসূত্রে ছেলেকে দান করেন। মা নিজে এবং তাঁর মেয়েরা থাকেন সুস্থ। এ ক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলা চলে। তবে মেয়েরা যে একেবারে বিপদমুক্ত তা কিন্তু নয়। রোগ বহনকারী মেয়েরা যদি হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত কোনো পুরুষকে বিয়ে করে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার মেয়েরাও এ রোগে ভুগবে। তবে এর সংখ্যা অনেক কম। ১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হলো হিমোফিলিয়া দিবস। বাংলাদেশে হিমোফিলিয়া সোসাইটি দিবসটি পালন করল।

হিমোফিলিয়া কী
এটি একটি জন্মগত রক্তক্ষরণ রোগ। সাধারণত শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্ত বের হলে কয়েকটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঁচ থেকে আট মিনিটের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধে। রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অণুচক্রিকা ছাড়াও ১৩টি উপাদান প্রয়োজন। এই উপাদানগুলোকে ‘ফ্যাক্টর’ বলে। অ্যান্টি হিমোফিলিক ফ্যাক্টর বা ফ্যাক্টর ‘ঠওওও’-এর অনুপস্থিতি বা পরিমাণে কম থাকলে হিমোফিলিয়া হয়। আমাদের দেহের কোষে মোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে। এর মধ্যে এক জোড়া ক্রোমোজম লিঙ্গ নির্ধারণ করে। মেয়েদের কোষে থাকে এক্সএক্স এবং ছেলেদের কোষে এক্সওয়াই ক্রোমোজম। হিমোফিলিয়া জিন থাকে এই এক্স ক্রোমোজমের মধ্যে। এক্স ক্রোমোজম হচ্ছে হিমোফিলিয়া রোগের বাহন। যেহেতু মেয়েরা দুটো এক্স ক্রোমোজমের অধিকারী, তাই একটা রোগাক্রান্ত হলে অন্য এক্স ক্রোমোজম ভালো থাকে বলে সহজে মেয়েরা এ রোগে ভোগে না। ছেলেদের বেলায় একটা এক্স ক্রোমোজম থাকে। সেটা যদি হিমোফিলিয়া রোগ বহনকারী হয়, তাহলে ছেলেদের এ রোগ থেকে মুক্তি নেই। হিমোফিলিয়ার জিন বহনকারী নারীদের সাধারণত ‘ক্যারিয়ার’ বা বাহক বলা হয়।

যেসব উপসর্গ হতে পারে
ছোটবেলা থেকেই রক্তক্ষরণের প্রবণতা থাকে অনেকের। আবার জন্মের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কারও উপসর্গ দেখা দেয়। নবজাতকের বেলায় নাভি কাটলে সহজে রক্ত পড়া বন্ধ হতে চায় না। আবার বাচ্চা যখন হামাগুড়ি দিতে শেখে, তখনো দেখা যায় হাঁটুতে নীল জখম হয়ে গেছে বা হাঁটু ফুলে গেছে। শিশুদের মুসলমানির সময়ও সহজে রক্ত বন্ধ হয় না।

কী ধরনের এবং কোথায় বেশি রক্তক্ষরণ হয়
ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া সহজে বন্ধ না হওয়া সব হিমোফিলিয়া রোগীর বৈশিষ্ট্য। ক্ষতস্থান থেকে অল্প অল্প রক্ত চলবে কয়েক দিন থেকে সপ্তাহব্যাপী। শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে হঠাৎ রক্ত পড়া শুরু হতে পারে, মুখের ভেতর দাঁতের কামড় লেগে অথবা ত্বকের নিচে দেখা গেল নীল জখম হয়ে গেছে একটু আঘাতেই। ক্ষত যদি বেশি হয় তাহলে জায়গাটা ফুলে উঠবে, ব্যথা হবে, এমনকি জ্বরও হতে পারে। অনেকের আবার দাঁত তুলতে গিয়েই ধরা পড়ে রোগটা। দাঁত তোলার পর রক্ত পড়া সহজে বন্ধ হয় না। সবচেয়ে মারাত্মক হয় মাথায় আর অস্থিসন্ধিতে রক্তক্ষরণ হলে। অস্থিসন্ধিতে, বিশেষ করে হাঁটুতে রক্তক্ষরণ হলে হাঁটু ফুলে উঠবে, ব্যথা হবে, রোগী হাঁটতে পারবে না। এ অবস্থায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চিকিৎসা না করালে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে গোড়ালির অস্থিসন্ধি বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক সময় বড়দের বেলায় প্রস্রাবের সঙ্গেও রক্ত পড়তে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রোগী রক্তস্বল্পতা ও আর্থ্রাইটিসে ভোগে। শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গের ওপর-যেমন মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ইত্যাদির ওপর অনেক সময় জমাট রক্তের চাপ পড়লে স্মায়বিক দুর্বলতা হতে পারে। মোট কথা, শরীরে যেকোনো জায়গায় রক্তক্ষরণের ফলে বিভিন্ন ধরনের যেসব উপসর্গ হতে পারে, তা রক্তের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

চিকিৎসা
এটি ভালো হয় না। শতকরা ৯০ ভাগ রোগী বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার আগেই মারা যায়। তীব্র হিমোফিলিয়া রোগী বছরে অনেকবার রক্তক্ষরণের শিকার হতে পারে, এমনকি এটা ৫০ বারও হতে পারে। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে বাইরে থেকে ফ্যাক্টর ঠওও/ওঢ কনসেনট্রেটেড ইনজেকশন দিতে হবে রক্তক্ষরণের মাত্রা অনুযায়ী অথবা রক্তের সাদা জলীয় অংশ (ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা) দিতে হবে। এই রোগীদের বেলায় মানসিক ও সামাজিক সহায়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মাকেই এগিয়ে আসতে হবে আগে। কেননা আবেগ রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। রোগী যেন কখনো নিজেকে পঙ্গু মনে না করে, সেভাবেই তার মনোবল গড়ে তুলতে হবে। বাচ্চাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কোনোক্রমেই যেন সে আত্মবিশ্বাস না হারায়। জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে মা-বাবাকে কিছু প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যেন জরুরি অবস্থায় ব্যবস্থা নিতে পারেন। বয়স্ক রোগীরা যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজে ইনজেকশন নিতে পারেন, তাহলে হাসপাতালে ভর্তির সমস্যা, বহির্বিভাগে দেখানোর ঝক্কি এবং অন্যান্য খরচ অনেক কমে যাবে। 
 
**************************
মাসুদা বেগম
রক্তরোগ ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 
প্রথম আলো, ২২ এপ্রিল ২০০৯।