মূত্রথলির প্রদাহকে চিকিৎসা পরিভাষায় সিস্টাইটিস বলে। যদিও মহিলাদের এই রোগ সচরাচর বেশি হয়, তবে পুরুষরাও এতে আক্রান্ত হন এবং সববয়সী পুরুষরাই আক্রান্ত হন।

সিস্টাইটিসের ধরন

সিস্টাইটিস বা মূত্রথলির প্রদাহের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যেমন-

০ ব্যাকটেরিয়াজনিত মূত্রথলির প্রদাহঃ এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন। পায়খানার রাস্তা থেকে ব্যাকটেরিয়া এসে মূত্রনালি দিয়ে মূত্রথলিতে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণ ঘটায়।

০ ইন্টারসটিশিয়াল সিস্টাইটিসঃ সাধারণত মূত্রথলিতে আঘাতের কারণে এটি হয় এবং এক্ষেত্রে সংক্রমণের উপস্থিতি খুব কম হয়। এ ধরনের রোগীদের রোগ নির্ণয়ে সচরাচর অনেকেই ভুল করেন। এ রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় না। রোগের কারণ অজানা। বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে।

০ ইয়োসিনোফিলিক সিস্টাইটিসঃ এটি সিস্টাইটিসের একটি বিরল ধরন। বায়োপসির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। এসব ক্ষেত্রে মূত্রথলির দেয়াল অসংখ্য ইয়োসিনোফিলে পূর্ণ থাকে। যদিও এ ধরনের রোগের সঠিক কারণ জানা যায়নি, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ এ রোগ বাড়িয়ে দেয়।

০ রেডিয়েশন সিস্টাইটিসঃ যেসব রোগী ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন নিচ্ছেন, তাদের সচরাচর এ সমস্যা দেখা দেয়।

০ হেমোরেজিক সিস্টাইটিসঃ এ ধরনের মূত্রথলির প্রদাহে প্রস্রাবের সাথে রক্ত পড়ে।

রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো

স্বাভাবিক জীবাণুমুক্ত নিম্ন মূত্রপথ (মূত্রনালি ও মূত্রথলি) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হলে সিস্টাইটিস হয়। এ ক্ষেত্রে নিম্ন মূত্রপথ জ্বালা করে ও প্রদাহ হয়। এটা খুবই সাধারণ।

বয়স্ক লোকদের সিস্টাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

শতকরা ৮৫ ভাগেরও বেশি ক্ষেত্রে সিস্টাইটিসের কারণ হলো ই.কলাই নামক ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলী-অন্ত্র পথের নিচের অংশে দেখা যায়। যৌনসঙ্গম সিস্টাইটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ যৌনসঙ্গমের সময় ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালি দিয়ে মূত্রথলিতে ঢুকতে পারে। একবার ব্যাকটেরিয়া মূত্রথলিতে ঢুকলে সাধারণত প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই যদি ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার শুরু করে তাহলে মূত্রথলিতে সংক্রমণ ঘটে।

সিস্টাইটিসের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে মূত্রথলি অথবা মূত্রনালিতে প্রতিবন্ধকতা, মূত্রপথে কোনো যন্ত্রপ্রয়োগ (যেমন ক্যাথেটার বা সিস্টোস্কপ), ডায়াবেটিস, এইচআইভি এবং ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার কারণে কিউনির ক্ষতি ইত্যাদি।

বয়স্ক লোকদের সিস্টাইটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে কারণ কিছু অবস্থা যেমন প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি, প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ এবং মূত্রনালির সংকীর্ণতার জন্য মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি হতে পারে না; এর ফলে মূত্রথলিতে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে।

আরো কিছু অবস্থা সিস্টাইটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন-

০ পর্যাপ্ত তরল না খাওয়া।

০ যত্রতত্র পায়খানা করে ফেলা অর্থাৎ পায়খানা ধরে রাখতে না পারা।

০ হাঁটা চলা কম করা অথবা না করা।

০ দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকা।

উপসর্গ

০ তলপেটে চাপ অনুভব করা।

০ প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা কষ্ট হওয়া।

ঘনঘন প্রস্রাব করা অথবা প্রস্রাবের তীব্র ইচ্ছা জাগা।

০ রাতের বেলা প্রস্রাবের ইচ্ছা জাগা।

০ প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া।

০ প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া।

০ প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হওয়া।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

০ প্রস্রাবের শ্বেত রক্ত কণিকা অথবা লোহিত কণিকা যাচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য প্রস্রাব বিশেস্নষণ।

০ ব্যাকটেরিয়ার ধরন নিরূপন ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য প্রস্রাবের কালচার পরীক্ষা।

চিকিৎসা

যেহেতু ইনফেকশন কিডনিতে ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে এবং বয়স্ক লোকদের জটিলতা হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে, তাই সর্বদা দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে।

ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ যেসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় সেসব হলো-

০ নাইট্রোফুরানটয়েন

০ ট্রাইমেথোপ্রিম-সালফামেথোক্সাজল

০ অ্যামোক্সিসিলিন

০ সেফালোসপরিন

০ সিপ্রোফ্লোক্সাসিন অথবা লিভোফ্লোক্সাসিন

০ ডক্সিসাইক্লিন

প্রস্রাবের কালচারের ফলাফল দেখে অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী অথবা বারবার মূত্রপথের সংক্রমণের ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে হবে নইলে কিডনিতে সংক্রমণ হওয়ার আশংকা থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। তীব্র উপসর্গ চলে যাওয়ার পর কখনো কখনো স্বল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করা হয়।

সিস্টাইটিসের রোগীর প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও প্রস্রাবের তীব্র ইচ্ছে থাকলে পাইরিডিয়াম (চুৎরফরঁস) ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রস্রাবে ব্যাকটেরিয়ার ঘনত্ব কমানোর জন্য প্রস্রাবে অম্স্নের পরিমাণ বাড়ায় এমন ব‘ যেমন অ্যাসকরবিক অ্যাসিড অথবা ক্র্যানবোর জুস খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া একটা পুরানো পন্থা যেমন লবণ-পানির ডুশ বেশ কার্যকর। কুসুম গরম পানিতে প্রচুর লবণ মিশিয়ে গোসল করলে ভাল পল পাওয়া যায়।

চিকিৎসা শেষে কিংবা চিকিৎসার মধ্যে পুনরায় চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে- মূত্রথলিতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি আছে কিনা তা জানার জন্য। এ ক্ষেত্রে আবারো প্রস্রাবের কালচার পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিস্টাইটিস অস্বস্তিকর, তবে চিকিৎসার পর কোনো ধরনের জটিলতা সৃষ্টি না করেই চলে যেতে পারে।

সম্ভাব্য জটিলতা

০ দীর্ঘস্থায়ী কিংবা বরবার মূত্রপথে সংক্রমণ

০ জটিল মূত্রপথের সংক্রমণ বা পাইলো নেফ্রাইটিস।

০ কিডনির কার্যকরিতা তীব্রভাবে লোপ পাওয়া।

প্রতিরোধ

০ যৌনাঙ্গ সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। মলত্যাগের পর পায়ু এলাকা সামনে থেকে পেছনে দিকে ধৌত করবেন। এতে পায়ু এলাকা থেকে মূত্রনালিতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের সম্ভাবনা কমবে।

০ প্রচুর তরল পান করবেন যাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের ব্যাকটেরিয়া প্রস্রাবের থলি থেকে বের হয়ে যেতে পারে। যৌন সঙ্গমের পরপরই প্রস্রাব করতে হবে, এতে যৌন সঙ্গমকালে জড়ানো যেকোনো ব্যাকটোরিয়া বংশবিস্তার করে, তাই ঘন ঘন প্রস্রাব করলে সিস্টাইটিসের ঝুঁকি কম থাকে।

০ ক্যানবেরি জুস পান করলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। সিস্টাইটিস রোগ করতে ক্র্যানবেরির নির্যাস দিয়ে তৈরি ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে।

***************************
ডাঃ মিজানুর রহমান কল্লোল
চেম্বারঃ কমপ্যাথ লিমিটেড, ১৩৬, এলিফ্যান্ট রোড, (বাটা সিগন্যাল ও হাতিরপুল বাজারের সংযোগ রাস্তার মাঝামাঝি), ঢাকা।
 দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ এপ্রিল ২০০৯।