কিছু কিছু চর্ম রোগ আছে যা গরম এলেই দেখা দেয় আবার শীত এলে আপনা আপনিই কমে যায়। সে রকম দু’একটি রোগ নিয়ে আজ সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা যাক। যারা ঘামাচিতে ভোগেন তারা লক্ষ করে থাকবেন গরম চলে গেলে গামাচি চলে যায়। যারা দাউদে ভোগেন তারা দেখবেন গরম কাল এলেই তা বাড়তে থাকে এবং প্রচন্ড চুলকায়। যাদের শরীরে ছুঁলি হয় তারা লক্ষ করলে দেখবেন শীত এলে ছুঁলি আর দেখা যায় না। কিন্তু গরমকাল আসতে না আসতেই তা আবার ফুটে উঠতে থাকে। প্রথমত দাউদের কথায় আসা যাক, গরম এলে শরীরের ঘাম হয় এবং শরীর ভেজা থাকে। ফলে শরীরে ছত্রাক বা ফাংগাস জন্মায়। মনে রাখতে হবে ভেজা শরীরই হলো ছত্রাক জন্মানোর উর্বর ক্ষেত্র। তাই যাদের শরীরে ঘাম বেশি হয়, তারা সব সময় ঘামে ভেজা কাপড় এড়িয়ে চলবেন। কাপড় ঘামে ভিজে চুপ চুপ হয়ে আছে অথচ আপনি তা পাল্টালেন না তা হলে আপনার শরীরে দাউদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। আবার যারা শরীরিকভাবে মোটা তাদের দেহে বেশি ভাজ হতে দেখা যায়। সেই ভাজের মধ্যে ঘাম আর ময়লা বেশি জমে থাকে বলে দেহের ভাজমুক্ত স্থানে ছত্রাক বা ফাংগাস বেশি হতে দেখা যায়। এক হিসেবে দেখা গেছে আমাদের দেশে প্রতি বছর অন্তত পক্ষে ৭০-৮০ হাজার লোক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আবার বিশ্বব্যাপী এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ লোক তাদের জীবদ্ধশায় কখনো না কখনো এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

ছত্রাক বা ফাংগাস জনিত যে সমস্ত চর্ম রোগ আমাদের দেশে দেখা যায় সেগুলোকে মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- ১. দাউদ ২. ছুঁলি ও ৩. ক্যানডিডিয়াসিস

এই তিন ধরনের ছত্রাক প্রজাতির সকলেই মূলতঃ ত্বকের বাইরের অংশকে আক্রমণ করে এবং সেই আক্রমণ স্যাঁতস্যাঁতে, নোংড়া এবং ঘর্মাক্ত দেতে সব চেয়ে বেশি হতে দেখা যায়।

দাউদঃ
দাউদ দেহের যেকোন স্থানে দেখা দিতে পারে। যে স্থানে দেখা দেয় সেই স্থানটিতে গোলাকার চাকার মতো দাগ দেখা যায়। যার মধ্যখানের চামড়া প্রায় স্বাভাবিক আকারে দেখতে হলেও দাগের পরিধিতে ছোট ছোট গোটা দেখা যায় এবং দাগের পরিধি উঁচু বিভক্তি লাইন আকারে লক্ষ্য করা যায়। চুলকালে সেখান থেকে কষ ঝড়তে থাকে। শরীরের যেকোন স্থানে এর আক্রমণ ঘটতে পারে। তবে দেখা গেছে যে সাধারণত তলপেট, পেট, কোমড়, পাছা, পিঠ, মাথা, কুচকি ইত্যাদি স্থানে এর আক্রমণ বেশি ঘটতে দেখা যায়।

ছুলিঃ
এটিও একটি ছত্রাক জনিত চর্ম রোগ। ছত্রাকের যে জীবাণু দিয়ে এ রোগটি হয় তার নাম ম্যানাছাজিয়া ফার ফার। গরমকালে এ রোগটি হয় এবং শীতকাল এলে এমনিতেই যেন মিলিয়ে যায়। গরমকালে এই রোগ হওয়ার কারণ হচ্ছে ত্বক গরমকালে ঘামে ভেজা থাকে ফলে ভেজা স্থানে এই রোগের জীবাণুর আক্রমণ ঘটে। এ রোগে আক্রান্ত স্থানে হালকা, বাদামী, সাদা-গোলাকৃতির দাগ হতে দেখা যায়। সাধারণত বুক, গলার দু’পার্শ্বে, ঘাড়ের পিছন দিক, পিঠের উপরের অংশ, বগলের নিচে, এমনকি সারা শরীরে ও হয়ে থাকতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ত্বক দেখতে সাদা হয় তাই অনেকে আবার একে শ্বেতী বলেও ভাবতে শুরু করে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে শ্বেতীর সঙ্গে এর কোনই সম্পর্ক নেই।

ঘামাচিঃ
গরমকালের আর একটি বিব্রতকর রোগের নাম হচ্ছে ঘামাচি। এ রোগটি গরমকালেই হয়। শীত এলে আপনা আপনিই রোগটি ভাল হয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগটির নাম হলো মিলিয়ারিয়া। এটি একটি ঘর্মগ্রন্থির রোগ। ঘর্মগ্রন্থির নালী অতিরিক্ত আর্দ্রতা আর গরমে বন্ধ হয়ে এই রোগের সৃষ্টি করে। তবে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতা থাকলে এ রোগটি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। যেমন ধরুন কোন ব্যক্তি যদি ঘরে, অফিসে এবং গাড়িতে এয়ারকুলার ব্যবহার করেন তবে বলা যায় যে তার এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা গরম কালেও নেই। যারা তা পারেন না তাদের সব সময়ই ঠান্ডা পরিবেশে থাকতে হবে। অর্থাৎ একটি ফ্যান অন্তত সার্বক্ষণিকভাবে মাথার উপরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। খোলা মেলা অর্থাৎ আবদ্ধ ঘর না হওয়াই বাঞ্চনীয়। গ্রীষ্মকালে দেহ থেকে প্রচুর পরিমাণে ঘাম নিঃসরণ হতে থাকে বলে তখনকার এত বেশি পরিমাণ নিঃসরণ বা ঘাম কেবল মাত্র ঘর্মনালীর সরু ছিন্দ্র পথে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয় না। ফলে ঐ নিঃসরণ ঘর্মগ্রন্থির নালীকে ফুটো করে ত্বকের নিচে এসে জমা হতে থাকে যা পানি ভর্তি ছোট ছোট দানার আকারে ফুলে উঠতে দেখা যায় এবং যা চুলকায় এবং তাতে সামান্য জ্বালাপোড়া ভাবও থাকে। মূলত এটাই হচ্ছে ঘামাচি।

ঘামাচি তিন ধরনের হয়। প্রথমে আসা যাক মিলিয়ারিয়া, কৃষ্টালিনা, এক্ষেত্রে ত্বক দেখতে প্রায় স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। সাধারণত এক্ষেত্রে কোন উপসর্গ থাকে না। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ মিলিয়ারিয়া, রুবরার ক্ষেত্রে ঘর্মনালীতে বদ্ধতা দেখা দেয় এবং এক্ষেত্রে ত্বকের উপরে ছোট ছোট অসংখ্য গোটা হতে দেখা যায় এবং গোটার মাথায় পানির দানা থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। এবং ত্বক স্বাভাবিকের চেয়ে আপেক্ষিকভাবে লালচে রঙের দেখা যায়। এক্ষেত্রে থাকা প্রচন্ড চুলকানি যা শরীরের মূল অংশ অর্থাৎ বুক, পিঠ ও ঘাড়ে বেশি হতে দেখা যায়। তৃতীয়টি বা মিলিয়ারিয়া প্রফান্ডা এর ক্ষেত্রে ঘর্মনালীর বদ্ধতা থাকে ত্বকের অনেক গভীরে ফলে ত্বক দেখতে অনেকটা স্বাভাবিক ধরনের বলে মনে হতে পারে। এ ৩টির মধ্যে দ্বিতীয়টির আক্রমণ হয় বেশি তীব্র। একে ঐবধঃ ৎধংয ও বলা হয়ে থাকে। গরম ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি হয়। তেল মাখলে এ রোগের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। যারা এ রোগে ভুগছেন তারা গরম স্যাত স্যাতে ও আবদ্ধ পরিবেশ এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজন হলে একজন চর্ম রোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন।


 

***************************
ডাঃ দিদারুল আহসান
লেখকঃ চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বারঃ আলরাজী হাসপাতাল, ১২, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫,
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ এপ্রিল ২০০৯।