পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ঃ শিশু জন্মের সময় সাধারণত আনডিসেনডেড টেসটিস নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসক আপনার শিশুর কুঁচকি এলাকা কটি থেকে অণ্ডথলি পরীক্ষা করেন।

যদি অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে স্বাভাবিক অবস্থানে না থাকে, তাহলে রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসক এবার কুঁচকিতে কিংবা কুঁচকি এলাকার আশপাশে অণ্ডকোষ খুঁজে দেখতে পারেন। অণ্ডকোষ পেটের মধ্যে অবস্থান করলে তা আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে নিরূপণ করা যেতে পারে। রোগ নির্ণয়ে এক্স-রে কিংবা আলট্রাসাউন্ড বেশ সহায়ক। চিকিৎসক আপনার শিশুকে একজন পেডিয়াট্রিক ইউরোলজিস্টের কাছে পাঠাতে পারেন পুনরায় পরীক্ষা করে দেখার জন্য।

সন্দেহজনক আনডিসেনডেড টেসটিসের ক্ষেত্রে এটাকে অবশ্যই রিট্রাক্টাইল টেসটিস থেকে পৃথক করতে হবে। রিট্রাক্টাইল টেসটিসে অণ্ডকোষ কুঁচকি ও অণ্ডথলির মধ্যে সামনে-পেছনে নড়াচড়া করে। অতীতে রিট্রাক্টাইল টেসটিসকে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হতো না এবং এর চিকিৎসার প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হতো না। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় দেখা গেছে, আনডিসেনডেড টেসটিসের মতো রিট্রাক্টাইল টেসটিসেরও চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।

জটিলতাঃ অণ্ডথলিতে অণ্ডকোষ নেমে না এলে তা বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে­
? অণ্ডকোষে ক্যান্সার।
? বন্ধ্যত্ব সমস্যা। শুক্রাণুর পরিমাণ ও গুণগত মান কমে যাওয়া।
? অণ্ডকোষে প্যাঁচ খাওয়া। শুক্রবাহী নালী পেঁচিয়ে যাওয়ার কারণে অণ্ডকোষের রক্তসরবরাহ ব্যাহত হওয়া।
? ইনগুইনাল হার্নিয়া কুঁচকিপথে অন্ত্র ঠেলে চলে আসা।
? পুরুষের স্তন ক্যান্সার।
? তলপেটের নিম্নাংশের হাড়ে চাপ লাগার কারণে অণ্ডকোষে ভোঁতা আঘাত লাগা বা অণ্ডকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

যেসব পুরুষের আনডিসেনডেড টেসটিস রয়েছে; শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছে কিংবা হয়নি, তাদের অণ্ডকোষে ক্যান্সার হওয়ার অনেক ঝুঁকি থাকে। আনডিসেনডেড টেসটিস রয়েছে এমন পুরুষের ৩ থেকে ৫ শতাংশের অণ্ডকোষে ক্যান্সার হয়।
চিকিৎসাঃ ছয় মাস বয়সের পর অণ্ডকোষ নিজে নিজে অণ্ডথলিতে নেমে আসার ঘটনা খুবই বিরল। যদি চিকিৎসক মনে করেন অণ্ডকোষ প্রাকৃতিকভাবে অণ্ডথলিতে নেমে আসবে না, তাহলে তিনি হরমোন থেরাপি, শল্যচিকিৎসা কিংবা দু’টি পদ্ধতিরই পরামর্শ দিতে পারেন।

যেহেতু অণ্ডকোষের নেমে আসা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয় হরমোনের দ্বারা, তাই কখনো কখনো হরমোন থেরাপির মাধ্যমে অণ্ডকোষের নেমে আসাকে ত্বরান্বিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে কেবল হিউম্যান কোরিওনিক গোনোডোট্রপিন (এইচসিজি) হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণভাবে এই ইনজেকশন সপ্তাহে দু’বার করে মোট চার সপ্তাহ দেয়া হয়। এর সাফল্যের হার সন্তোষজনক।

চিকিৎসকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি সহজ শল্যচিকিৎসার পরামর্শ দেন, যার নাম অরকিওপেক্সি বা অরকিডোপেক্সি। এটা শিশুর এক থেকে দুই বছরের মধ্যে করা হয়। এ ক্ষেত্রে কুঁচকিতে একটা ইনসিশন দেয়া হয়, আরেকটি ইনসিশন দেয়া হয় অণ্ডথলিতে। এরপর অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে এনে ঠিকমতো অবস্থানে রেখে সেলাই করে দেয়া হয়।
যদি অণ্ডকোষ খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ল্যাপারোস্কপি পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি ছোট ভিডিও ক্যামেরাযুক্ত ল্যাপারোস্কপি যন্ত্র পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে অণ্ডকোষ খুঁজে বের করতে পেট ও কুঁচকি এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়। অণ্ডকোষ খুঁজে পাওয়ার পর চিকিৎসাব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকতে পারে। এটা সার্জারি বা ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে। যদি শিশুর দু’টি অণ্ডকোষই অনুপস্থিত থাকে, তাহলে চিকিৎসক তার হরমোন ও ক্রোমোসোম পরীক্ষা করে দেখতে পারেন তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না।

আনডিসেনডেড টেসটিস যত দ্রুত সম্ভব ঠিক করতে হবে, কারণ দেখা গেছে এক বছর বয়সেই শুক্রাণুর পরিমাণ কমে যায়। এ ছাড়া পরে অণ্ডকোষে ক্যান্সার হওয়ার বিরাট ঝুঁকি থাকে।

জীবনযাপন ও ঘরোয়া ব্যবস্থাপনাঃ অপারেশন বা শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে আনডিসেনডেড টেসটিস ঠিক করতে সাধারণত সময় লাগে ৩০-৬০ মিনিট। শল্যচিকিৎসার পর আপনার শিশুকে চিকিৎসকের নির্দেশনা মতো ব্যথার ওষুধ দেবেন এবং অপারেশনের জায়গা পরিষ্কার রাখবেন।

কোনো বমি হলে সেটা সাধারণত অ্যানেসথেসিয়ার কারণে হয়। যদি আপনার শিশুর অনবরত বমি বমি ভাব, বমি, অস্বস্তি, জ্বর বা অপারেশনের কাটা স্থান থেকে রক্তপাত হতে থাকে; তাহলে অতি সত্বর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। অণ্ডথলি থেকে যাতে অণ্ডকোষ সরে না যায়, তার ব্যবস্থা নিতে শিশুকে আপাতত তার খেলনা নিয়ে নড়াচড়া করা থেকে বিরত রাখুন, উদাহরণস্বরূপ তাকে ট্রাইসাইকেল চালাতে দেবেন না। বয়স্ক শিশুর ক্ষেত্রে, রোগ সম্পূর্ণ সেরে না ওঠা পর্যন্ত তাকে সব ধরনের খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন।
লেখকঃ জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন।

************************
ডাঃ মিজানুর রহমান কল্লোল
চেম্বারঃ কমপ্যাথ লিমিটেড, ১৩৬ এলিফ্যান্ট রোড (বাটা সিগনাল ও হাতিরপুল বাজারের সংযোগ সড়কের মাঝামাঝি), ঢাকা। দৈনিক নয়া দগিন্ত, ২৬ এপ্রিল ২০০৯।