আয়োডিন শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য উপাদান। এটি আমাদের শরীরে থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে সহায়তা করে। এর অভাবে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের ৪৭ শতাংশ ভাগ লোক আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। আমাদের দেশে আয়োডিনের অভাবজনিত প্রতিবন্ধী লোকের সংখ্যা কয়েক কোটি। উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। প্রতিবছর প্রবল বৃষ্টি ও বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় এসব অঞ্চলের মাটি থেকে আয়োডিন ধুয়ে যায়। এতে মাটিতে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা দেয়। এ রকম মাটিতে জন্মানো ফসলে আয়োডিনের পরিমাণ খুবই কম থাকে অথবা একেবারেই থাকে না। ফলে এসব অঞ্চলের লোকজন ক্রমাগত আয়োডিনবিহীন খাবার খেয়ে আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়। সমুদ্রের পানিতে প্রচুর পরিমাণ আয়োডিন থাকে। সমুদ্রের পানির এ আয়োডিন রোদে বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টির পানির মাধ্যমে মাটিতে মিশে মাটিকে আয়োডিনসমৃদ্ধ করে। পানি ও মাটিতে পর্যাপ্ত আয়োডিন থাকলে উদ্ভিদজাত ও প্রাণিজ খাবারে প্রয়োজনীয় আয়োডিন পাওয়া যায়।

সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে, আয়োডিনের অভাবে শুধু ঘ্যাগ বা গলগণ্ড রোগ হয়ে থাকে। আসলে আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যার ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত। আয়োডিনের অভাবে ঘ্যাগ বা গলগণ্ড ছাড়াও মায়ের বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব, স্মায়বিক দুর্বলতা, বধিরতা, বাকশক্তিহীনতা, বিভিন্ন রকম দৈহিক ত্রুটি, মানসিক প্রতিবন্ধকতা বা হাবাগোবা হওয়া, বামন বা বেঁটে হওয়া, শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিনের প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবে পানি এবং দৈনন্দিন খাবার থেকেই এ পরিমাণ আয়োডিন পাওয়া যেতে পারে। সামুদ্রিক মাছ, কডলিভার অয়েল, দুধ, মাংস, খাদ্যশস্য ও শাকসবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন থাকে।

আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা প্রতিরোধের অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা। আয়োডিনযুক্ত লবণ আর্দ্রতারোধক প্যাকেটে বাজারজাত করতে হবে। ঘরে রাখার সময় বয়াম বা কৌটার মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে রাখতে হবে। পানিতে ধুয়ে ফেললে আয়োডিনযুক্ত লবণের গুণ নষ্ট হয়ে যায়। আয়োডিনযুক্ত লবণ জলীয় বাষ্প, সূর্যের আলো ও উচ্চ তাপমাত্রা থেকে দূরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, লবণে আয়োডিন মেশানোর এক বছরের মধ্যে তা ব্যবহার করতে হবে। আয়োডিনযুক্ত লবণে লেবুর রস মেশালে তা স্বচ্ছতা হারিয়ে কালচে রং ধারণ করে। এভাবে যে-কেউ আয়োডিনযুক্ত লবণ শনাক্ত করতে পারে।

আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা কারও একবার দেখা দিলে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা প্রায় অসম্ভব। তাই আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যাগুলোর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই বিশেষভাবে কাম্য। এ জন্য আয়োডিনের গুরুত্ব, এর অভাবজনিত সমস্যা ও প্রতিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সঠিক মাত্রায় আয়োডিনমিশ্রিত লবণ বাজারজাত করে তা ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। 
 
**************************
মুহাম্মদ কামরুজ্জামান খান
কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল ২০০৯।