দাঁত থাকতে দাঁতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যারা বোঝেন না, দাঁতের যত্ম নেন না, অল্প সমস্যা হলেই দন্ত চিকিৎসকের কাছে যান না এবং দাঁতের সঠিক পরিচর্যা করেন না; তারাই মুল্যবান দাঁত অকালে হারান এবং দাঁতের যন্ত্রণায় ভোগেন। অথচ একটু সচেতন হলে, প্রতিদিন দাঁতের যত্ম নিলে, প্রয়োজন হলেই দন্ত বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাঁতের মারাত্মক কোনো সমস্যা হতেই পারে না। দাঁতে নানা ধরনের রোগ হতে পারে। ওই সবের মধ্যে জিনজিভাইটিস বা মাড়ির রোগ অন্যতম। জিনজিভাইটিসকে সাধারণ মানুষ পাইওরিয়া বলে। জিনজিভাইটিস কেন হয় এবং এর প্রতিকার কী, সেটাই আমার আজকের আলোচ্য বিষয়।
 

একটি দাঁতকে দু’ভাগে ভাগ করলে মুখের ভেতরের দৃশ্যমান অবস্হায় থাকা অংশটিকে বলা হয় ক্রাউন বা মুকুট। আর মাড়ি দ্বারা আবৃত অংশটিকে বলা হয় রুট বা শেকড়। এই রুট বা শেকড় অংশে দাঁত চারদিকের মাড়ির সঙ্গে পেরিওডেন্টাল মেমব্রেন দ্বারা শক্তভাবে আটকানো থাকে। প্রতিদিনের খাবারের পর যদি ঠিকমত দাঁত পরিষ্কার করা না হয়, তাহলে দাঁত ও মাড়ির মাঝে খাদ্যকণা জমে যায়। ফলে ডেন্টাল প্ল্যাকের সৃষ্টির হয়, যা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে পাথরে পরিণত হয়। এ পাথর দেখতে অনেকটা হলুদ বর্ণের হয়। পাথর জমতে জমতে এক পর্যায়ে দাঁতের গোড়া থেকে মাড়ি সরে গিয়ে ফুলে যায়।

যেহেতু পাথর শক্ত এবং মাড়ি খুবই নরম, সেহেতু কথা বলার সময় অথবা খাওয়ার সময় মাড়ির সঙ্গে পাথরের ঘর্ষণ হয়। এ কারণেই মাড়িতে ঘা হয়। এক পর্যায়ে এ ঘায়ের স্হান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এ সময় রোগী বা রোগিণী ঠান্ডা-গরম, মিষ্টি ও টক জাতীয় খাবার মুখে দিতে পারে না। কারণ এ সব জিনিস খেতে গেলেই প্রচন্ড শির শির অনুভুত হয় এবং মুখে খুব দুর্গন্ধ হয়। এ রোগকেই বলা হয় জিনজিভাইটিস। জিনজিভাইটিস রোগ হওয়া মাত্রই একজন অভিজ্ঞ দন্ত বিশেষজ্ঞ দ্বারা স্কেলিং অ্যান্ড পলিশিং করিয়ে নিলে এ রোগ থেকে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করা যায়। প্রশ্ন করা যেতে পারে, স্কেলিং কাকে বলে? এর উত্তর হচ্ছে দাঁতের গোড়ায় যে পাথর জমে, তা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ফেলে দেয়াকেই স্কেলিং বলে। মনে রাখবেন দাঁতের মাড়িতে জমে থাকা পাথরগুলো ফেলে দিয়ে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এ রোগ সম্পুর্ণ ভালো হয়ে যায়। এমনকি মাড়ি থেকে রক্তপড়া, দাঁত শির শির করা এবং মুখের দুর্গন্ধ সবই ঠিক হয়ে যায়। আর যদি যথাসময়ে স্কেলিং অ্যান্ড পলিশিং করানো না হয় এবং এ অবস্হা দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে দাঁতের পেরিওডেন্টাল মেমব্রেন নষ্ট হয়ে দুর্বল হয়ে ভালো দাঁতটি ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করে। তখন মাড়িতে খুব ব্যথা হয়। ব্যথার কারণে রোগী ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে না। এ রোগের নাম পেরিওডন্টাইটিস। তবে এ অবস্হায়ও একজন অভিজ্ঞ দন্ত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে স্কেলিং অ্যান্ড পলিশিং করিয়ে নিলে এ রোগ ঠিক হয়ে যাবে। অন্যথায় এ অবস্হা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দাঁতটি আরো বেশি নড়বে। এক সময় দাঁতটি পড়ে যাবে। এছাড়াও সময়মত চিকিৎসা না করালে অন্যান্য জটিল সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেকে মনে করেন স্কেলিং করালে দাঁত দুর্বল হয়ে নড়ে যায়। আসলে এ ধারণাটি মোটেও ঠিক নয়; বরং স্কেলিং করালে দাঁতের গোড়ায় পাথর জমে গোড়া থেকে যে মাড়ি সরে যায়, তা পুনরায় দাঁতের গোড়ায় এসে দাঁতটিকে আটকে ধরে। ফলে নড়া দাঁত ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়।

**************************
লেখকঃ  অধ্যাপক ডা.কেএ জলিল
দন্তবিশেষজ্ঞ, চেম্বারঃ মর্ডান ডেন্টাল ক্লিনিক, ৩১ গ্রিন রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৫
উৎসঃ  দৈনিক আমারদেশ, ১০ ডিসেম্বর ২০০৭