বিদেশে চটজলদি বাইরে খেতে হলে ফাস্টফুড ছাড়া গত্যন্তর নেই। নিজের দেশে খাওয়া-দাওয়ার আরামের জুড়ি নেই। নিজ দেশের মাটি ও মানুষ কেবল নয়, খাওয়াও টানে, খুব।

তবে দেশে এখন ফাস্টফুডের বাজার রমরমা। আর সেখানে টিনএজার ও কম বয়সীদের ভিড় উপচে পড়ছে। এর প্রভাব যে স্বাস্থ্যের ওপর কত বেশি খারাপ, তা জেনেশুনেও পতঙ্গের পালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কম বয়সীরা এসব খাবারের দোকানে। তাই ক্রমে স্থূলতা ও নানা রোগ হবে তরুণ-তরুণীদের জীবন-সহচর, এমন ভবিষ্যতের ইশারা দেখছি।
এ নিয়ে নানা দেশে অনেক গবেষণাও হয়েছে।

২০০৫ সালে বিখ্যাত মেডিকেল জর্নাল ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকার ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের (এনএইচএলবিআই) অর্থায়নে পরিচালিত বড় একটি গবেষণার ফলাফল।
বারবার ফাস্টফুড খেলে টিনএজার ও তরুণদের দেহের ওজন অনেক বাড়ে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে।

১৫ বছর পর্যবেক্ষণের ফলাফল হলোঃ যাঁরা ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় প্রতি সপ্তাহে এক বেলার কম আহার করছেন, তাঁদের তুলনায় যাঁরা প্রতি সপ্তাহে দুই বেলা আহার করছেন, তাঁদের দেহে ওজন বাড়তি ১০ পাউন্ড বেড়েছে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেড়েছে দ্বিগুণ, আর এটি হলো টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বড় ঝুঁকি। ডায়াবেটিস হলো হৃদরোগের একটি বড় ঝুঁকি।
শিল্পোন্নত দেশগুলোতে মেদস্থূলতা ও ডায়াবেটিস যেমন বাড়ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ব্যতিক্রম ঘটছে না, তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

ফাস্টফুডের রমরমা বাজার ছিল ধনী দেশগুলোতে, এখন দরিদ্র দেশগুলোতেও এই বাজার বিস্তার লাভ করেছে। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মুখ্য গবেষক ডা· মার্ক পেরেরা পিএইচডি বলেন, ‘কোনো ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যসম্মত আহার করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। সম্প্রতি এসব রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যসম্মত মেনুø দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেই মেনুগুলোতে এখনো রয়েছে উচ্চমান চর্বি, চিনি ও ক্যালোরি; আঁশ ও পুষ্টি উপকরণ কম।’

ফাস্টফুড খেলে শরীরে ওজন বাড়ার একটি কারণ হলো, এসব রেস্তোরাঁর যেকোনো এক বেলার খাবারে এত ক্যালোরি থাকে, যা সারা দিনের ক্যালোরি পূরণের সমান।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দৈহিক পরীক্ষার সময় তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তারা ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় কতবার প্রাতরাশ, মধ্যাহ্নভোজন ও নৈশ আহার করেছিলেন।

গবেষকেরা দেখেছেন, কৃষ্ণকায় ও শ্বেতকায় উভয়ের মধ্যেই যাঁরা বারবার ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় আহার করেছেন, তাঁরা জীবনযাপন-চর্চায় পরিবর্তন আনলেও তাঁদের দেহের ওজন ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ওপর এসব আহারের বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন তিন হাজার ৩১ জন কৃষ্ণকায় ও শ্বেতকায় তরুণ, বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে (১৯৮৫-৮৬ সালে)। করোনারি আর্টারি রিস্ক ডেভেলপমেন্ট ইন ইয়াং অ্যাডাল্টস (সিএআরডিআইএ) স্টাডির অন্তভুêক্ত ছিলেন তাঁরা এবং তাঁদের খাওয়ার বিবেচনা, যাচাই-এসব করা হয়েছিল ১৫ বছর ধরে। সিএআরডিআইএ সেন্টারগুলো ছিল বার্মিংহাম, এএল, শিকাগো আইএল, মিনিয়াপলিস, ওকল্যান্ডে। গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি গেছেন ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় আহার করতে।
 
শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গরা ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় গেছেন বেশি। শ্বেতকায় মেয়েরা গেছেন সবচেয়ে কম (২০০০-২০০১ সালে) সপ্তাহে এক দশমিক তিনবার। সিএআরডিআইএ এর প্রকল্প কর্মকর্তা গিনা উই এম ডি বলেন, ‘এসব রেস্তোরাঁয় কী খাচ্ছেন সেদিকে লক্ষ করাও গুরুত্বপূর্ণ, এর পুষ্টি-উপকরণও জানা উচিত; ভোক্তারা এসব জেনে নিতে পারেন। যেমন-সালাদ ও গ্রিল করা খাবার ভাজা খাবারের চেয়ে কম চর্বিযুক্ত।’

খাওয়ার পরিমাণও কমাতে হবে। ড্রেসিং করা সালাদ ও ম্যায়োনেজ খেতে হবে খুব কম। ফাস্টফুড যত কম খাওয়া হবে স্বাস্থ্য তত ভালো থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ ‘Fast food habits, weight gain and insulin Resistance (The cardia study) 15 yr. prospective analysis??, Mark Pereira, Alex I kartushov, cara B F bbeling etal the lancet, January 1, 2005
 

**************************
লেখকঃ  অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা
উৎসঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর ২০০৭