শরীরের মধ্যে অতিরিক্ত মেদ-চর্বি জমাকেই স্থূলতা বলে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, একজন ব্যক্তির ওজন তার কাঙ্ক্ষিত বা আদর্শ ওজনের চেয়ে শতকরা ১০ ভাগ বেশি হলে তখন তাকে স্থূলতা বলে। শরীরের ওজন কাঙ্ক্ষিত বা আদর্শ ওজনের চেয়ে শতকরা ২০ ভাগ বেশি হলে তাকে অতিরিক্ত মেদবহুল বলে। স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন দুটো সমার্থক শব্দ।

যদিও দরিদ্র দেশগুলোতে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা, অপুষ্টিতে ভুগছে তবুও উন্নত বিশ্বসহ দরিদ্র দেশগুলোতে উচ্চবিত্তের মাঝে স্থূলতা একটি বড় সমস্যা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থূল মানুষের সংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে এ কথা বলা যায়­ উন্নত দেশগুলোতে শহুরে বসবাসকারী ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত। এটা একটি ভুল ধারণা যে, স্থূলতা শুধু উন্নত বিশ্বের মানুষের সমস্যা। উন্নয়নশীল বিশ্বেও এ সমস্যা কম-বেশি আছে।

স্থূলতার কারণঃ স্থূলতার কারণ জটিল ও বহুল। যেকোনো বয়সে স্থূলতা হতে পারে। তবে বয়স বাড়লেই স্থূলতার সমস্যা দেখা দেয়। ছোটবেলায় স্থূলতা দেখা দিতে পারে। ছোটবেলায় স্থূলতা দেখা দিলে বয়স্ক অবস্থায় তা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ উভয়ই এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। তবে যুক্তরাজ্যে নারীদের মধ্যে স্থূলতার হার বেশি। অনেকের স্থূলতা একটা বংশগত ব্যাপার। অনেক সময় হরমোনজনিত কারণেও স্থূলতা দেখা দেয়­ সুপ্রারেনাল; পিটুইটারি ও থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় স্থূলতা দেখা দেয়। শারীরিক পরিশ্রম কম করার ফলেও এ সমস্যা হতে পারে। আমরা যা খাবার খাই তা যদি পরিশ্রমের মাধ্যমে খাদ্যশক্তি (ক্যালরি) খরচা না হয় তবে তা শরীরের চর্বি ব্যাংকে জমা হয়। এই ব্যাংক শরীরে বিভিন্ন শাখা স্থাপন করে। বিশেষ করে বিরক্তিজনকভাবে আমাদের শরীরের মধ্যাংশে। অতিরিক্ত খাবারের জন্য বিশেষ করে মিষ্টিজাতীয় খাবারের জন্য স্থূলতা হতে পারে। ৭০-৯০ শতাংশ স্থূলতা হয় অতিরিক্ত ভোজনের জন্য, বাকি ১০ ভাগ অন্য কারণে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণত সমাজের উচ্চবিত্তের শ্রেণীর মাঝে স্থূলতার হার বেশি।

স্থূলতা কিভাবে বুঝবেনঃ সাধারণত চোখে দেখেই স্থূলতা আন্দাজ করা যায়। তবুও স্থূলতা নির্ণয়ের জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। সেগুলো হচ্ছে­-

(১) শরীরের ওজন ও শারীরিক উচ্চতা মেপে ব্যক্তির স্বাভাবিক ওজন, কম ওজন ও স্থূলতা নির্ণয় করা যায়। যখন শরীরের ওজন কাঙ্ক্ষিত বা আদর্শ ওজনের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি হয় তখন তাকে স্থূলতা বলে।

আদর্শ ওজন নির্ধারণ করতে আমেরিকার স্ট্যাডফোর্ড হার্ট ডিজিজ প্রিভেনশন প্রোগ্রাম এই সহজ ফর্মুলা ব্যবহার করেঃ
মহিলাঃ ইঞ্চিতে উচ্চতা ৩.৫ পাউন্ড বিয়োগ ১০৮
পুরুষঃ ইঞ্চিতে উচ্চতা ৪.০ পাউন্ড বিয়োগ ১২৮ (বৃহৎ কাঠামোর বয়স্ক যোগ ৮%; ক্ষুদ্র কাঠামোর বয়স্ক বিয়োগ ৪%)

(২) চামড়ার পুরুত্ব দিয়ে পরিমাপঃ ‘এক ইঞ্চি ভুঁড়ি চিমটি পরীক্ষা’ যদি আপনি আপনার সবচেয়ে নিচের পাঁজরের অস্থির নিচে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ভুঁড়ি চিমটি দিয়ে ধরতে পারেন তবে আপনি স্থূল।

(৩) ব্রুকা ইনডেস্ক (Broca-index)- উচ্চতা (সেন্টিমিটার) বিয়োগ ১০০। উদাহরণস্বরূপ­, যদি কোনো ব্যক্তির উচ্চতা ১৬০ সেন্টিমিটার হয়, তাহলে তার আদর্শ শারীরিক ওজন হবে (১৬০-১০০)= ৬০ কেজি।

(৪) কোমর ও নিতম্বের বেড়ের অনুপাতঃ কোমরের বেড় স্থূলতা নির্ধারণে একটি সুবিধাজনক ও সহজ পদ্ধতি। কোমরের বেড় সবচেয়ে নিচের পাঁজরের অস্থি ও কোমরের হাড়ের মাঝখান থেকে নিতে হবে। নিতম্বের ব্যাস মাপতে হবে। যদি কোমর ও নিতম্বের ব্যাসের অনুপাত পুরুষের বেলায় (>১) হয় এবং মহিলাদের বেলায় (>.৮৫) হয় তবে বুঝতে হবে পেটে প্রচুর চর্বি জমেছে।

স্থূলতার জটিলতাঃ মনে রাখতে হবে, স্থূলতা একটি স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর। একজন লোক যত বেশি মোটা হবে তার অতিরিক্ত মেদবহুল শরীরে অতিরিক্ত রক্ত পাম্প করার জন্য হূদযন্ত্রকে বাড়তি কাজ ও পরিশ্রম করতে হয়। দেহের সর্বত্র পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দিতে হূদযন্ত্রটিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। তা ছাড়া একজন মেদবহুল ব্যক্তির ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে। তার রক্তচর্বির মাত্রা বেশি থাকে। এই তিনটিই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং রক্তচর্বির উচ্চমাত্রা একসাথে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহু গুণে বৃদ্ধি করে। স্থূল লোকদের মাঝে কোনো কোনো ক্যান্সার (স্তন ও কোলন ক্যান্সার) হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। অতিরিক্ত দৈহিক ওজনের জন্য মেরুদণ্ডের ওপর বেশি চাপ পড়ার জন্য কোমর ব্যথা এবং পায়ের সন্ধিতে ক্ষয়জনিত বাত রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আমেরিকায় এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হঠাৎ মৃত্যুর হার স্থূল লোকদের মাঝে স্বাভাবিক ওজনের লোকদের চেয়ে ২০ ভাগ বেশি। তা ছাড়া স্থূল মেদবহুল লোকদের মধ্যে পিত্তের পাথর, বন্ধ্যত্ব, পায়ে ভেরিকোস, শিরারোগ, পেটের হারনিয়া রোগ বেশি দেখা যায়।

স্থূলতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণঃ যেহেতু স্থূলতা কিছু রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান এবং সুস্বাস্থ্য ও সুখের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী। সেজন্য স্থূলতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে­

(১) অতিরিক্ত ভোজনের অভ্যাস ত্যাগ করুনঃ খাবার যখন খুব মজাদার হয় তখন আপনার বেশি খাওয়ার লোভ হতে পারে। আপনি যত বেশি খাবেন, তত বেশি ক্যালরি আপনি গ্রহণ করছেন। মনে রাখতে হবে, যত বেশি ক্যালরি আপনি গ্রহণ করছেন, তা যদি দৈনন্দিন পরিশ্রমের মাধ্যমে খরচ না হয় তবে তা দেহে চর্বি আকারে জমা হয়।

(২) প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করুনঃ ওজন কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো­ কম ক্যালরি খাওয়া এবং প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করা বা ব্যায়াম করা। প্রতিদিন যে পরিমাণ ক্যালরি আপনি খান তার চেয়ে বেশি যদি পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যয় করতে পারেন, তবে আপনি নিশ্চিতভাবে শরীরের ওজন কমাতে সক্ষম হবেন।

ওজন কমানোর জন্য শুধু ব্যায়াম করলেই চলবে না। অনুরূপভাবে খাবার নিয়ন্ত্রণও এককভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে জন্য আপনি চমৎকার ফল পাবেন যদি এ দুটো অভ্যাস যার প্রথমটি ব্যায়াম এবং দ্বিতীয়টি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ একত্রে অনুশীলন করতে পারেন। প্রতিদিন যে পরিমাণ ক্যালরি আপনি খাদ্যের সাথে গ্রহণ করেন, তার চেয়ে (৫০০) ক্যালরি বা তার বেশি যদি ব্যয় করতে পারেন, তবে প্রতি মাসে এক থেকে দুই কেজি ওজন কমাতে সক্ষম হবেন।

(৩) আলস্য ও কর্মবিমুখ জীবন পরিহার করুনঃ বসে বসে টিভি দেখা, বসে বসে ইনডোর গেম, আড্ডা ইত্যাদি কায়িক পরিশ্রমহীন বিনোদন কমিয়ে কায়িক পরিশ্রমযুক্ত বিনোদন, খেলাধুলা করতে পারেন। এসবের মধ্যে থাকতে পারে বাগান করা, সাঁতার কাটা, বল খেলা, উদ্যানে ভ্রমণ এবং সাইকেল চালানো ইত্যাদি।

(৪) প্রতিদিনের খাদ্য থেকে চর্বির পরিমাণ কমিয়ে দিনঃ আপনার খাদ্য তালিকা থেকে চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিন। পূর্ণ শস্য দ্বারা প্রস্তুত খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে খান। গরু, খাসির গোশত, মগজ, কলিজা, মাখন, ঘি, ডিমের কুসুম ইত্যাদি পরিহার করুন।

(৫) বেশি করে আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করুনঃ সবার মধ্যে রয়েছে বিশেষ করে টাটকা ফলমূল, শাকসবজি ও চালনি দিয়ে চালা হয়নি এমন শস্য বা খাবার। আঁশযুক্ত খাদ্য ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে রক্ত-স্রোতে চর্বি ও রক্তচর্বি শোষণ রোধ করে।

(৬) মদ্যপান এবং অনুরূপ পানীয় ত্যাগ করুনঃ মদ্যপানের অন্যান্য ক্ষতির পাশাপাশি মানবদেহকে মোটা ও মেদসর্বস্ব করে তোলে কারণ তার মধ্যে প্রচুর ক্যালরি রয়েছে।

(৭) প্রতিদিন যথেষ্ট পানি পান করুনঃ দৈনিক ৬ থেকে ৮ গ্লাস। ঔষধি চা বা বিশুদ্ধ পানি পান করুন। পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, ওজন কমাতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরাপদ উপায় হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন সাধন করা। আপনি যদি খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও জীবনযাপনের ধারায় কিছু পরিবর্তন সাধন করতে পারেন তবে আপনি সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন। যদিও যত দ্রুত ওজন হ্রাস আপনি আশা করবেন তত দ্রুত হবে না। তবুও পরিবর্তিত ও সুনিয়ন্ত্রিত নতুন জীবনযাত্রা যা আপনি শুরু করেছেন তা বছরের পর বছর কোনো ঝুঁকি ছাড়াই চালিয়ে যেতে পারবেন। সপ্তাহে আধা কিলো থেকে এক কিলোগ্রাম ওজন হ্রাস করা একটি নিরাপদ ও সঙ্গত লক্ষ্য। যে নতুন অভ্যাস আপনি শুরু করেছেন তা আপনাকে অতিরিক্ত ওজন থেকে আজীবন রক্ষা করবে। ওজন হ্রাস আপনার জীবনকে রক্ষা করবে।



লেখকঃ  ডা. নুশরাত ফারজানা
চেম্বারঃ কমপ্যাথ লিমিটেড, ১৩৬ এলিফ্যান্ট রোড, (বাটা সিগন্যাল ও হাতিরপুল বাজারের সংযোগ রাস্তার মাঝামাঝি), ঢাকা।
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১১ নভেম্বর ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত।