শুরু হয়েছে সংযম আর আত্মত্যাগের মাস রমজান। প্রশ্ন ওঠে, অসুস্থ যারা বা নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় যাদের, তারা কী করবে? এ নিয়ে তাই অনেক গবেষণাও হয়েছে।

রোজাদারদের খাওয়া হয় মূলত দুবার, ইফতারি ও সেহরিতে (অন্যান্য সময়ে তিন থেকে পাঁচবার খাওয়ার পরিবর্তে)। ভাজা-পোড়া বেশি খাওয়া হয়। ঘুমের সময়ে পরিবর্তন আসে। ভরপেট ইফতারি খেয়ে তারাবির নামাজে দীর্ঘ সময় দিতে হয়। ওষুধ খাওয়ার সময় পাওয়া যায় মাত্র দুবার। মধ্যবর্তী রোজার লম্বা সময়ে সব ওষুধ গ্রহণ বন্ধ থাকে।

হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের রোগীদের এ সময় কীভাবে ওষুধ গ্রহণ করা উচিত? প্রশ্নের উত্তরটা আমরা খুঁজব ভাগে ভাগে।

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার রোজার সময় খানিকটা কমে। যদি কম্বিনেশন ওষুধ দেওয়া হয় বা যেসব ওষুধের কার্যকারিতা অনেক লম্বা সময় ধরে (লং অ্যাকটিং মেডিসিন) তেমন ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তাহলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীও নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারে। তবে এ সময় ওষুধগুলো ভাগ করে সেহ্‌রি ও ইফতারের সময় খাওয়া হলে ভালো হয়।
যাদের হার্ট অ্যাটাকের পর বর্তমান অবস্থা স্থিতিশীল এবং খুব বেশি সিম্পটম বা উপসর্গ দেখা যায়না, তারা তাদের চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে ওষুধগুলো সেহ্‌রি ও ইফতারের সময় ভাগাভাগি করে খেলে রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে যাদের এনজাইনা আনকন্ট্রোল্‌ড, তাদের কিন্তু সিম্পটম পুরোপুরি কন্ট্রোল না হওয়া পর্যন্ত রোজা রাখা উচিত নয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লং অ্যাকটিং ওষুধ ব্যবহার করে বেশির ভাগ ক্রনিক এনজাইনার রোগীই রোজা রাখতে সক্ষম হবে। তবে যেকোনো অ্যাকিউট রোগী, অর্থাৎ যাদের অতি সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তারাও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখতে গেলে বিপদে পড়বে।

যাদের হার্ট ফেইলিউর আছে এবং হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা কম, তারা কী করবে? বিভিন্ন গবেষণা চলছে, যদি হার্ট ফেইলিউর ভালো করে কন্ট্রোল থাকে বা রোগীর বিশেষ কোনো সিম্পটম না থাকে, তবে ওষুধগুলো দুই বেলার জন্য অ্যাডজাস্ট করে দিয়ে রোগীকে রোজা রাখতে দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরামর্শ হলো, যখনই আপনার মনে হবে রোজা রাখা অবস্থায় আপনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে, তাৎক্ষণিকভাবে রোজা ভেঙে প্রয়োজনীয় ওষুধটি খেয়ে নিন। ইসলামধর্মে অসুস্থদের ওপর রোজা চাপিয়ে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। অনেক সময় রোজা রাখতে গিয়ে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে আপনাকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।

প্রায়ই দেখা যায়, হৃদরোগীরা একই সঙ্গে ডায়াবেটিসের রোগী। যারা ডায়াবেটিসের রোগী, তাদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ ভালো, রোজা রাখা অবস্থায় তাদের বিশেষ অসুবিধা হয় না। কিন্তু যাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই খারাপ, রোজার সময় তাদের হাইপো বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া দুটোই বেশি হয়ে যায়।

ডায়াবেটিসের রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের মাত্রা ও সময় দুটোই সমন্বয় করে নেওয়া উচিত। একটা বিষয়ে সবার খেয়াল করা উচিত যে রোজার সময় আমাদের দৈনিক খাওয়াদাওয়া শুরু হয় ইফতার থেকে। কাজেই ডায়াবেটিসের রোগীদের ওষুধের মূল সেবনবিধি তাই সকালের (সেহ্‌রির) পরিবর্তে ইফতারি থেকেই শুরু করা উচিত। এটা করলে রোজা রাখা অবস্থায় বিকেলে আসরের সময়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা বিভিন্ন ডায়াবেটিক কমপ্লিকেশনের রোগীদের কিন্তু রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ না করে এবং তাদের চিকিৎসকদের পরামর্শ না নিয়ে রোজা রাখা একেবারেই ঠিক নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ইসলামি চিন্তাবিদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডায়াবেটিসের রোগীদের আঙুল থেকে রক্ত নিয়ে সুগার পরীক্ষায় রোজা ভঙ্গ হয় না।
কাজেই গ্লুকোমিয়ার দিয়ে রোজার সময় রক্তের সুগার পরীক্ষা করতে ভুলবেন না। যখন কোনো ডায়াবেটিক বা হৃদরোগী ইনজেকশনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছে, তখন সেটি নির্দিষ্ট সময়ান্তরেই খেতে হবে। চার বেলার খাবার ওষুধ দুই বেলায় বেশি করে খেয়ে নিলে উপকার না হয়ে অপকারই হবে। বড়জোর আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকটি পরিবর্তন করে লং অ্যাকটিং ওষুধ নেওয়া যায় কি না, সে চেষ্টা করতে পারেন।

যাদের কোলেস্টেরল বেশি, রোজার সময় ভাজা-পোড়া এগুলো থেকে তাদের সতর্ক থাকা উচিত। এমনিতে গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাদার যদি বিবেচক আহারী হয়, তবে তার ওজন কমবে এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল বাড়বে। কাজেই রোজার এই অন্যতম ভালো গুণটি কাচ্চি বিরিয়ানি বা চকচকে বেগুনভাজার জম্পেশ চর্বির রাজত্বে না ডুবিয়ে অনেক বেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস করলেই ভালো হয়।
রোজার সময় দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকার কারণে দেহে চাপ পড়ে বটে, কিন্তু রোজা রাখার প্রশান্তি সেটিকে ঘুচিয়ে দেয়। তাই বেশির ভাগ স্থিতিশীল হৃদরোগী, ডায়াবেটিসের রোগী বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিঃসন্দেহে রোজা রাখতে পারবে নিরাপদে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর যেকোনো অস্থিতিশীল শারীরিক অবস্থায় রোজা ভেঙে চিকিৎসা করানোটাই উত্তম বিবেচনার কাজ। 
 
 
**************************
আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
প্রথম আলো, ২৬ আগস্ট ২০০৯