ইফতার বা সেহ্‌রিতে ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া সবচেয়ে ভালো। দোকানের ভাজিজাতীয় খাবার বদহজম, পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। রোজা রাখার পর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাবার খেতে হবে। শর্করা, আমিষ ও চর্বিজাতীয় খাবারের পরিমিত সংমিশ্রণে সেহ্‌রি, ইফতার ও রাতের খাবার খেতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের ইফতার থেকে সেহ্‌রি পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করা উচিত।

ইফতারঃ খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা যেতে পারে। ঠান্ডা পানি বা লেবুর শরবত পান করা ভালো। শরবত তৈরির গুঁড়াজাতীয় জিনিস বা তরল ও রঙিন বোতলের উপাদান দিয়ে শরবত বানিয়ে পান না করাই ভালো। ভেজা চিঁড়া ও সামান্য চিনি মিশিয়ে পানি দিয়ে শরবতও খাওয়া যেতে পারে। বেল বা দই দিয়ে তৈরি শরবতও শরীরের জন্য উপকারী। শরবতে বেশি চিনি দেবেন না। ডাবের পানি পান করতে পারলে ভালো। যেকোনো ফল ইফতারে খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী। মাঝেমধ্যে ফলের রস পান করতে পারেন, তবে বাজারে পাওয়া রস কম পান করা উচিত। ইফতারে কাঁচা ছোলা অনেকেরই পছন্দ। ছোলাগুলো চার-পাঁচ ঘণ্টা ভিজিয়ে খোসাসহ বা খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া যেতে পারে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে তারা খোসাসহ খেলে উপকার পাবেন, সঙ্গে ইসবগুলের ভুসির শরবত খাবেন। আলুর সঙ্গে ছোলাভুনা মুড়ি দিয়ে অনেকেই খেয়ে থাকেন। হজমের অসুবিধা হলে মটর বা ডাবলি ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাবেন। বেসন দিয়ে পুঁই বা পালংশাকের পাতা সামান্য তেলে ভেজে খেতে পারেন। শসায় পানির পরিমাণ বেশি বলে খেতে ভালো লাগে। এ ছাড়া ইফতারে নুডলস, সবজি দিয়ে রান্না নরম খিচুড়ি, চিঁড়া-গুড়, নারকেলের কুচি ইত্যাদির কোনো কোনোটি একেক দিন থাকতে পারে। বাসায় তৈরি হালিমও ইফতারে খেতে পারেন। ইফতারে এক দফায় খুব বেশি খাবার না খাওয়াই ভালো। যাঁরা রাতের খাবার এড়াতে চান, তাঁরা ইফতারের কিছু আইটেম রাতে খেতে পারেন। যাঁরা ডায়াবেটিসের রোগী, তাঁরা ইফতারে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাবেন না, শরবতের বদলে পাতলা দুধ বা পরিমিত ডাবের পানি ভালো; এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া ভালো। যাঁদের পেপটিক আলসার, তাঁরা একেবারে পেট ভরে খাবেন না, পরিমাণে একটু কম খাবেন।

রাতের খাবারঃ ইফতারে পরিমিত খাবার খেয়ে রাতে কিছুটা খাবার খাওয়া সবচেয়ে ভালো। ইফতারে পেট ভরে খেয়ে সেহ্‌রিতে খাওয়ার চেয়ে রাতে সামান্য হলেও কিছু খেলে বিপাকক্রিয়া যথাযথ হয়। আটার রুটি, এক টুকরো মাছ ও সামান্য সবজি একটা ভালো মেনু। খেতে পারেন কিছুটা ভাত, ডিম রান্না ও সালাদ। রাতের খাবারে মাংস বা মাংসের আইটেম না খাওয়াই ভালো। রুটি বা ভাতের বিকল্প হিসেবে চিঁড়া, দুধ, কলা খাওয়া যেতে পারে। যেকোনো ফল, ঘরে তৈরি এক টুকরা কেকও খেতে পারেন।

সেহ্‌রিঃ সেহরিতে ভাত বা রুটি, সঙ্গে মাছ বা মাংস এবং কিছুটা সবজি খাওয়া ভালো। রান্না করা ডিম প্রোটিনের ভালো উৎস। ডালেও প্রচুর প্রোটিন আছে। ঘন করে ডাল রান্নার সঙ্গে রুটি ও এক কাপ দুধও স্বাস্থ্যসম্মত, সঙ্গে শুধু কিছুটা সালাদ অর্থাৎ শসা, টমেটো, গাজর থাকলে ভালো। গুরুপাক খাবার হজমে ব্যাঘাত ঘটায়, সেহ্‌রিতে সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত। আর পানি বেশি করে পান করতে হবে, দেহের কোষগুলোর সঠিক কার্যাবলির জন্য।

মনে রাখা দরকারঃ শারীরিক কোনো অসুস্থতা, ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসার থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজার সময় খাবার খাবেন। এ সময় কায়িক পরিশ্রম একটু কমতে পারে কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করবেন না। সারা দিন শুয়ে-বসে কাটালে ওজন বাড়তে পারে। ইফতারের পর হাঁটতে পারেন, হালকা ব্যায়াম করলে অসুবিধা নেই। রোজার মাসে কারও কারও মুখে দুর্গন্ধ হয়। এটি কোনো জটিল সমস্যা নয়। সেহ্‌রি খেয়ে দাঁত ভালোভাবে মেজে যেকোনো মাউথওয়াশ দিয়ে গড়গড়া করলে দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাবেন। রাতের খাবারের পর একটা লবঙ্গ চিবোতে পারেন; আর সেহ্‌রি খাওয়ার পর উষ্ণ পানিতে একটু লবণ দিয়ে কুলকুচি করা ভালো। 
 
  
**************************
রেজাউল ফরিদ খান
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
প্রথম আলো, ২৬ আগস্ট ২০০৯