ফ্লু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দিয়ে হয়। এ নিয়ে কিছুদিন আগেও আমরা তেমন ভাবতাম না। কারণ সারাবছরই বিস্তৃত এ ফ্লু মানুষের সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতো না। এ বছর মেক্সিকোতে যখন প্রথম জানা গেল সোয়াইন বা শূকরের ফ্লু মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে এবং মানুষ থেকে মানুষে দ্রুত এ ফ্লুর ভাইরাস ছড়াচ্ছে- তখন চিন্তিত না হয়ে উপায় থাকে না। তবে খুব সহজেই এ ফ্লুকে আমরা প্রতিহত করতে পারি

ফ্লু মানেই কি সোয়াইন ফ্লু
এখন ঋতু পরিবর্তনের সময়। তাই সিজনাল ফ্লু হতে পারে। এছাড়া ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ এখনও কমেনি। এর সঙ্গে সোয়াইন ফ্লুরও লক্ষণ প্রায় কাছাকাছি। তাই চিকিৎসক দেখিয়েই ডায়াগনোসিস কনফার্ম করতে হয়।

কাদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি
শিশু, বৃদ্ধ এবং যাদের ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, লিভার বা কিডনির অসুখ আছে এবং যাদের দীর্ঘদিন ধরে কোনও অসুখ আছে বা ওষুধ খাচ্ছে, তাদেরই আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি। সাধারণত কর্মজীবীরা বেশি আক্রান্ত হন তবে ক্যাজুয়ালিটি হতে পারে শিশু ও বৃদ্ধদের।

কীভাবে সেলফ প্রটেকশন করা যায়
সোয়াইন ফ্লু বা যে কোনও ফ্লু থেকে বাঁচতে জনসাধারণের স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরি। সবাই মিলেই এ অসুখ প্রতিহত করা যায়। এ জন্য কিছু সহজ অভ্যাসের প্র্যাকটিস প্রতিনিয়ত আমাদের করতে হবে।

- যেখানে-সেখানে হাঁচি-কাশি না দেয়া ও থুথু না ফেলার অভ্যাস করতে হবে। এ জন্য টিস্যু পেপার, রুমাল বা গামছা ব্যবহার করবেন।

- সাবান দিয়ে ২৫-৩০ সেকেন্ড ধরে ঘন ঘন হাত ধোয়ার প্র্যাকটিস করতে হবে। শুধু খাওয়ার আগে, পরে এবং টয়লেট থেকে আসার পর নয়, হাত ধোয়ার অভ্যাসকে জীবনসঙ্গী করে নিতে হবে। বিশেষ করে যারা রোগীর সেবা করেন, মেডিকেল ইকুয়েপমেন্টস নড়াচড়া করেন কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করেন তাদের জন্য হাত ধোয়া একান্ত অপরিহার্য।

মাস্ক পরা কি জরুরি

সবার মাস্ক পরা অপরিহার্য নয়। তারাই পরবেন
- যাদের হাঁচি-কাশি ও জ্বর আছে, যাতে অন্যরা সংক্রমিত না হয়।

- যে কোনও পাবলিক প্লেস যেমন হাট-বাজার, বাসস্টপেজ, স্কুল- এমন জায়গায় যাওয়ার সময়। কারণ এখানে অনেক মানুষের সমাগম হয় এবং অসুস্থদের ড্রপলেট বা বাতাসের মাধ্যমে সুস্থরাও আক্রান্ত হতে পারে।

- যারা ফ্লু আক্রান্ত রোগীর কন্টাক্টে কোনও না কোনওভাবে এসেছে, তারা সাসপেকটেড কেস হিসেবে ক্যাপসুল ওসিলটামিভির (৭৫ মিঃগ্রাঃ) দিনে একটা করে অন্তত ১০ দিন খেতে পারেন। একে কেমো প্রোফাইলঅ্যাক্সিস বলে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

ফ্লু’র যে সাধারণ লক্ষণগুলো আমরা জানি তার জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই।

এ রোগীরা বাসায় সম্ভব হলে আলাদা কক্ষে বিশ্রামে থাকবে। এ সময় তাদের প্রচুর তরল পান করতে হবে ও প্যারাসিটামল খাওয়ারও প্রয়োজন হয় এবং অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। একে হোম কনফাইনমেন্ট বলে। স্বল্পসংখ্যক লোক মাস্ক পরে এ রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করবে। শুধু শ্বাসকষ্ট এবং বেশি অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি যে কোনও হাসপাতালে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের যে কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এর চিকিৎসা সুবিধা এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। বেশিরভাগ রোগীই এন্টিভাইরাল ড্রাগ ছাড়া ভালো হয়ে যায়।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

সাধারণত রোগের ইতিহাস এবং রোগীকে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই ক্লিনিক্যালি ডায়াগনোসিস করেন। এখন জ্বরের সঙ্গে হাঁচি-কাশি এবং শ্বাসকষ্ট থাকুক না থাকুক তাই দেখে সোয়াইন ফ্লু সন্দেহে চিকিৎসা শুরু করা যায়। এছাড়া ঢাকার মহাখালীর আইইডিসিআরে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি নির্ণয়ের জন্য নাক ও গলা থেকে সোয়াব বা রস নিয়ে কনফার্ম ডায়াগনোসিস করা যায়। স্কিনিংয়ের জন্য রক্তের রিয়েল টাইম পিসিআর করা যায়, যা ৬-৮ ঘণ্টায় রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব।

চিকিৎসা

এন্টিভাইরাল এজেন্ট ওসিলটামিভির চিকিৎসার জন্য দিন দুইবার পাঁচদিন খেতে হয় এবং প্রতিরোধের জন্য দিনে একটি করে অন্তত ১০ দিন খেতে হয়। সম্প্রতি ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে চাহিদা মেটানোর পর এ ভ্যাক্সিন এদেশে আসার সম্ভাবনা আছে। ভ্যাক্সিন এখনও সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না। চীন স্বল্পমূল্যে (২১ ডলার) ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেছে, যা এক ডোজেই প্রতিরোধ সম্ভব।
ওষুধ কি নিরাপদ

মুখে খাওয়ার ওষুধ কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে লিভার ও কিডনির জন্য এটি ক্ষতিকারক হতে পারে এবং বিষণ্নতা সৃষ্টি করতে পারে। জাপানে এ ওষুধ খাওয়ার পর সুইসালডাল টেনডেন্সি বেড়ে গিয়েছিল।

একবার অসুস্থ হলে কি আবার সম্ভাবনা থাকে

সাধারণত থাকে না। কারণ রোগের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়। তবে দীর্ঘ সময় পরে যেমন বছরখানেক পরে আবার আক্রান্ত হতে পারে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জরুরি

যেখানে রোগী থাকবে সে ঘর ফিনাইল বা স্যাভলন দিয়ে পরিষ্কার রাখা বাঞ্ছনীয়।
সঠিক সচেতনতাই পারে আমাদের সোয়াইন ফ্লু থেকে মুক্ত রাখতে।

*************************
ডাঃ আব্দুস শাকুর খান
রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
দৈনিক যুগান্তর, ০৫ সেপ্টেম্বের ২০০৯।