ক্যান্সার প্রতিরোধে এবং প্রতিকারকল্পে বিশ্বেও উন্নত দেশগুলোতে অবিরাম গবেষণা চলছে। উদ্ভাবিত হয়েছে বেশ কিছু কার্যকরী ওষুধ ও পদ্ধতি, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রমাণিত। শিশুর মৃত্যুহার, অসচেতনতা, পরিবেশ দূষণ, সময়পোযোগী চিকিৎসায় অবহেলা নানাবিধ কারণে অধিক জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে ২২% ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত, যা কিনা এককভাবে সর্বোচ্চ। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তদের মৃত্যুহার অনেক বেশি। একটা সময় ছিল যখন ফুসফুসে ক্যান্সার মানেই ছিল অবধারিত মৃত্যু। যাদের সামর্থ্য হত তারা চেষ্টা করতেন বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বেও স্বাভাবিক প্রবণতা অনুসরণ করে বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে গত এক দশকে এগিয়েছে অনেক দূর। যে ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিদেশে করতে হতো বা এখনো করা হয় তার অনেক কিছুই এখন দেশেই সম্ভব। যেখানে ব্যবহ্নত হচ্ছে সেই একই ওষুধ এবং পদ্ধতি, যা অনুসরণ করা হয় উন্নত বিশ্বে। ক্যান্সার চিকিৎসার এই অগ্রগতি আশার আলো দেখিয়েছে সমাজের সবশ্রেণীর মানুষকে। রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা সার্জারি যাই হোক না কেন বাংলাদেশেই তা সম্ভব।

ফুসফুস ক্যান্সারের শুরু হয় Precancerous cell থেকে যা, ফুসফুসেই রয়েছে। এটা পরিপূর্ণ ক্যান্সার হতে কয়েক বছর লাগতে পারে। ফুসফুস ক্যান্সারগুলোর মধ্যে Non-small cell lung cancer সবচেয়ে বেশি হয় যা প্রায় ৮৫%। NSCLC এর বিভিন্ন ধরনের মধ্যে adeno carcinoma আক্রান্তদের হার বেশি, প্রায় ৪০%। এছাড়াও squamous cell cacinoma (২৫-৩০%) Large cell carcinoma (১০-১৫%)। ক্যান্সার কোষের অবস্থা ও অন্যান্য অঙ্গের উপর ছড়ানোর উপর ভিত্তি করে পাঁচটি ভিন্ন ধাপে বিভক্ত করা যায়। পরিবেশগত দূষণ পদার্থ, রেডন, এসবেসটর, আর্সেনিক অথবা পারিবারিক ক্যান্সারের ইতিহাস ও NSCLC এর কারণ হতে পারে। তামাক ব্যবহারের বিরুদ্ধে শত যুক্তি সত্বেও এর ব্যবহারকারীরা এই ঘাতক দ্রব্য থেকে বিরত হোন না। তবে যেদিক তামাক জনিত জটিল রোগাক্রান্ত হন সেদিন অনুশোচনায় ভুগলেও অর্থ ও স্বাস্থ্য দুই-ই হারাতে হয়। প্রায় ৮০% ূওউীউ-এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ধূমপান, হোক তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ। একজন অধূমপায়ীর চেয়ে ধূমপায়ীর ফুসফুস ক্যান্সার হওয়ার আশংকা ২১ গুণ বেশি। ধূমপান ছেড়ে দিলেও ৪ গুণ বেশি ঝুঁকি রয়েছে।

সচেতনতা রোগ প্রতিরোধের পূর্ব শর্ত। NSCLC -এর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, বুকে ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, থুতু বা কাশির সাথে রক্ত, ছোট ছোট শ্বাস (শ্বাস নিতে সমস্যা); শ্বাস-প্রশ্বাস বাঁশির মত শব্দ হওয়া, বুক, কাঁধ বা বাহুতে ব্যথা, মাথা ব্যথা ঘন ঘন নিউমোনিয়া বা ব্রংকাইটিস আক্রান্ত হওয়ার মত লক্ষণগুলো প্রধান্য বেশি থাকে। তাই এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সেই সাথে প্রদেয় শারীরিক পরীক্ষাসমূহ যেমন MRI, Bronchoscopy ইত্যাদি সময়মত সম্পন্ন করলে রোগ নিরুপন সহজ হয়ে যায়। মনে রাখা উচিত ক্যান্সারের শুরু একদিনে হতে পারে, কিন্তু এটির মারাত্মক রূপ ধারণ করতে বেশ কিছু সময় লাগে। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ নিরুপণ, সঠিক ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি NSCLC রোগীকে তার স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে। পরিবারের কেউ ক্যান্সার আক্রান্ত হলে প্রথমেই চিন্তা করতে হবে চিকিৎসা নিয়ে। এক্ষেত্রে আবেগ দমন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পরিবারের বা কাছের বন্ধু কাউকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বয়স্করা যখন ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হোন তখন কাঁধে থাকে পরিবারের গুরু দায়িত্ব। তাই স্বাভাবিকভাবেই পুরো পরিবার বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

সমসাময়িক উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্যান্সার রোগীদের বিদেশ নির্ভরশীলতা অদূর ভবিষ্যতে আরও কমিয়ে আনবে। এদেশের মেধাবী দক্ষ এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দ ফুসফুস ক্যান্সার নিরুপনে ও ফুসফুসের প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে সফলতা দেখিয়েছেন। যা এদেশের মানুষের বড় প্রাপ্তি। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে NSCLC চিকিৎসায় chemotherapy এর ক্ষেত্রে একদিকে যেমন Taxotere এর মতো কার্যকরী ওষুধ ব্যবহ্নত হচ্ছে, তেমনি এখন সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়মিত Radiotherapy দেয়া হচ্ছে।

**************************
অধ্যাপক ডাঃ ইকবাল হাসান মাহমুদ
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও ক্যান্সার গবেষকইকবাল চেস্ট সেন্টার, ৮৫ মগবাজার ওয়্যারলেস গেট, ঢাকা
ফোনঃ ৯৩৪১১৫৬,
দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯।