পৃথিবী পোলিওমুক্ত করার প্রয়াস শুরু হয়েছিল দুই দশকেরও আগে থেকে। ১৯৮৮ সালে পোলিও ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হওয়ার পর এতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ঝঃড়ঢ় চড়ষরড় ঋড়ৎবাবৎ-এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বিশ্ব পোলিও দিবস পালিত হচ্ছে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে পোলিওর অভিশাপ মানুষ শতাব্দীকাল পর্যন্ত বহন করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিও মহামারীতে ৬ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল এবং ২৭ হাজার লোক পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাম্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে ২০০৭ সালে ২০০৬ থেকে ৫৮ শতাংশ কমে গেছে। সারাবিশ্বে ২০০৭ সালে মাত্র ৬১৩ জন পোলিও আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০০৮ সালে এ সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬০ জনে।
২০০৮ সালের তথ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাপী পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা নিম্নরূপঃ
দেশ ২০০৮ ২০০৭ ২০০৬
নাইজেরিয়া ৬৯২ জন - -
ভারত ৪৪৯ জন ২৮১ ৬৭৬
পাকিস্তান ৬৭ জন - -
সেন্ট্রাল আফ্রিকা ২৫ জন - -
আফগানিস্তান ২০ জন - -
নেপাল ২ - -
বাংলাদেশ ০ ০ ১৮
উপরের চিত্র অনুযায়ী ভারতে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ২০০৬-এর তুলনায় ২০০৭ সালে কমলেও ২০০৮ সালে আবার বেড়েছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহার অঙ্গরাজ্য, আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়ার উত্তর প্রদেশেই এ আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হিসাবে দুর্গম পাহাড়ি জনপদ, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং নোংরা ময়লা পুঁতিগন্ধময় পরিবেশে বসবাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব দেশ থেকে পোলিও ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
পোলিও বা পোলিওমাইলাইটিস বা ইনফেনটাইল পোলিও একটি অতি প্রাচীন ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এ সংক্রামক রোগটি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়ে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। পোলিও ভাইরাস একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত এ রোগের জীবাণু (ভাইরাস) মানুষের মলের সাহায্যে ছড়িয়ে থাকে। মল থেকে ভাইরাস হাত ও মাছি দ্বারা বাহিত হয়ে খাদ্য বা দূষিত পানির মাধ্যমে পেটে ঢুকে, পরবর্তীতে রক্তের সঙ্গে মিশে স্নায়ুতন্ত্রের কোষকে ধ্বংস করে দেয়।
যে কোনও বয়সের মানুষই পোলিও ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তবে সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয় এবং দুই বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
পোলিও ভাইরাস তিন প্রকারঃ টাইপ ১, ২ ও ৩। সৌভাগ্যবশত টাইপ ২ পৃথিবী থেকে দূরীভূত হয়েছে; কিন্তু টাইপ ১ ও ৩ এখনও মানবজাতির জন্য বড় হুমকির কারণ।
লক্ষণ
ষ ৯৯ শতাংশ পোলিও আক্রান্ত রোগীর দেহে রোগের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এদের দেহে পোলিও ভাইরাস ঢুকে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এ রোগীরা নিজের জন্য সমস্যা না হলেও সমাজে পোলিও ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে পারিপার্শ্বিক অন্য মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
ষ বাকি ১ শতাংশ পোলিও আক্রান্ত রোগীর শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং একে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
এবরটিভ পোলিও
৯৩ থেকে ৯৯ শতাংশ পোলিও রোগী এ জাতীয়। এর লক্ষণ সাধারণ ফ্লু জ্বরের মতো। জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঘাড় হালকা শক্ত হতে পারে।
নন-প্যারালাইটিক পোলিও
১ থেকে ৫ শতাংশ পোলিও রোগ নন-প্যারালাইটিক টাইপের হয়। এক্ষেত্রে রোগী আলো সহ্য করতে পারে না, ঘাড় প্রচণ্ডভাবে শক্ত হয়ে থাকে এবং ঘাড় নাড়াতে গেলে রোগী বেশ ব্যথা অনুভব করে। কিন্তু কোনও অবশভাব থাকে না।
প্যারালাইটিক পোলিও
০·১ থেকে ২ শতাংশ রোগীর প্যারালাইটিক পোলিও হয়। এ পোলিওতে রোগীর এক বা একাধিক হাত বা পা অবশ (পক্ষাঘাত) হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি পা অবশ হয়। প্যারালাইটিক পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর স্নায়ুতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে অবশ হয়ে যায় এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এটা রোগীর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। পোলিও রোগীর অবশতা সম্পূর্ণ স্থায়ী এবং এটা সারা জীবন থেকে যায়। যদি পোলিও ভাইরাস মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে তবে রোগীর ঢোক গিলতে বা খেতে অসুবিধা হয়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং মুখের এক পাশ অবশ হয়ে যেতে পারে।
পোলিও ভাইরাস অণুজীবের বিরুদ্ধে কোনও এন্টিভাইরাস ওষুধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি এবং এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কোন অঙ্গ অবশ হয়ে গেলে সে অঙ্গ আর কখনোই কার্যক্ষম হয় না।
পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনও ওষুধ না থাকলেও এটা প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত কার্যক্ষম দুই ধরনের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। ওচঠ টিকা মাংসে দেয়া হয় এবং এটা বিজ্ঞানী সক আবিষ্কার করেছেন। মুখে খাওয়ার আরেক ধরনের টিকা আবিষ্কার করেছেন সেবিন। এ দুই টিকাই সমানভাবে কার্যকর।
পৃথিবীকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করার অভিপ্রায়ে ষেড়নধষ ঢ়ড়ষরড় বৎধফরপধঃরড়হ ঢ়ৎড়মৎধসসব-এর আওতায় বাংলাদেশেও ন্যাশনাল ইমমিউনাইজেশন ডে (ঘওউ) প্রোগ্রাম চালু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। প্রতি বছর দু’বার দুই ডোজ পোলিও খাওয়ানোর জন্য বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচের প্রায় তিন কোটি শিশুকে এদিন দুই ফোঁটা পোলিও ভ্যাকসিন খাওয়ানো হয়। ফলে বাংলাদেশে পোলিও কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ ঘোষণা করার যখন সময় এসেছিল তখনই অর্থাৎ ২০০৬ সালে ১৮ জন পোলিও আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। সৌভাগ্যবশত ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বরের পরে এদেশে আর কোনও পোলিও রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু এতে আত্মতৃপ্তিতে না ভুগে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ১ লাখ ৪৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের তিনদিক থেকে ঘিরে রেখেছে ভারত। সেখানে এখনও পোলিওমুক্ত করা সম্ভব হয়নি, যে কোন সময় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এ ভাইরাস বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে যেতে পারে। তবে সুখের বিষয় এই যে, ডঐঙ-এর ডাইরেক্টর জেনারেল মার্গারেট চান ঘোষণা দিয়েছেন, অচিরেই ভারতকে পোলিওমুক্ত করে পৃথিবীর ইতিহাসের মাইলস্টোন অর্জন করবে।
এ সুন্দর পৃথিবী থেকে পোলিওর অভিশাপ দূর করার জন্য এ রোগের প্রত্যেকটি কোণা চিহ্নিত করতে হবে এবং পোলিও ভ্যাকসিন পৌঁছাতে হবে সেই সব জায়গায় যেখানে পোলিও ভাইরাস আজও তার কুৎসিত মাথা উঁচু করে আক্রান্ত করে চলছে একের পর এক সুন্দর শিশুকে।


**************************
ডা· মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা শিশু হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো ইন্টারোলজি, নিউট্রিশন ও হেপাটোলজি বিভাগ 
দৈনিক যুগান্তর, ২৪ অক্টোবর ২০০৯।