লোপার বয়স ২৭ বছর। প্রতিদিনের মতো গতকালও সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে আয়নার সামনে ব্রাশ করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন তার ঠোঁট দু’টো কেমন যেন বেঁকে গেছে। আগের রাতেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, কোথাও কোন আঘাত পেয়েছে বলেও মনে পড়ছে না। অনুভব করল বামপাশটা কিছুটা অবশ তবে কোন ব্যথা নেই। লোপা ভাবল হয়তো তন্দ্রাভাব থাকায় এমনটি মনে হচ্ছে অথবা আয়নায় সমস্যা। এদিক-ওদিক দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না এটা তার শারীরিক সমস্যাই।

আসলেই তাই, এটা এক ধরনের স্নায়ুবিক সমস্যা বা স্নায়ুরোগ যা ফেসিয়াল পলসি নামে পরিচিত। অনেক ক্ষেত্রে একে বেলস্‌ পলসিও বলা হয়- যখন বেলস্‌ সাইন পজেটিভ থাকে। আমাদের শরীরে মোট ১২ জোড়া করোটিকা স্নায়ু থাকে যার ৭ নম্বর স্নায়ু জোড়ার নাম ফেসিয়াল নার্ভ এবং এ নার্ভ বা স্নায়ুটির প্যারালাইসিস হলে বলা হয় ফেসিয়াল পলসি।

কারণ
এ রোগের প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ভাইরাস বা আঘাত হতে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।

লক্ষণ
ঠোঁট দু’টো বিপরীত দিকে বেঁকে যায়।
আক্রান্ত অংশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ হয় না, কিছুটা বা পুরোটাই খোলা থাকে।
জিহ্বা বের করলে বিপরীত দিকে বেঁকে যায়।
পানি খাওয়ার সময় আক্রান্ত অংশের ঠোঁটের কোণা দিয়ে পানি পড়ে যায়।
শিষ দিতে পারে না।
মুখ ফুলালে বাতাস বেরিয়ে যায় এবং আক্রান্ত অংশ ফুলে না।
আক্রান্ত অংশে অনুভূতি কমে যায়।
জিহ্বার সামনের অংশে স্বাদ কমে যেতে পারে।

চিকিৎসা
এ ধরনের রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যেতে পারে। সাধারণত তিনমাস সময় লাগে সারতে। কখনও তা না সেরে জটিল হয়ে যেতে পারে এবং চিরস্থায়ী হতে পারে। তাই বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে গ্রাজুয়েট (এমবিবিএস) চিকিৎসকগণ এ রোগ শনাক্ত করতে পারেন। তবে প্রথম থেকেই ফিজিক্যাল মেডিসিন বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। কারণ শুধুমাত্র ঔষুধে এ রোগ সারে না। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি এবং নির্দিষ্ট ব্যায়াম অত্যাবশ্যকীয়। চিকিৎসকগণ রোগের সঠিক ইতিহাস জেনে এবং শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় সঠিক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল জাতীয় ঔষুধ এবং স্টেরয়েড জাতীয় ঔষুধ বয়সভেদে নির্দিষ্ট মাত্রায় দেয়া হয়। নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসা নির্ভর করে কত দ্রুত অভিজ্ঞ ও সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন তার ওপর। দেরি করে এলে এ জাতীয় ঔষুধের কোন কার্যকারিতা থাকে না।

ফিজিওথেরাপি
আই আর আর (ওজজ) মুখের যে অংশের সমস্যায় তাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ দেয়া হয়।
কুসুম গরমপানিতে কাপড় ভিজিয়ে ছেঁক দেয়া যায়।
তিন সপ্তাহ পরে ইএসটি (ঊঝঞ) দেয়া হয়।
মুখের মাংসপেশীর নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত ফলপ্রসু।
স্ট্র বা পাইপ দিয়ে পানি খেতে পরামর্শ দেয়া হয় যাতে মুখের মাংসপেশীর শক্তি বাড়ে।
চুইংগাম চিবিয়ে ব্যায়াম করতে বলা হয়।
চোখ বন্ধ করতে না পারলে দিনের বেলা সানগ্লাস এবং রাতে আইপ্যাড ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়।
সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা যে কোন রোগের জটিলতা কমায়। এ রোগ আপনা থেকে সেরে গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই চিরস্থায়ী হতে পারে। সেজন্য আইটি কার্ভ বা এসডি কার্ভ করে জেনে নেয়া যায় এ রোগের অগ্রগতি।

**************************
ডাঃ সুনাম কুমার বড়ুয়া
বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিস বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
দৈনিক যুগান্তর, ২৪ অক্টোবর ২০০৯।