১ নভেম্বর জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ দিবস
কাল জাতীয় উদ্যোগে ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী সব বিদ্যালয়গামী শিশুকে এক ডোজ কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হবে। আপনার শিশুটি যেন বাদ না পড়ে

যে কোনও বয়সে কৃমি হতে পারে। তবে শিশুরাই কৃমিরোগে বেশি ভোগে। দেশের শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশ কেঁচোকৃমিতে ও প্রায় ৫০ শতাংশ বক্রকৃমিতে আক্রান্ত। একই শিশু একই সময়ে একাধিক কৃমিতে সংক্রমিত হতে পারে। কোনও অবস্থাতেই শিশুদের পেটে কৃমি রাখা চলবে না। আমাদের দেশে কেঁচোকৃমি, বক্রকৃমি, সুতোকৃমি ও ফিতাকৃমির সংক্রমণ বেশি হয়।

কেঁচোকৃমি বা রাউন্ড ওয়ার্ম
এ কৃমির সংক্রমণ হয় মল থেকে মুখে। এর ডিম মানুষের মলের সঙ্গে বের হয়। হাত ঠিকমতো না ধুলে এ ডিম নখের মধ্যে বা আঙুলের খাঁজে লেগে থাকা অবস্থায় অথবা অপরিষ্কার শাকসবজি, ফল ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের মুখে প্রবেশ করে। সেখান থেকে খাদ্যনালীর ক্ষুদ্রান্ত্রে ডিম চলে যায়, যেখানে ডিম ফুটে বাচ্চা কৃমি হয়, বড় হয় এবং কৃমি সেখানে আবার ডিম পারে। প্রত্যেক বাচ্চা কৃমি বড় কৃমিতে পরিণত হওয়ার আগে শিশুর ফুসফুস ঘুরে আসে। বমির সঙ্গে কৃমি দেখা গেলে বড় কৃমি শ্বাসনালীতে ঢুকে যেতে পারে এবং শিশুর মৃত্যুও ঘটাতে পারে। কেঁচোকৃমির সংক্রমণই পৃথিবীব্যাপী সর্বাধিক। ১-৬ বছর বয়সী শিশুরা কেঁচোকৃমিতে বেশি আক্রান্ত হয়।

সংক্রমণের লক্ষণসমূহ
অনেক সময় প্রথম দিকে কিছুই বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে নানা রকম লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। অন্ত্রে বেশি কেঁচোকৃমি থাকলে পেটের নানাবিধ অসুবিধা যেমন পেটব্যথা, পেটফাঁপা, পেট ফুলে ওঠা, পেট খারাপ, বদহজম, বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে। শিশুর খিদে কমে যায় ও অপুষ্টিতে ভোগে। কৃমি পিত্তনালীতে প্রবেশ করলে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কেঁচোকৃমি ‘অ্যাসকেরিন’ নামক বিষাক্ত পদার্থ শিশুর শরীরে ছড়িয়ে দেয়, ফলে শিশু শকে চলে যেতে পারে, অজ্ঞান হয়ে যায় এবং মৃত্যু ঘটায়। একটি কেঁচোকৃমি দৈনিক গড়ে প্রায় ২ লাখ ডিম পাড়ে এবং এভাবে দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটায়। কেঁচোকৃমি অন্ত্র থেকে পুষ্টিকর খাবার শোষণ করে। কেঁচোকৃমির সংক্রমণে শিশুর শরীরে ‘এ’ ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা
লিভামিসল ৩ মি· গ্রাম/কেজি ট্যাবলেট বা সিরাপ, ১ ডোজ, ১ সপ্তাহ পর আবারও ১ ডোজ, বিশেষত মুখ দিয়ে কৃমি যেতে থাকলে তৎক্ষণাৎ এ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে, ফলে কৃমি শ্বাসনালীতে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।

মেবানডেজল ১০০ মি· গ্রাম করে দিনে ২ বার পরপর ৩ দিন- ট্যাবলেট বা সিরাপ।
পাইরানটেল পাময়েট, পিপারেজিন সাইট্রেট ইত্যাদি।

কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর ২-৪ সপ্তাহ পর আবার মল পরীক্ষা করে কৃমি সংক্রমণ রয়ে গেছে কিনা নিশ্চিত হওয়া ভালো।

বক্রকৃমি বা হুকওয়ার্ম
এ কৃমির ডিম মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসার পর ভিজে মাটির সংস্পর্শে এলে ৭-১০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা কৃমি বা ফাইলেরিফর্ম লার্ভায় পরিণত হয় ও সংক্রমণের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। মাটিতে বা ঘাসে লেগে থাকা এ বাচ্চা কৃমি সাধারণত পায়ের চামড়া ফুটো করে দেহে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সময়ে ফুসফুস ঘুরে এসে অন্ত্রে অবস্থান নিয়ে বড় কৃমিতে পরিণত হয়। বক্রকৃমি দাঁতের সাহায্যে কামড়ে ধরে ক্ষুদ্রান্ত্রে লেগে থাকে ও দেহের রক্ত চুষে নেয়। ১০০ বক্রকৃমি দৈনিক গড়ে ২০-৩০ সিসি পরিমাণ রক্ত চুষে খেতে পারে ও আরও রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করে, ফলে শিশু সহসাই রক্তাল্পতার শিকার হয়। আমাদের দেশে শিশুদের রক্তশূন্যতার অন্যতম প্রধান কারণ হল বক্রকৃমির সংক্রমণ। অনেকক্ষেত্রে এরূপ রক্তশূন্যতার ফলে ‘হার্ট ফেলিওর’ নিয়ে শিশু মারাত্মক অসুখে পতিত হয় ও মৃত্যুবরণ করতে পারে।

সংক্রমণের লক্ষণ
শিশুর শরীরে যত বেশি পরিমাণ বক্রকৃমি থাকবে রক্তক্ষয়ের পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়ে। শরীরে রক্তস্বল্পতার কারণে মুখ, চোখ, হাত ও পায়ের পাতা এমনকি সারাশরীর ফ্যাকাশে দেখায়, তদুপরি হাত-পা ফোলা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হতে পারে। অনেক সময় পেটের যন্ত্রণা, অস্বস্তি, উদরাময়ে ভুগতে দেখা যায়। পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করার স্থান চুলকায় ও লাল বর্ণ ধারণ করে, যা সপ্তাহখানেক থাকে।

কাদের বেশি হয়
যারা খালি পায়ে হাঁটাচলা করে, বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে, যেখানে মাঠে-ঘাটে মলত্যাগের প্রবণতা বেশি অথবা পায়ে স্যান্ডেল না পরে পায়খানায় গেলে এ কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ওষুধ
বিফেনিয়াম হাইড্রোক্সিনেপথোয়েট ২ বছরের নিচে ২·৫ গ্রাম, ২ বছরের বেশি বয়সী শিশুর জন্য ৫ গ্রাম এক মাত্রা ডোজ। ওষুধগ্রহণের ২ ঘণ্টার মধ্যে কোনও খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়।

মেবেনডাজল ট্যাবলেট বা সিরাপ ১০০ মি· গ্রাম করে দিনে ২ বার পরপর ৩ দিন। সঙ্গে সঙ্গে রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা হিসেবে আয়রন ও ফলিক এসিড ট্যাবলেট বা সিরাপ প্রেসক্রিপশনে থাকা ভালো।
সুতোকৃমি (পিনওয়ার্ম)

স্ত্রী সুতোকৃমি রাতে মলদ্বারের পাশে ডিম পাড়ে, কামড়ায় এবং শিশু ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তে তার আঙুল দিয়ে চুলকায়। এতে করে কৃমির ডিম তার আঙুলের নখের মধ্যে লেগে যায়, অনেক সময় জামা-প্যান্ট অথবা বিছানার চাদরেও ডিম লেগে যেতে পারে। এ ডিম মেয়েদের প্রস্রাবের জায়গায়ও চলে যেতে পারে। ফলে সেখানেও চুলকায়। পরবর্তীতে শিশু সেই ডিমসহ হাতটি তার অজ্ঞাতেই কিংবা না বুঝে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। এতে করে পেটের ভেতরে নিজের কাছ থেকেই আবার কৃমির জন্ম হয়, তাই এ কৃমির চিকিৎসা একটু কঠিন। ৫-১৪ বছর বয়সী শিশুদের বেশি দেখা যায়।

সংক্রমণের লক্ষণ
মলদ্বারে চুলকানি হয়, বিশেষ করে রাতে। শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, খিটখিটে মেজাজের থাকে, খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে, পেটের গোলমাল দেখা যায়, শিশু অপুষ্টিতে ভুগতে পারে- শিশু ঠিকমতো নাও বাড়তে পারে।

চিকিৎসা
মেবেনডাজল ১০০ মি· গ্রাম ট্যাবলেট বা সিরাপ এক ডোজ এক মাত্রার।
পাইরানটেল পাময়েট অথবা পিপারেজিন সাইট্রেট ৭-১০ দিন খাওয়াতে হবে। ১-২ সপ্তাহ পর আবারও একই চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে।

ফিতা কৃমি বা টেপওয়ার্ম
এর ডিম মানুষের মলের সঙ্গে বেরিয়ে এসে মাটিতে বা ঘাসে লেগে থাকে। গরু, মহিষ মাঠে চরার সময়ে এ ডিমগুলো খেয়ে আক্রান্ত হয়। গরু, মহিষের অন্ত্রে এ ডিম থেকে বাচ্চা কৃমি বা লার্ভার জন্ম হয়, যা সিস্ট হয়ে ওইসব জীবের মাংসে বেঁচে থাকে। পরবর্তীতে মানুষ যখন আক্রান্ত সেসব জন্তুর অসিদ্ধ বা আধাসিদ্ধ সিস্টযুক্ত মাংস যেমন গো-মাংস বা মহিষের মাংস খায় তখন সংক্রমিত হয়। একইভাবে শূকরের মাংস থেকেও এ কৃমির সংক্রমণ হয়। যারা কাবাব বেশি খায় তাদের এ কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ফিতাকৃমিতে আক্রান্ত বোঝার উপায়
অন্ত্র ছাড়াও ফিতাকৃমি শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন- মস্তিষ্ক, লিভার, চোখ, ফুসফুস, অস্থি ইত্যাদি। অন্ত্রে ফিতাকৃমি থাকার কারণে অল্প অল্প পেটব্যথা হতে পারে। এ কৃমি যখন মানুষের মস্তিষ্কে সিস্ট তৈরি করে তখন বিপদের কারণ ঘটে। এসময়ে মাথাব্যথা, খিঁচুনি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

চিকিৎসা
প্রেজিকোয়ান্টেল ১০ মি·গ্রা·/কেজি/ডোজ- একমাত্রা, তবে মস্তিষ্কের সংক্রমণ বোঝা গেলে ৫০ মি·গ্রা·/কেজি/দিনে ৩ বার ১০ দিন, সঙ্গে প্রেডনিসোলন দিতে হবে।
অথবা
নিক্লোসেমাইড, শিশুর ওজন ৩৫ কেজির নিচে হলে ১ গ্রাম, ৩৫ কেজির বেশি ওজনের শিশুর জন্য ১·৫ গ্রাম। এর অর্ধেক ডোজ পানি দিয়ে চিবিয়ে খেতে হবে, বাকি অর্ধেক ডোজ ১ ঘণ্টা পর। চিকিৎসার ১ মাস পর কৃমি সংক্রমণ রয়ে গেছে কিনা আবার মল পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

কৃমি নিয়ে কুসংস্কার/ভুল ধারণা
‘পেটে দু’চারটে কৃমি থাকা ভালো’ বা ‘পেটে কিছু কৃমি না থাকলে খাবার হজম হয় না’ অনেকে এরকম ধারণা পোষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে কৃমি হল শরীরের শত্রু, এরা দেহের খাদ্য খেয়ে নেয়, রক্ত চুষে খায়, তাই কোনও অবস্থাতেই শরীরে একটি কৃমিও রাখা চলবে না।

অনেকের ধারণা, অত্যধিক মিষ্টি বা চিনি খেলে বা বেশি করে মাছ খেলে কৃমি হয়। এজন্য অনেকেই শিশুকে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার ও মাছ খেতে দিতে চান না। এ ধারণা মোটেও ঠিক নয়। কৃমি এক প্রকারের পরজীবী প্রাণী, যা খাবার বা পানির মাধ্যমে অথবা পায়ের পাতা ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে মিষ্টি হল এক প্রকার কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার। সুতরাং অত্যধিক মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে দেহে কৃমি হওয়ার বা কৃমি বাড়ার কোনও সম্পর্ক নেই। আসল কথা, যেসব শিশু মিষ্টি খেতে ভালোবাসে তারা সুযোগ পেলেই বাজারের তৈরি চকোলেট, লজেন্স, আলগা মিষ্টি খেয়ে ফেলে এবং এসব অপরিচ্ছন্ন খাবারের সঙ্গে কৃমির ডিম বা লার্ভা সহজেই দেহে প্রবেশ করে এবং এজন্যই তাদের কৃমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। মাছ খেলে কখনোই কৃমি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কালমেঘ বা চিরতার অর্থাৎ তেঁতো খেলে কৃমি মরে যায়, অনেকে এরকম ভেবে থাকে, যা ঠিক নয়, কারণ কালমেঘ বা চিরতার ভেষজগুণ থাকলেও এতে কৃমি মরে বলে এখনও প্রমাণিত হয়নি। কৃমির ওষুধ ঠাণ্ডার দিনে বা বৃষ্টির দিনে খাওয়াতে হয়, কিংবা মেঘলা দিনে, গরমের দিনে খাওয়াতে নেই এরকম ধারণা অনেকের মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু এর কোনও যুক্তি বা ভিত্তি নেই। যেসব কৃমির ওষুধ এখন ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাদের সবগুলোই মোটামুটি নিরাপদ।

**************************
ডাঃ প্রণব কুমার চৌধুরী
সহকারী অধ্যাপক, শিশুরোগ বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
দৈনিক যুগান্তর, ৩১ অক্টোবর ২০০৯।