প্রাচীনকাল থেকে চিকিৎসকরা মলদ্বারের চুলকানিকে একটি বিশেষ রোগ হিসাবে গণ্য করে আসছেন। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রাচীন পুস্তকেও এ সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। মলদ্বারে স্নায়ুতন্ত্রের প্রাচুর্যের কারণে সম্ভবত এই বিভিন্ন ধরনের উত্তেজকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগেও রহস্যময় এই রোগটির কারণ অনুসন্ধান ও চিকিৎসার কোনো সংক্ষিপ্ত ও সহজ-সরল সমাধান আমরা দিতে পারিনি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর চিকিৎসা করা সম্ভব, তবে তা নির্ভর করে রোগীর সঠিক ইতিহাস ভেঙ্গে যায়। এর ফলে নখের আঁচড়ে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

কি কি রোগে এমন হয়

যদিও এটি বিভিন্ন বিশেষ বিশেষ রোগে হতে পারে তবুও অনেক ক্ষেত্রেই মলদ্বারের কোনও রোগ পাওয়া যায় না। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এসব ক্ষেত্রেও চুলকানির কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে মলদ্বার ও মলাশয়ের সমম্বয়ের ভারসাম্যহীনতা দায়ী বলে মনে করা হয়। এই রোগে মলদ্বারের ত্বকে বিশেষ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পাইলস, ফিসার, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়ায় মলদ্বারে চুলকানি হতে পারে। মলদ্বারের সমস্যা ছাড়াও অন্যান্য রোগে মলদ্বারের চুলকানি হতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস, অ্যালার্জি, ছত্রাক সংক্রমণ, কৃমি ইত্যাদি। সরিয়াসিস নামক ত্বকের রোগে এবং মলদ্বারের চর্ম স্নায়ুপ্রদাহ নামক বিশেষ ধরনের রোগে মারাত্মক রকমের চুলকানি হতে পারে। এই সাংঘাতিক চুলকানির কারণে মলদ্বারের চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে।

বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা

এ রোগের কারণ নির্ণয়ের জন্য সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রপাতি দ্বারা পরীক্ষা করে দেখা গেছে এ জাতীয় রোগীদের মলাশয় ও মলদ্বারের মাংসপেশীর মধ্যে ফাংশনাল সমম্বয়ের অভাব রয়েছে। আমার প্রশিক্ষণকালীন সিংগাপুর জেনারেল হাসপাতালের কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগের বিশেষ ধরনের ল্যাবরেটরিতে রোগীদের উপর পরীক্ষা চালিয়ে উপরোক্ত তথ্যের যথার্থতা পাওয়া গেছে। এছাড়া মলদ্বারের ভিতরে কোলনস্কপি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ত্বকের হিসটোপ্যাথলজি ও ছত্রাক (ফাংগাস) পরীক্ষা করা যেতে পারে।

চিকিৎসা

ঐতিহ্যগতভাবে চিকিৎসকদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা এই যে, এ রোগের চিকিৎসায় সফলতা পাওয়া দুষ্কর। তবে সঠিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে এবং ধৈর্য সহকারে চিকিৎসা চালিয়ে গেলে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পক্ষে এ রোগ নিরাময় করা সম্ভব। বিভিন্ন ধরনের পথ্য, পেটেন্ট ঔষধ ও লোশন ব্যবহারে কমবেশি উপকার পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশনও ব্যবহার করা হয়। কোনো সার্জন মলদ্বারের ত্বক কেটে ফেলে নতুন ত্বক লাগিয়েও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কলোরেকটাল সার্জন ডাঃ ইউসোবিও মিথাইলিন বস্নু ইনজেকশন দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সুফল পেয়েছেন।

এই রোগের চিকিৎসার সাম্প্রতিক ধারা অতি সম্প্রতি এ রোগে বিশেষ বিশেষ খাবারের ভূমিকা রয়েছে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। তাই রোগীর খাবার তালিকা সম্বন্ধে সঠিক ইতিহাস নেয়া অত্যান্ত জরুরী। এভাবে দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী খাদ্যের আইটেমটি চিহ্নিত করতে পারলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। যে সমস্ত খাবারের কারণে এ রোগ হতে পারে সেগুলো হচ্ছে- চা, কফি, মদ, বিয়ার, টমেটো, পনির ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধূমপান এ রোগের কারণ হতে পারে। এ খাবারগুলো কিভাবে এ রোগ সৃষ্টি করে তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এ খাবারগুলো বিশেষ বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মিউকাস নিঃসরণ ঘটায় এবং মলে অম্স্নত্বের পরিবর্তন ঘটায়, যার কারণে চুলকানি হয়।

যেহেতু এই খাবারগুলো খুবই পরিচিত এবং বেশির ভাগ রোগীই এর কোনো কোনোটি খেয়ে থাকেন। তাই সার্জন যখন সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করেন তখন হ্যাঁ বোধক উত্তর পাওয়াই স্বাভাবিক। ঠিক কোন খাবারটি একজন রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ তা নিরূপণ করতে রোগীর সহযোগিতা দরকার এবং সার্জনের এ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন। একজন অভিজ্ঞ সার্জনের পক্ষে ক্ষতিকর খাবারটি চিহ্নিতকরণ করা সময় সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়।

বিভিন্ন ঔষধ ও পাথ্যের সাহায্যে কোষ্ঠ ব্যবসস্থাপনা মন করতে হবে যাতে রোগী স্বাভাবিকভাবে মলত্যাগ করতে পারে। যে সব রোগী মল আটকে রাখতে পারে না অথবা মাঝে মধ্যে চুইয়ে পড়ে তাদের জন্য বিশেষ ধরণের চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয় যে, রোগীর মলদ্বারে মল চুইয়ে পড়ছে কিন্তু তিনি ব্যাপারটি খেয়াল করেছেন না। এ রোগে মলদ্বারের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা খুবই জরুরী। সাবান, স্যাভলন ব্যবহার প্রয়োজন নেই। মলদ্বার জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব নয় এবং তা প্রয়োজনও নেই। যাদের টয়লেট পেপারে এলার্জি আছে তারা সেটি বর্জন করবেন। মলদ্বারের ভিতর বিশেষ পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের মলম এবং ক্রিম এজন্য পাওয়া যায়। ঠিক কোন ক্রিমটি একজন রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা উচিত। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে অ্যালার্জি জনিত চর্ম প্রদাহ হতে পারে। অভিজ্ঞ সার্জনের তত্ত্বাবধান ছাড়া স্টেরয়েড মলম ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক রোগী পরিচিত জনকে যে মলমটি ব্যবহার করতে দেখেছেন সেটিকেই কারণে-অকারণে নির্দিধায় ব্যবহার করে থাকেন। ব্যাপারটি অবশ্যই ক্ষতিকর। স্টেরয়েড মলমের অতিরিক্ত ব্যবহার বিপজ্জনক।

এ রোগ অসহনীয় মাত্রায় হলে ঘুমের ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। অভিজ্ঞ সার্জনের তত্ত্বাবধান ছাড়া স্টেরয়েড মলম ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক রোগী পরিচিত জনকে যে মলমটি ব্যবহার করতে দেখেছেন সেটিকেই কারণে-অকারণে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে থাকেন। ব্যাপারটি অবশ্যই ক্ষতিকর। স্টেরয়েড মলমের অতিরিক্ত ব্যবহার বিপজ্জনক।

এ রোগ অসহনীয় মাত্রায় হলে ঘুমের ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া বায়োফিডব্যাক পদ্ধতিতে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এটি একটি বিশেষ পদ্ধতি যার সাহায্যে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত দ্বারা মলদ্বারের ব্যয়াম করানো হয়। তবে বেশির ভাগ রোগীই যথাযথ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে।

**************************
অধ্যাপক ডাঃ একেএম ফজলুল হক
বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারী বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান (অবঃ), কলোরেকটাল সার্জারী, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বারঃ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল
৫৫, সাত মসজিদ রোড, ধানমণ্ডি, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ নভেম্বর ২০০৯।