শিশুদের ডায়েবেটিস সাধারণভাবে টাইপ ১ ডায়েবেটিস নামে পরিচিত। এই সমস্যা হলে দেহের প্যানক্রিয়াস যন্ত্রটি ইনসুলিন ক্ষরণ করতে ব্যর্থ হয়। দেহকোষে গস্নুকোজ প্রবেশ করার জন্য ইনসুলিন হরমোনটি অপরিহার্য। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরে শর্করা ভেঙ্গে গস্নুকোজ হয় এবং এই গস্নুকোজ রক্তস্রোতে বাহিত হয়ে পৌঁছায় দেহকোষে জ্বালানি হিসেবে। ইনসুলিনের সহযোগিতায় গস্নুকোজ দেহকোষে প্রবেশ করে খাবারে যোগায় শক্তি। ইনসুলিন না থাকলে শিশুদের ডায়েবেটিসে যা হয়-গ্লুকোজ দেহকোষে ঢুকতে পারে না এবং জমা হতে থাকে রক্তে, বাড়ে রক্তের গস্নুকোজ মান। রক্তস্রোতে গ্লুকোজ জমা হলে এবং রক্তের গ্লুকোজ ও দেহকোষের গ্লুকোজের মধ্যে সমতা নষ্ট হলে ডায়েবেটিস এর লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। হরমোন মানের তারতম্য আনে আচরণে পরিবর্তন। এ রোগ নিরাময় করা না গেলেও ইনসুলিন ইনজেকশন দিয়ে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


লক্ষণ উপসর্গঃ  নীচের  যেকোন একটি বা একাধিক দেখা দিতে পারে-

মাথা ধরা, পিপাসা বেড়ে যাওয়া, ক্ষুধা বৃদ্ধি, বারবার প্রস্রাব, ওজন হ্রাস যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, ক্ষত যা সহজে সারে না, ক্লান্তি যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, দুর্বলতা বা মাথা ঝিমঝিম্‌, ঝাপসা দৃষ্টি, শ্বাসে ফলের গন্ধ, বদমেজাজ, ঘাম হওয়া, বিহ্বলতা, বমি।

ডায়েবেটিস আক্রান্ত শিশুদের স্কুলের ব্যবস্থাপনাঃ

ডায়েবেটিক শিশুদের ব্যবস্থাপনার বেশ কিছুটা নির্ভর করে বিদ্যালয়ে ডায়েবেটিস সম্বন্ধে পরিচর্যা ব্যবস্থাপনার উপর। এদেশে স্কুল ব্যবস্থাপনা পর্ষদ এখনও এ ব্যাপারে ততটা সজাগ ও তৎপর নয় বলেই ধারণা। বাংলাদেশ ডায়েবেটিক এসোসিয়েশন ও বারডেম এ ব্যাপারে কিছুটা উদ্যোগ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে নেবে। উন্নত দেশেও এ দিকটি যে খুব সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাও নয়। একটি উন্নত দেশের তেমন একটি চিত্র তুলে ধরি-স্কুলের মেধাবী, ভালো ফল করা ছাত্রের মিডটার্ম ফলাফলে অকৃতকার্যকর হওয়ার জন্য মা-বাবাকে ডাকা হলো শিক্ষকদের সভায়। মা-বাবা বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করেন সে স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষয়িত্রী তাকে বেয়াদব ও দিনে ঘুমকাতুরে ছেলে বলে জানেন। দেখা গেলো মধ্য সকালের ক্লাস (বেলা ১০টা/১১টা) থেকে বেরিয়ে নাস্তা করতে যাওয়ার কথা বলতে ছেলেটি বিব্রতবোধ করত। কালক্রমে যখন বিজ্ঞানের ক্লাসের সময় হতো (মধ্যাহ্ন আহারের আগে আগে), তার রক্তের গ্লুকোজমান বিপজ্জনক নিচু মানে পৌঁছে যেতো (hypoglycaemia), তখন সে হতবিহ্বল হয়ে পড়তো এবং চিন্তা এলোমেলো হয়ে যেতো। শিক্ষকরা একে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেননি।

তাহলে কি লক্ষ্য করতে হবে শিশুদের মধ্যে?

ডাল্লাসে শিশুদের মেডিকেল সেন্টারে একজন পেডিয়াট্রিক এনডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ জন গারম্যাক এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি ডায়েবেটিক শিশুদের মা-বাবাদের পরামর্শ দেন, ‘বাচ্চাদের মধ্যে অকস্মাৎ আচরণগত কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য করুন।’ যদি কোনও স্বাভাবিক ভদ্র শান্ত শিশু হঠাৎ করে খুব বেয়াড়া ও নিয়ন্ত্রণহীন ও অবাধ্য হয়ে যায় তখন এর রক্তের সুগার মেপে দেখা উচিত, বা একজন স্বাভাবিক চটপটে তৎপর শিশু যদি হঠাৎ শান্ত, নীরব হয়ে যায় তাহলে তারও রক্তের সুগার মেপে দেখা উচিত।

টাল্লাহাসি মেমোরিয়েল হাসপাতালের ডায়েবেটিক কেন্দ্রের মেডিকেল ডিরেক্টার ডাঃ ল্যারি ডিব বলেন, “রক্তের সুগারের নিচুমান সনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” “আচরণে যেকোনও পরিবর্তনই গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের সুগার নেমে এলেঃ চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পেতে থাকেঃ একে রোধ না করা হলে এ থেকে সঙ্কালোপ পর্যন্ত ঘটতে পারে।”

তবে এ উপসর্গ মৃদু হতে পারে, হতে পারে রোগী বিহ্বল “তিনি ব্যাখ্যা করেন, ”একজন খুব ভালো ছাত্র হঠাৎ বোকার মত উত্তর দিয়ে ফেললো। কিছু কিছু বাচ্চা খুব বদমেজাজি হয়ে যায়, রেগে যায়, খুব বাজে ব্যবহার করেঃ। দেখেছি তারা অনেক সময় নিজেদের গুটিয়ে নেয়, কখনও ঘুমিয়ে পড়েঃ”

তথ্য বিনিময় করা, জানা এসব হলো গুরুত্বপূর্ণঃ

স্কুলে ডায়েবেটিস ব্যবস্থাপনা সফল করতে হলে শিক্ষককে এ ব্যাপারে অবহিত করতে হবে, ডায়েবেটিস সম্বন্ধে জ্ঞানদান করতে হবে, স্কুল নার্স থাকলে তাকেও এ-ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়।

আজকাল, শিক্ষকদেরকে ক্লাসভর্তি ছেলে-মেয়েদের পড়াতে হয়, তাই একটি বিশেষ ছাত্রের আচরণের নজরদারি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ডাঃ গারম্যাকের পরামর্শ হলঃ স্কুলে ভর্তির সময় বাচ্চার সমস্যা, আচরণ এসব, প্রতি শিক্ষককে জানানো উচিত যাতে তারা তার মধ্যে কি নজরদারি করবেন তা বুঝতে পারেন। যেকোনও সময় কোনও শিশু অস্বাভাবিক চাপা বা শান্ত হয়ে যায় বা খুব বদমেজাজি হয়ে যায়, তাহলে তার রক্তের সুগার মান মেপে দেখা উচিত। শিশুর রক্তের সুগার মানের সঙ্গে তার আচরণ কি হয় সে সম্বন্ধে শিক্ষক পরিচিত হলে তাহলে সতর্ক সংকেতগুলো সম্বন্ধে শিক্ষক ওয়াকেবহাল থাকবেন। পেডিয়াট্রিক এনডোক্রিনোলজিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি 'গ্লোরিয়া ইয়ং' শিশুদের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বাচ্চার অস্বাভাবিক রক্ত সুগার মানের সঙ্গে আচরণের যে পরিবর্তন হতে পারে এ ব্যাপারটি সনাক্ত করতে বা উপলব্ধি করতে শিক্ষকদের অনীহার জন্য যে দ্বন্দ্ব হতে পারে সেগুলো সমাধানের জন্য বাচ্চার মা-বাবাকে স্কুলের প্রিন্সিপাল, শিক্ষক ও স্কুল নার্সের সঙ্গে সভা করার জন্য উৎসাহিত করছেন গেস্নারিয়া ইয়ং। তিনি একজন ডায়েবেটিস এডুকেটারও বটে।

টিনএজ বাচ্চাদের জন্য এটি আরও কঠিনঃ

রক্তের গস্নুকোজমান শিশুদের মন মেজাজ-এর উপর বয়ঃসন্ধিকালে যে প্রভাব ফেলে এটি অনুধাবন করা জরুরি। হরমোনমানের বৃদ্ধি এ চিত্রকে আরও জটিল করে ফেলে, কেবল তাই খাওয়া-দাওয়া নজরদারি করে এর তারতম্য পূর্বাহ্নে আঁচ করা কঠিন, এর উপর টিনএজ ছেলে-মেয়েদের সে সময়কালে আচরণ পরিবর্তন চিত্রটিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। যেমন একজন টিনএজার হতবুদ্ধি বা বিহ্বল হয়েছে-এটি ড্রাগ বা এলকোহল বেশি পান করা বলে ভ্রম হতে পারে। তাই বাচ্চাদের জুনিয়ার ও সিনিয়ার স্কুল টিচারদেরকে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করে তোলা কঠিন তবে এতে সুফল আসে নিঃসন্দেহে।

এসব সমস্যা কি করে পরিহার করা যায়ঃ

নিজেকে এ-ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলা

নিজের বাচ্চার শারীরিক অবস্থা বোঝা মা-বাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মা-বাবারাই শিশুর নিরাপত্তার জন্য দায়ী। এছাড়া যে সব চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মী যারা সাধারণত টাইপ-১ ডায়েবেটিস চিকিৎসা করেন না। এরা ভালো ওয়াকিবহাল না হলে অনেক সময় ভুলও করতে পারেন।

শিক্ষকদেরও এ-ব্যাপারে শিক্ষিত করে তুলতে হবেঃ

প্রতি বছরই বাচ্চার নতুন শিক্ষকের জন্য একটি তথ্য পঞ্জিকা তৈরি করা ভালো। মাঝে-মাঝে সভা করা উচিত। ফিল্ড ট্রিপে বাচ্চার ক্লাসে সঙ্গে যাওয়া এবং অভিভাবক-শিশু সংগঠনগুলোতে সক্রিয় হওয়া উচিত। বাচ্চাদের বন্ধুদেরও চেনাজানা উচিত এবং তাদেরকে একটু জানিয়ে রাখা ভালো যে তাদের বন্ধুর

বন্ধু তৈরি করুনঃ অন্যান্য শিশু যাদের ডায়েবেটিস রয়েছে তাদের সঙ্গে নিজের বাচ্চার বন্ধুত্ব করিয়ে নেয়া, কোনও ক্যাম্প থাকলে এতে যোগ দেয়ানো এগুলো করা যেতে পারে।

অসুখকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিতঃ শিশুর রক্তের গস্নুকোজমান ও আহার ভালো করে নজরদারি করা উচিত।

সময়জ্ঞান থাকতে হবেঃ ডায়েবেটিস হয়ে প্রতিক্রিয়া হয়ে গেলে সে পরিস্থিতিতে বাচ্চার সঙ্গে আলোচনার সময় নয়। রক্তে শর্করা কমে গেলে স্পষ্ট চিন্তা করতে পারে না বাচ্চা। এখনও পর্যন্ত টাইপ ১ ডায়েবেটিসের কোন নিরাময় নেই। অবশ্য গবেষণা চলছে সে লক্ষ্যে। এটি জীবনভর একটি অসুখ, কিন্তু ঠিকমত ব্যবস্থাপনা হলে উপভোগ করা যায় সুস্থ ও সুখী জীবন। শিশুর বাড়ন্ত বয়স খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই সে সময় শিশু যাতে রোগকে গ্রহণ করতে এবং এর নিয়ন্ত্রণ শিখতে পারে, সেরকম শিক্ষা দেয়া উচিত।


*************************
লেখকঃ অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস, বারডেম, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০শে ডিসেম্বর ২০০৭