শৈশবে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুর নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যা জরুরি
গোটা বিশ্বে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক ক্যানসার প্রতিরোধ ইউনিয়ন ২০০৪ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি শিশু- ক্যানসার সচেতনতা দিবস পালিত হয় প্রতিবছর।

শিশু ক্যানসার: কিছু তথ্য
প্রাযুক্তিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্যও বাড়ছে। একটি শিশুর যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন গোটা পরিবার দিশেহারা হয়ে যায়। শিশুদের ক্যানসার ধরা পড়ে দেরিতে। উন্নত বিশ্বে শতকরা ৮০ ভাগ শিশু-ক্যানসার চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়, আমাদের দেশে হয় মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ। শুরুতেই ক্যানসার ধরা না পড়া এর অন্যতম প্রধান করণ। উন্নত দেশে ৮০ ভাগ রোগী বেঁচে যায় এবং আমাদের মতো দেশে ৮০ ভাগ মৃত্যুবরণ করে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় সাত হাজার শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, যাদের বয়স ১৫-এর নিচে। সারা দেশে গড়পড়তা ৭০০ শিশুর চিকিত্সা হয়—বাকি প্রায় ৯০ ভাগই থাকে চিকিৎসাসেবা-বঞ্চিত।

দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ জরুরি
সামাজিক সচেতনতার অভাব তথা না জানা, অবকাঠামো না থাকা, চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়া ইত্যাদি কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার ধরা পড়ে একেবারে শেষ পর্যায়ে; যখন আর কিছুই করার থাকে না। অথচ ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে কত তাড়াতাড়ি এটি শনাক্ত করা গেল তার ওপর।
আবার যাদের রোগ শনাক্ত করা যাচ্ছে, তাদের একটা বড় অংশ আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে যথাযথ চিকিত্সৎসা নিতে পারে না। যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদেরও বেশির ভাগ চিকিৎসা-সফলতা পায় না।

কী করা যেতে পারে
শৈশবের ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য কিছু দিন আগে প্রথম আলোর উদ্যোগে একটি গোলটেবিল-আলোচনা হয়েছিল। সেখানে যে পরামর্শগুলো উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে, তা আরেকবার স্মরণ করা যেতে পারে।

দ্রুত শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা
ক্যানসার রেজিস্ট্রি এবং স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করলে শুরুতেই রোগ ধরা পড়ে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বাচ্চাদের মধ্যে স্কুল হেলথ কিংবা কমিউনিটি সার্ভিসের মাধ্যমে এটি চালু করা যায়। আমাদের দেশে খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার রেজিস্ট্রি (ক্যানসার শনাক্তকরণের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ) চালু হয়েছে। রোগ নিরীক্ষণ বা সার্ভিলেন্স ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে।

সাপোর্ট সার্ভিস
বর্তমানে যেসব রোগী আছে—তাদের সুচিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতালে শিশুদের জন্য বেড খুবই কম। আবার চিকিৎসাও বেশ ব্যয়বহুল। প্রায়ই দেখা যায় ক্যানসার চিকিৎসার জন্য সাহায্যের আবেদন। সে জন্যই ক্যানসার চিকিৎসায়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ড্রপআউট বেশি। আমাদের এখানে কমিউনিটি সাপোর্টও কম। ক্যানসারে ভালো হয়ে যাওয়া যায়—এ ধারণাটাই নেই সমাজে।

ক্যানসার শেল্টার
সরকারি হাসপাতালের সীমিত শয্যার পাশাপাশি বেসরকারিভাবে বেশ কয়েকটি ক্যানসার শেল্টার গড়ে উঠেছে। ক্যানসার যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, তাই শিশুর সঙ্গে অভিভাবকদেরও অবস্থান করতে হয় একসঙ্গে। ক্যানসার শেল্টারের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন সুব্যবস্থাপনাসহ। ক্যানসার শেল্টারের উদ্যোগে বাচ্চাদের জন্য আনন্দময় পুনর্বাসন কর্মসূচি, আনন্দভ্রমণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সৃষ্টিশীল উদ্যোগ ইত্যাদি নেওয়া যেতে পারে।

প্রশমন সেবা
চিকিৎসার ফলাফল যেখানে সুনিশ্চিতভাবে জানা, সেখানে জীবনের শেষ দিনগুলো যতটা ভালোভাবে আনন্দময় করে তোলা যায় ততই মঙ্গল। প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমনসেবার লক্ষ্যও তা; একটা টিমওয়ার্ক; ডাক্তার, নার্স, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব—সবাই মিলে পরিকল্পিতভাবে ব্যথা প্রশমন আর জীবনের জয়গান গাওয়া।

প্রতিরোধ-প্রতিকার করা যায় কীভাবে
আক্রান্ত শিশুর বাবা-মায়েরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। যেমন ধরুন—রোগ শনাক্ত করা, কোথায় কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়, ওষুধ পাওয়া যায় কোথায়, কেমো এবং রেডিওথেরাপি কোথায় কীভাবে দেওয়া যাবে—এসবের জন্য এক ধরনের সামাজিক যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়। আজকাল ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছে। শিশুদের ক্যানসার শুরুতেই যাতে বাবা-মায়েরা বুঝতে পারেন, সে জন্য কিছু তথ্য জানানো জরুরি।

—যদি হঠাৎ নিয়মিতভাবে ওজন কমতে থাকে।
—মাথাব্যথা হয় ঘন ঘন, তীব্রভাবে, সকালে বেশি।
—হাড়ে ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা।
—শরীরের কোথাও কোনো চাকা কিংবা লাম্প অনুভূত হওয়া।
—হঠাৎ অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হওয়া।
—চোখের মণিতে সাদা সাদা দাগের মতো দেখতে পাওয়া।
—বমিভাব বা বমি হওয়া।
—অল্পতেই ক্লান্তি আসা।
—বারবার ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়া।
—হঠাতৎ কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পরিবর্তন দেখতে পাওয়া।
—বারবার জ্বর আসা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বর হওয়া—ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

চিকিৎসার ব্যয় এবং ওষুধের মূল্য কমানো জরুরি
ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ওষুধের দাম অনেক বেশি। কেন? কারণ অধিকাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়; শুল্কও বেশি। সরকারিভাবে ক্যানসারের ওষুধ কেনা হয় না। রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয়, সব সময় পাওয়া যায় না— ফলে কালোবাজারি এবং দাম বেশি হয়। সরকারিভাবে ওষুধ কেনা যদি সম্ভব না-ই হয়, তবে অন্তত দেশীয় কোম্পানিগুলোকে ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করতে দেওয়া হোক। আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া হোক ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে। মানুষ মৃত্যুর আগেই তো মরে যায় ওষুধ কিনতে গিয়ে। যে ওষুধ ৮০০ টাকায় পাওয়া যাওয়ার কথা, তা কিনতে হয় পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে। সরকার ওষুধ কিনে না দিলে অন্তত খবরদারিটা করুক।

ভালো থাকার আছে যে উপায়
ক্যানসারেও ভালো থাকা যায়। ছোটদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ ব্লাড ক্যানসার ভালো হয়। ওষুধ এবং ব্লাড প্রোডাক্ট বা রক্তের উপাদান—এ দুটি জোগাড় করা গেলে শিশুদের রক্তের ক্যানসার সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। বিশেষ করে অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ার ফলাফল খুবই ভালো। এ ছাড়া হসকিন ডিজিজ, বোন টিউমার ইত্যাদির ফলাফলও ভালো। লিউকেমিয়ায় মৃত্যুর প্রধান কারণ ইনফেকশন অথবা ব্লিডিং। ইনফেকশনে দরকার এন্টিবায়োটিক আর ব্লিডিং রোধে প্লেটলেট। প্রয়োজন ডে-কেয়ার ইউনিট।

আসুন, একটু উদ্যোগী হই
প্রশিক্ষিত ডাক্তার আছেন, ওষুধ আছে, কখনো কখনো টাকাও আছে—নেই শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। সরকারি-বেসরকারি অনেক উদ্যোগও আছে—প্রয়োজন একটু বাড়তি মনোযোগ, একটু বাড়তি চেষ্টা। ওষুধ প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো, সরকারিভাবে ক্যানসারের ওষুধ ক্রয় কিংবা আমদানি শুল্ক রহিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে আউটডোরে ডে-কেয়ার চালু করলে ক্যানসারে শিশু-মৃত্যুর হার কমে আসবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসুন—শুধু শিশুদের জন্য একটা ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপনে।

*************************
ডাঃ ইকবাল কবীর
সহকারী অধ্যাপক, রোগতত্ত্ব, নিপসম
দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ ফেবুয়ারি ২০১০।