ফেব্রয়ারী মাসের চার তারিখ পালিত হয় বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। বিশ্ব জুড়ে মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হিসেবে ক্যান্সারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান অনুযায়ী প্রতিরোধ না করলে ২০০৫-২০১৫ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ক্যান্সারে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হবার সম্্‌ভাবনা। ২০১০ সালে ৪ ফেব্রুয়ারী তারিখে পালিত বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের থিম হলোঃ ‘ক্যান্সার প্রতিরোধও করা যায়’। এই প্রতিরোধের উপায় হিসেবে সহজ কিছু বিষয়ের দিকে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

০ ধূমপান না করা

০ স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ

০ নিয়মিত ব্যায়াম

০ ক্যান্সার জনক সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা

০ পরিবেশ দূষণ রোধ। বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ১২ লক্ষ। প্রতিবছর ক্যান্সারে আক্রা- হয় ২ লক্ষ লোক, মৃত্যু ঘটে দেড় লক্ষ লোকের। ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাংলাদেশে রয়েছে; এটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ সরকারের, সন্দেহ নেই। এই আইনের কঠোর প্রয়োগ করলে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে আসবে বড় ধরনের অগ্রগতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধ্যাপক (ডাঃ) রমাকা- বলেন, তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর মৃত্যু হয় ৫০ লক্ষ লোকের। প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারী তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতা করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইউনিয়নকে (UICC) যাতে ক্যান্সারের বিশ্বব্যাপী প্রকোপকে কিছুটা হালকা করা সম্ভব হয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং ক্যান্সার আক্রা- লোকদের জীবনের গুণগতমান বাড়ানো, প্রধান কাজগুলোর মধ্যে পড়ে। ২০০৫ সালের একটি তথ্য অনুযায়ী ৭৬ লক্ষ লোক মারা যায় ক্যান্সারে। এর মধ্যে ৭০% মানুষ ছিলেন নিম্ন আয় ও মধ্য আয় দেশগুলোতে। অথচ অনেক ক্যান্সারকে এড়ানো যায় সহজেই। অনেক ক্যান্সার প্রতিরোধও করা যায়। অনেকগুলো সূচনা পর্যায়ে চিহ্নিত হলে চিকিৎসা করা যায় এবং নিরাময়ও সম্্‌ভব হয়। ক্যান্সারের অন্তিম পর্যায়েও ব্যথাবেদনা উপশমের চেষ্টা করা যায়, এর অগ্রগতি ধীরগতি করে দেয়া যায়, রোগী ও স্বজনদেরকে এরোগ মোকাবেলার জন্য সাহায্য করা যায়।

ক্যান্সার প্রতিরোধ হলো একে মোকাবেলার বড় কৌশল এবং দরিদ্র ও মধ্য আয় দেশগুলোতে এই কৌশলটি জোরদার করা বেশি দরকার। ক্যান্সার প্রতিরোধ কর্মসূচীকে অন্যান্য ক্রনিক রোগ প্রতিরোধ এবং সম্পর্কিত সমস্যা যেমন প্রজনন স্বাস্থ্য, হেপাটাইটস-বি টিকা ও এইচআইভি/এইডস, পেশাগত ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচীর সঙ্গে সম্মন্বিত করলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় সুফল পাওয়া সম্্‌ভব। ৪০% ক্যান্সার প্রতিরোধ যোগ্যঃ বেশির ভাগ ক্যান্সারই তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাবার, সংক্রমণের এজেন্ট-এসবগুলোর সঙ্গে জড়িত।

আগাম চিহ্নিত করাঃ রোগকে সূচনা পর্যায়ে চিহ্নিত করা গেলে, বিশেষকরে জরায়ুগ্রী বা ক্যান্সার ও ক্যান্সারের ক্ষেত্রে নিরাময়ের উজ্জল সম্ভাবনা। আগাম চিহ্নিত করার জন্য রয়েছে দু’টো কৌশলঃ-
আগাম রোগ নির্ণয়ঃ রোগের সূচনায় যেসব লক্ষণ উপসর্গ সেগুলো সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করলে এবং স্বাস্থ্য পরিচর্যাকর্মীর সঙ্গে এনিয়ে আলোচনা করলে বিধি ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত হতে পারে। - উপসর্গ নেই এমন আপাতঃ সুস্থ লোকদেরকে জাতীয় বা আঞ্চলিক স্ব্রিনিং কর্মসূচীর আওতায় আনতে পারলে ক্যান্সার পূর্বে ক্ষত বা ক্যান্সারের আগাম চিহ্ন বা ধাপকে চিহ্নিত করে যথাযথ চিকিৎসা হতে পারে।

ক্যান্সার বিশ্লেষক অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেন, ধূমপান ও তামাক ব্যবহার অথবা মদ্যপান ক্যান্সারের একটি বড় কারণ। তাই ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করলে অনেক ক্যান্সার ঠেকানো সম্্‌ভব। এরকম একজন রোগী, যিনি টিনএজ বয়স থেকে জদ্র্দা, গুল চিবানো ও মদ্যপান করে আসছিলেন, বয়স এখনতার ৫২, তার ডান গালের ভেতর থেকে প্রথম সংহারী টিউমার অপসারণ করা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি অপসারণ করা হয়েছিল ২০০৫ সালে গলার ভেতর থেকে। এখন তার টিউমার ছড়িয়ে পড়ছে ফুসফুস ও যকৃতে। তিনি এখন মৃত্যু পথ যাত্রী। অথচ তামাক সেবন ও মদ্যপান বর্জন করলে এই মৃত্যু এড়ানো যেত।

ক্যান্সার প্রতিরোধকে বিবেচনা করার সময় অন্যান্য ক্রনিক রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে এক সাথে বিবেচনা করা ভালো। যেমন হূদরোগ ও রক্তনালীর রোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসযন্ত্রের ক্রনিক রোগ এবং মদ্যপানে আসত্ত্নি এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা যায় কারণ, ঝুঁকি থাকে প্রায় একই রকম।

সাধারণ ঝুঁকিগুলো হলোঃ

০ তামাক ব্যবহার

০ মদ্যপান

০ খাদ্যবিধি বিশেষকরে কম করে শাক-সবজি ও ফল গ্রহণ করা

০ শরীরচর্চা না করা

০ বেশি ওজন ও স্থূলতা।

অন্যান্য ক্যান্সার জনক উপাদানের মুখোমুখি হলে যেমন-

০ ভৌত কার্সনোজেন যেমন অতি বেগুনী (UV) ও আয়োনিত বিকিরণ।

০ রাসায়নিক কার্সনোজের যেমন বেনজোপাইরিন, ফর্মালডিহাইড, আলফাটক্সিন (খাদ্যজনিত) এসবেসটস্‌

০ জৈব কার্সনোজেন যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী সংক্রমন। এসব ঝুঁকি হ্রাসের পদক্ষেপ নিলে কেবল ক্যান্সারই হ্রাস পাবেনা অন্যান্য ক্রনিক রোগও কমবে। যেসব ঝুঁকিকে হ্রাস করা খুব সম্ভব সেগুলো হলঃ ক্স ধূমপান ও তামাক ব্যবহারঃ প্রতিবছর এজন্য মারা যায় ১৫ লক্ষ লোক (৬০% মৃত্যু ঘটে নিম্ন আয় ও মধ্য আয় দেশগুলোতে।

০ বেশি ওজন, স্থূলতা এবং শরীরচর্চার অভাবঃ এগুলো মিলে প্রতিবছর ক্যান্সারে মৃত্যু ঘটে ২ লক্ষ ৭৪ হাজার জন লোকের।

০ মদ্যপানঃ প্রতিবছর এজন্য ক্যান্সারে মৃত্যু হয় তিন লক্ষ একান্নো হাজার লোকের।

০ যৌনবাহিত প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমনঃ প্রতিবছর একারণে ক্যান্সারে মারা যান ২ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ।

০ বায়ুদূষণ (অন্দর ও সদর)ঃ প্রতিবছর এজন্য ক্যান্সারে মৃত্যু ঘটে ৭১ হাজার জন লোকের।

০ পেশাগত কার্সনোজেনঃ প্রতিবছর এজন্য ক্যান্সারে মৃত্যু হয় ১ লক্ষ ৫২ হাজার জন লোকের।

হ্রাস করার উপায়ঃ

০ সিগারেট, জর্দ্দা ও গুল এসবের অতি উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে, কর্মস্থল ও জন সমাবেশে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে, তামাকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সবরকম বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে, তামাকের প্যাকেটে স্পষ্ট সতকêবাণী ও বিপদ উল্লেখ করে, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করে এবং এর কঠোর প্রয়োগ করে, তামাক ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে। সরকার এবং বেসরকারী সংগঠন যেমন ‘মানস’ ও আধুনিক এক্ষেত্রে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করেছে।

০ স্বাস্থ্যকর খাদ্য আহার সম্বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি। ফাস্টফোড ও কোমলপানীয় গ্রহণকে নানা ভাবে নিরুৎসাহিত করা।

০ সম্পৃত্ত্ন চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহার কমানো, ফল, শাক-সবজি, ডাল, দানাদার শস্য, আশ সম্বৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ উৎসাহিত করা, চিনি ও নুন খাওয়া কমানো, চীনা ধরনের ফার্মেন্টেড লোনা মাছ গ্রহণ বর্জন করা, কোমল পানীয় ও ফাস্টফোড খাবার নিরুৎসাহিত করা। স্ড়্গুলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য দেওয়া, কর্মস্থলেও স্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া উৎসাহিত করা।

০ শরীরচর্চা বাড়ানোঃ হাঁটা, সাইকেলে চলা, চলার পথ সুগম করা, প্রতিস্ড়্গুলে খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা।

০ মদ্যপান নিষিদ্ধকরা

০ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচী ব্যাপক করা

০ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা

০ পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতায় সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ এতে সম্পৃক্ত হওয়া। প্রায় ৪০% ক্যান্সার হলো প্রতিরোধযোগ্য। তাই প্রতিরোধ কর্মসূচী হবে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য। তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, শরীরচর্চার অভাব এবং স্থূলতা এগুলো হল বড় ঝুঁকি। অনেক প্রতিরোধ কর্মসূচী হলো সাশ্রয়ী এবং কম খরচের কৌশল, একে ঠিকমত পরিকল্পনা করে প্রয়োগ করা হলো বড় কাজ। সম্পদ যাই হোক, সবদেশই ক্যান্সার মহামারীকে ঠেকানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে পারে, জীবন বাচাতে পারে, অসংখ্য মানুষের, অহেতুক ভোগান্তি ও কষ্ট কমাতে পারে অনেক মানুষের।

*************************
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী পরিচালক ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস, বারডেম, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ২০ ফেবুয়ারি ২০১০।