মূলত কিডনি ও কিডনি থেকে যেসব নালি প্রস্রাবের থলিতে চলে গেছে এবং যার মাধ্যমে প্রস্রাবের নির্গমন হয়, সেই মূত্রপথের সমন্বয়ে মূত্রতন্ত্র গঠিত। জীবাণু যদি এই তন্ত্রে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়, তাহলে সে অবস্থাকে বলা হয় মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন।

মূত্রতন্ত্রের প্রদাহের প্রকারভেদ
মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ মূলত তিন প্রকার। প্রথমত, কোনো উপসর্গবিহীন সংক্রমণ। দ্বিতীয়ত, শুধু মূত্রাশয় ও মূত্রপথ আক্রান্ত হলে প্রদাহ। তৃতীয়ত, যদি কিডনি স্বয়ং এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তখন তাকে বলে আপার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা পায়লোনেফ্রাটিস বলে। আবার উভয় ধরনের প্রদাহ হতে পারে।

উপসর্গগুলো
—প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও দুর্গন্ধ
—ঘন ঘন ও ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হওয়া
—প্রস্রাবে প্রচণ্ড চাপ কিন্তু পরিমাণে কম হওয়া
—আরও প্রস্রাব করার ইচ্ছে
—তলপেটে ব্যথা এবং ভার ভার
—লালচে বর্ণের বা ঝাপসা প্রস্রাব।

যেভাবে জীবাণু মূত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে
সাধারণত মূত্রপথ থেকে প্রস্রাবের থলি বা মূত্রাশয়, সেখান থেকে মূত্রনালির মাধ্যমে এই জীবাণু কিডনি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। যে জীবাণু নিয়ে প্রস্রাবের প্রদাহ হয়, এর ৯৫ ভাগ জীবাণু বসবাস করে খাদ্যনালি বা বৃহদন্ত্রে। পায়খানা করার পর যদি এই জীবাণু মূত্রপথের সংস্পর্শে আসে, তখন প্রদাহ হয়ে থাকে। সাধারণত মেয়েদের এই প্রদাহ পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।

মেয়েদের এই প্রদাহ বেশি হওয়ার কারণ
প্রথমত, তাদের মূত্রনালির দৈর্ঘ্য ছোট্ট। এছাড়া মূত্রপথ মলদ্বারের কাছাকাছি থাকায় জীবাণু সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ বেশি। তৃতীয়ত, মিলনের সময় জীবাণু প্রবেশ করতে পারে।

যাদের মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ বেশি হয়
—যারা পানি কম খায়
—যারা প্রস্রাব আটকে রাখে
—যাদের ডায়াবেটিস আছে
—গর্ভবতী মায়েদের
—যাদের মূত্রতন্ত্রে বাধা রয়েছে
—পুরুষদের প্রস্টেট-গ্রন্থি বড় হলে
—মূত্রনালিতে পাথর হলে
—বয়স ষাটের বেশি হলে
—যাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম

রোগ নির্ণয়
প্রথমত, রোগের ইতিহাস নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বয়স, লিঙ্গ, প্রস্রাবের নালিতে বাধাজনিত রোগ, প্রস্টেট বড় কিনা, উপসর্গ কোন ধরনের ইনফেকশনের পরিচয়বাহী, কোমরে ব্যথা, জ্বর, কাঁপুনি আছে কিনা প্রভৃতি বিবেচনায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে (প্রস্রাব ও রক্ত) প্রস্রাবের কালচার করলে জীবাণু শনাক্তকরণ এবং কোন ওষুধ কাজ করবে তাও জানা যায়। কালচার করার সময় প্রস্রাব সংগ্রহের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে সংগৃহীত হলে সেই প্রস্রাব কালচার করলে জীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং চিকিত্সাও সঠিক হবে।

মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রদাহের ঝুঁকিপূর্ণ কারণ
—মিলনের সময় মূত্রপথ দিয়ে ব্যাকটেরিয়া মূত্রাশয়ে চলে যায়। ফলে মিলন মূত্রাশয়ের প্রদাহের একটা বড় কারণ।
যেসব নারী বিভিন্ন স্পার্মিসাইড, কৃত্রিম ডায়াফ্রাম ব্যবহার করে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। গর্ভবতী মায়েদের বেশি বেশি মূত্রাশয়ের প্রদাহ হয়ে থাকে। এর কারণ তাদের মূত্রনালি মোটা হয়, ফলে প্রস্রাবের ধারণ বাড়ে। এভাবে প্রস্রাব জমে গিয়ে প্রদাহ হয়। গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন প্রস্রাব দিয়ে নির্গত হয়। ফলে শরীরে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
—আগে মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ হয়ে থাকলে পরে মূত্রাশয়ের প্রদাহ হওয়ার হার খুব বেশি।
—মাসিকের সময় অস্বাস্থ্যকর প্যাড ব্যবহার করলে তা থেকেও প্রদাহ হতে পারে।
—পোস্ট মেনোপজাল বয়সে বা রজঃচক্র বন্ধ হওয়ার পরও মেয়েদের মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ হওয়ার হার খুব বেশি।

পুরুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণগুলো
—প্রোস্টেট-গ্রন্থি বড় হওয়া।
—মুসলমানি না করা হলে লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বকের ভাঁজের ভেতর ব্যাকটেরিয়া জমে প্রদাহ করতে পারে।
—অসংযমী মিলন।
—শারীরিক সম্পর্কের সময় সঙ্গীর কাছ থেকে।
—এইচআইভি বা এইডস রোগীর ক্ষেত্রে।

মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধে করণীয়
—প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে।
—প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না। যখন প্রস্রাবের বেগ হবে তখনই প্রস্রাব করতে হবে।
—ক্যানবেরি জুস নামে এক ধরনের ফলের রস পাওয়া যায়। এ জুস খেলে মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ কমে যায়।
—কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

মেয়েদের জন্য কিছু পরামর্শ
—মিলনের পরপরই ভালো করে পরিচ্ছন্ন হতে হবে এবং প্রস্রাব করতে হবে।
—কনডমে স্পার্মিসাইড বা কৃত্রিম ডায়াফ্রাম ব্যবহার করা যাবে না।
—মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ঘন ঘন বদলাতে হবে।
—অস্বাস্থ্যকর স্প্রে ব্যবহার করা যাবে না।
—ডিওডারেন্ট ব্যবহার করা যাবে না। এগুলো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।

পুরুষদের জন্য সতর্কতা
—মুসলমানি করানো হলে ইনফেকশন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
—নিয়মিত ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

**************************
অধ্যাপক ডাঃ এমএ সামাদ
লেখক : চিফ কনসালটেম্লট ও
বিভাগীয় প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
দৈনিক আমার দেশ, ০৯ র্মাচ ২০১০।