বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগে ভুগে থাকেন। প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো লক্ষণ থাকে না বলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে, তিনি উক্ত রক্তচাপজনিত কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে এ রোগটি শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব। সাধারণত যেসব উচ্চ রক্তচাপের রোগী ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কিডনি রোগের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। উচ্চ রক্তচাপ একদিকে যেমন কিডনি রোগের কারণ, আবার অন্যদিকে কিডনি রোগের অন্যতম লক্ষণ উচ্চ রক্তচাপ। অর্থাত্ এ দুটি পরস্পর একটি অন্যটির কারণ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্থায়ী কিডনি বিকল (ঊহফ-ঝঃধমব জধহধষ উরংবধংব) রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি (প্রায় ১০ বছর) উক্ত রক্তচাপে ভুগছেন এমন রোগীদের প্রায় পনের শতাংশ কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি রোগকে উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ বা হাইপারটেনসিভ নেফ্রোপ্যাথি বলা হয়ে থাকে।

কিডনির ওপর উচ্চ রক্তচাপের প্রভাব
স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থ কিডনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনির এই স্বয়ংক্রিয় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমতে থাকে। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সুস্থ কিডনিকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এতে সুস্থ কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা আর কখনোই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। এই অতিরিক্ত কাজ দিনের পর দিন করতে গিয়ে এক সময় কিডনির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। ফলে উচ্চ রক্তচাপের রোগী কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। তাই উচ্চ রক্তচাপকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে কিডনির কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং রোগী উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ বা হাইপারটেনসিভ নেফ্রোপ্যাথি রোগে আক্রান্ত হয়। যা পরে স্থায়ীভাবে কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করে ধীরগতির কিডনি রোগে রূপ নেয়। ফলে এক সময় রোগী স্থায়ী কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া অতি অল্প সময়ের জন্য মাত্রাতিরিক্ত অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ তাত্ক্ষণিকভাবে কিডনি বিকল করে দিতে পারে, যা একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি।

প্রতিরোধে করণীয়
উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তাই আজীবন নিয়মিত ওষুধ সেবন করে একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই রোগীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে অর্থাভাবে, ব্যস্ততার অজুহাতে অথবা নিছক উদাসীন হয়ে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে চান না এবং উচ্চ রক্তচাপ যথাযথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে একসময় উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ বা হাইপারটেনসিভ নেফ্রোপ্যাথি রোগে আক্রান্ত হয়ে পরিবার ও সমাজের কাছে বোঝা হয়ে যান এবং দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন। অথচ প্রাথমিকভাবে একটু সচেতন হলেই আমরা এ মারাত্মক রোগের হাত থেকে মুক্ত থাকতে পারি।

উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ বা হাইপারটেনসিভ নেফ্রোপ্যাথি’র প্রকোপ থেকে বাঁচতে নিচের নির্দেশনাগুলো মনে রাখতে হবে :
—ধূমপান সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।
—সব রকমের চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
—পাতে লবণ খাওয়া বর্জন করতে হবে।
—তামাক, জর্দা, সাদা পাতা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ত্যাগ করতে হবে।
—প্রতিদিন কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। অথবা নিয়মিত অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে।
—ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
—নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে এবং যথাযথ ওষুধের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
—উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
—উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন এমন রোগীদের বছরে অন্তত একবার কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে।
 

**************************
ডাঃ একেএম শাহিদুর রহমান
লেখক : মেডিকেল অফিসার
কিডনি রোগ বিভাগ
বিএসএমএমইউ, শাহবাগ, ঢাকা
shahidurahman80@yahoo.com
দৈনিক আমার দেশ, ১৬ র্মাচ ২০১০।