শীতের সময় আমরা সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হতেই পারি। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য জীবনযাপনের পদ্ধতি, সামাজিক-প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভাইরাসের সংক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটু সচেতন হলে শীতে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সহজেই। শীতকালীন ঠান্ডা লাগা এবং আরও কিছু রোগ-বালাই নিয়ে এ প্রতিবেদন


ঠান্ডা লাগা
ঠান্ডা লাগা এমন একটি অসুখ, যা সব বয়সের লোককেই আক্রান্ত করে। ঠান্ডার ভাইরাস সাধারণত নাক ও মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। তখন শরীরের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে।
প্রতিরোধ করতে না পারলে ভাইরাস শরীরে ছড়াতে থাকে। কোল্ড ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার তিন-চার দিনের মধ্যে এর উপসর্গগুলো দেখা দেয়। এ সময়ের মধ্যেই একজনের কাছ থেকে অন্যের শরীরে ছড়াতে থাকে। সাধারণত শীতকালেই কোল্ড ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। কারণ এ সময় ঘরের আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে উষ্ণ থাকে। আর এই উষ্ণ আবহাওয়ায় কোল্ড ভাইরাস বেশি ছড়ায়।


এ ছাড়া শীতের সময় আমরা একে অপরের সংস্পর্শে বেশি থাকি, যার ফলে জীবাণু খুব তাড়াতাড়ি ছড়ানোর সুযোগ পায়। তবে কোল্ড ভাইরাসের আক্রমণ থেকে সাত দিনেই সেরে ওঠা যায়। কোনো কোনো সময় ওষুধ নিতে হয়।

উপসর্গ
* মাথায় ও বুকে চাপ, নাক সিরসির করা
* শ্বাসকষ্ট
* মুখে ক্ষত
* সর্দি
* শুষ্ক কাশি
* চোখ জ্বালাপোড়া করা ও পানি আসা
* মাথা ব্যথা করা
* বিষাদ অনুভব করা।


সাধারণত ঠান্ডা লাগার জন্য ভাইরাল আপার রেসপিরেটরি ইনফেকশনই দায়ী। এর ফলে মুখে ক্ষত, সর্দি, কান ও নাক বন্ধ হয়ে আসে; গলা ও টনসিলে ব্যথা করে, শরীর ম্যাজ-ম্যাজ করে এবং জ্বর হয়ে থাকে। ভাইরাস আক্রমণ করার এক থেকে তিন দিনের মধ্যে এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অন্যরাও আক্রান্ত হয়ে থাকে। ঠান্ডা লাগা প্রতিরোধ করা বেশ কঠিন।


সাধারণত চার থেকে ১৪ দিন ঠান্ডা ভুগিয়ে থাকে। এতে আক্রান্ত হওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস দায়ী।


পর্যাপ্ত না ঘুমালে, খাবার না খেলে, যারা ঠান্ডা লাগায় আক্রান্ত হয়েছে তাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ রোগে আক্রান্ত হলে একটু বেশি বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন। রাতে কমপক্ষে আট থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। এতে শরীরে শক্তি জোগাবে ঠান্ডার ভাইরাসকে প্রতিরোধ করার জন্য।


বেশি পরিমাণে তরল খাবার ও পানীয় গ্রহণ করুন। প্রতি ঘণ্টায় অন্তত এক গ্লাস পানি পান করতে হবে। কফি ও অ্যালকোহল না খেলে ভালো হয়। কারণ এগুলো শরীরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মুরগির স্যুপ ও ফলের রস এ সময় খুবই কার্যকরী।

ঠান্ডা লাগায় আক্রান্ত হলে-
* একেবারেই ধূমপান করবেন না (ধূমপায়ী হলে)।
* গরমপানিতে গোসল করুন।
* গরমপানির সঙ্গে মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা পরপর গরগরা করতে পারেন।
* যদি শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রির বেশি হয়, বেশি দিন ধরে সমস্যা থাকে, যদি খুব বেশি মাত্রায় অসুস্থ বোধ করেন, যদি কানে ব্যথা অনুভব করেন, মুখের ব্যথা বা ক্ষত যদি তিন দিনের বেশি হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।


প্রতিরোধ
যাঁদের ঠান্ডা লেগেছে তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকুন। কারণ কোল্ড ভাইরাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে, এমনকি হাতের মাধ্যমেও ছড়ায়।

* পর্যাপ্ত খাওয়া-দাওয়া করলে ও ঘুমালে শরীরে রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।
* আপনার ঘরের তাপমাত্রা বেশি শুষ্ক করবেন না, বেশি আর্দ্রও করবেন না। এতে রোগ-প্রতিরোধে সক্ষম হওয়া যায় সহজেই।


শীতের ভাইরাস
শীতের সময় সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর হতেই পারে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য জীবনযাপন পদ্ধতি, সামাজিক-প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভাইরাসের আক্রমণ বিশেষভাবে দায়ী।


ভাইরাস বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমিত করে। গ্রী্ন, শরৎ ও বসন্তকালের শুরুর দিকে সাধারণ সর্দি, কাশি ও জ্বর সৃষ্টিকারী ভাইরাস হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। কোল্ড ভাইরাসের ওপর গবেষণাকারী ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার জ্যাক পল্টন বলেন, শীতের সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর সৃষ্টিকারী ভাইরাসগুলোর মধ্যে এডেনো ভাইরাস, প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, করোনা ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ, ইনফ্লুয়েঞ্জা-বির আক্রমণ তীব্রভাবে দেখা যায়।


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতকালে যেসব ইনফ্লুয়েঞ্জার মহামারি হচ্ছে, সেগুলো হলো নতুন প্রজাতির ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ ভাইরাস (এ-বেইজিং)। বেয়লর কলেজ অব মেডিসিনের ইনফ্লুয়েঞ্জা রিচার্স সেন্টারের এপিডেমিওলজিস্ট ডব্লিউ পল প্লেগন বলেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে যেসব মারাত্মক জটিলতা হয় সেগুলোতে তরুণেরাও ভুগতে পারে।


উপসর্গগুলো হলো-ক্রমাগত গলাব্যথা হওয়া, শুকনো কাশি ও জ্বর। আটালান্টার সেন্টার ফর ডিজি কন্ট্রোলের এপিডেমিওলজিস্ট লুইসা চ্যাপম্যান বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা-‘ই’র সবচেয়ে খারাপ মহামারিতে প্রায় ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৫০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল। প্রথম মহামারি সাঙ্গাই শহরে হয়েছিল বলে একে সাঙ্গাই ফ্লুও বলা হয়। এর উপসর্গ হলো প্রচণ্ড সর্দি-কাশি ও মাঝেমধ্যে জ্বর থাকা।


কোল্ড ভাইরাস বা শীতের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে সহজ পথ হলো কাশি ও হাঁচি। তা ছাড়া নোংরা পরিবেশে বসবাসকারীদের কোল্ড ভাইরাসে দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি।


চিকিৎসার ব্যাপারে বিশেষভাবে বলতে হয়, প্রতিনিয়ত ফ্লু ভাইরাসগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন ভাইরাসকে আঘাত করার জন্য বর্তমানে এ-বেইজিংয়ের নিষ্ত্র্নিয় ভাইরাস দিয়ে প্রতিরোধের প্রচেষ্টা চলছে।


এ রকম প্রতিরোধের মাধ্যমে শতকরা ৭৫ ভাগ ফ্লুকে প্রতিরোধ করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ইনজেকশন নেওয়ার পর প্রায় ১৫-২০ দিন সময় লাগে শরীরে এ ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্পূর্ণ বিশ্রামের মাধ্যমে ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রাপ্তবয়স্করা নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ কমানোর জন্য কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন, যেমন-নাক বন্ধ হয়ে এলে ডিকনজেসটেন্ট। যদি সহ্যের বাইরে চলে যায় সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আরও কিছু ওষুধ নেওয়া যেতে পারে।


সামান্য জ্বর অনেক সময় শরীরের উচ্চমাত্রার ভাইরাসগুলোকে ধ্বংস করতে সহায়তা করে। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে না উঠলে জ্বর কমানোর ওষুধ খেতে পরামর্শ দেন না।


শরীরের সব ধরনের ব্যথা কমানোর জন্য বিকল্প হিসেবে আইবিউপ্রোফেন ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা তেমন আক্রান্ত হয় না। তবে বেশ কার্যকরভাবেই শীত, ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা সম্ভব। এই শীতেও সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন। 
 

**************************
লেখকঃ ডা· গৌতম দাশগুপ্ত
মেডিকেল অফিসার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
দৈনিক প্রথম আলো, ০২ জানুয়ারী ২০০৭